মতামত

শেখ হাসিনার রায়: বিচারের নামে রাজনৈতিক নির্মূল নাকি ক্ষমতার নতুন সমীকরণ

  • 11:18 pm - November 20, 2025
  • পঠিত হয়েছে:৪৬ বার
শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড—যে বিচারকে বাংলাদেশের বড় অংশই মিথ্যা, রাজনৈতিক, এবং পূর্বপরিকল্পিত বলছে—আন্তর্জাতিক অঙ্গনে “Bangladesh Shockwave” তৈরি করেছে। ছবিঃ ওটিএন বাংলা

মেলবোর্ন, ২০ নভেম্বর- শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় শুধু একটি আদালতের সিদ্ধান্ত নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনীতিকে, আদালতের বিশ্বাসযোগ্যতাকে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অবস্থানকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ বিচারটি যেভাবে হয়েছে, যে প্রেক্ষাপটে হয়েছে এবং রায়ের পরে বিশ্ব যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, সব মিলিয়ে বিষয়টি এখন আর দেশের অভ্যন্তরীণ ঘটনা নেই। এটি আঞ্চলিক ক্ষমতা রাজনীতি, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামো এবং বৈশ্বিক নীতির একটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রায়ের পর প্রথম যে বিষয়টি চোখে পড়ে তা হলো একটি বড় ধরনের নৈতিক ধাক্কা। রাষ্ট্র কোনো সিদ্ধান্ত নিলে তা যদি জনগণ ও আন্তর্জাতিক সমাজের ন্যূনতম নৈতিক ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, সেখানে স্বাভাবিকভাবেই একটি নৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। এই বিচার তারই উদাহরণ। তদন্ত, সাক্ষ্য, প্রমাণ এবং প্রতিরক্ষার সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন ছিল শুরু থেকেই। যে কারণে রায় ঘোষণার পরই দেশ ও বিদেশে এক ধরনের আঘাতের অনুভূতি তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এই রায় রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণের হাতিয়ার হিসেবে আদালতকে ব্যবহার করেছে। সেই সন্দেহ নতুন নয়, তবে এবার তা আরও স্পষ্ট হয়ে ধরা দিয়েছে।

রায়টি আন্তর্জাতিক গবেষণার ভাষায় সেই ধরনের বিচার, যেখানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সরাতে আদালতকে ব্যবহার করা হয়। আইন তখন আর ন্যায়বিচারের কাঠামো থাকে না, বরং ক্ষমতার হাতিয়ার হয়ে ওঠে। যেটা আবার উল্টো ফল দেয়। বিরোধী পক্ষ যাকে স্বৈরাচার বলত, সেই নেতা এক মুহূর্তেই হয়ে ওঠেন অন্যায়ের শিকার। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে ঠিক এই বয়ানই তৈরি হয়েছে। রায় তাকে আক্রমণকারী হিসেবে নয়, বরং শিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এই বয়ান পরিবর্তন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন নেতার রাজনৈতিক শক্তির বড় অংশই গড়ে ওঠে তার নৈতিক অবস্থান থেকে।

বিশ্বের বড় মানবাধিকার সংগঠনগুলো খুব দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। Amnesty International বিচারটিকে সরাসরি অন্যায্য বলেছে। তারা মনে করছে এ ধরনের ট্রায়াল স্বভাবগতভাবেই বিতর্কিত এবং রাজনৈতিক। Human Rights Watch থেকেও একই সুর শোনা গেছে। তারা বলেছে, বিচারটি ছিল পরিপূর্ণভাবে ত্রুটিপূর্ণ এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাদের মতে বিচারকদের স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ, আইনজীবীদের অ্যাকসেস সীমিত, আর পুরো প্রক্রিয়াটি একটি রাজনৈতিক হিসাবের অংশ। আন্তর্জাতিকভাবে এ ধরনের ভাষা খুব কম ব্যবহার করা হয়। তাই এই মন্তব্যগুলো বিচার ব্যবস্থার ওপর আন্তর্জাতিক আস্থার বড় সংকেত।

জাতিসংঘ থেকেও এসেছে একটি স্পষ্ট বার্তা। তারা বলেছে মৃত্যুদণ্ড আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের পরিপন্থী এবং এই বিচার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার বড় ঘাটতি আছে। জাতিসংঘ সাধারণত সাবধানের ভাষায় কথা বলে। সেখানে এতটা সরাসরি মন্তব্য ইঙ্গিত করে যে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা এখন আর আন্তর্জাতিক মহলে নিরপেক্ষ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না।

কিন্তু সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রতিক্রিয়া এসেছে ভারতের দিক থেকে। ভারত প্রকাশ্যে কিছু না বললেও তাদের নীরবতা অত্যন্ত কৌশলগত। দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীলতা তাদের প্রধান লক্ষ্য। কয়েক দশক ধরে শেখ হাসিনাকে তারা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে দেখেছে। নতুন সরকারের ওপর সেই আস্থা নেই। ফলে ভারতের নীরবতা আড়ালে একটি অসন্তুষ্টি বহন করছে, যা ভবিষ্যতে বড় কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আরও জটিল। তারা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কঠোর মন্তব্য করেনি, যা অনেকে অবাক হয়ে দেখছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী কাঠামো কখনো কখনো ইচ্ছে করেই অপেক্ষার কৌশল নেয়। তারা পর্যবেক্ষণ করে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া কোন দিকে যাচ্ছে, তারপর নিজেদের অবস্থান শক্ত করে। তাই নীরবতা মানে সমর্থন নয়, বরং এটি অস্বস্তির ইঙ্গিত।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নীতি গবেষণা সংগঠন যেমন International Crisis Group একটি বাস্তববিশ্লেষণ দিয়েছে। তারা বলছে বিচারটি ছিল স্পষ্টভাবে ত্রুটিপূর্ণ এবং অস্বাভাবিক গতিতে সম্পন্ন। ডিফেন্সের কাছে পর্যাপ্ত সময় ছিল না, যা ন্যায়বিচারের ন্যূনতম শর্তও পূরণ করে না। তবে তারা বলছে এই রায় বাস্তবে একটি রাজনৈতিক সমাপ্তির অনুভূতি তৈরি করেছে। অর্থাৎ ক্ষমতার কাঠামো এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে শেখ হাসিনার ফেরার পথ রুদ্ধ মনে হয়। কিন্তু ইতিহাস বলে এমন সিদ্ধান্তই কখনো কখনো বিপরীত ফল তৈরি করে। নেলসন ম্যান্ডেলা থেকে শুরু করে বেনজির ভুট্টো পর্যন্ত বহু নেতার ক্ষেত্রে দেখা গেছে অন্যায়ের শিকার হওয়া তাদের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের পথ আরও শক্তিশালী করেছে।

বাংলাদেশেও সেই অভিজ্ঞতা নতুন নয়। রায়ের ফলে রাজনৈতিক বয়ান দ্রুত বদলেছে। যাকে দীর্ঘদিন ‘স্বৈরাচারী’ বলা হয়েছে, সেই নেত্রী এখন দেশের এবং বিশ্বের চোখে অন্যায় বিচারের শিকার। এতে আওয়ামী লীগের বেঁচে থাকার লড়াই নতুন রূপ পেয়েছে। তারা এখন প্রতিরোধের প্রতীকী শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ পেয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তাদের দর কষাকষির শক্তিও বেড়েছে। এর বিপরীতে অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর নেমে এসেছে বৈধতার সংকট। বিচার বিভাগও আস্থাহীনতার কঠিন চাপে পড়েছে।

রায়ের ভূরাজনৈতিক প্রভাবও কম নয়। দক্ষিণ এশিয়ায় এখন যে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হচ্ছে, সেখানে হাসিনা আবার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে উঠেছেন। ভারত, চীন এবং পশ্চিমা দেশগুলো সবাই দেখছে রায়টি অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য কী মানে দাঁড়ায়। বিশেষ করে ভারত ও চীন, যারা প্রতিটি দেশের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য পার্টনারশিপকে সবচেয়ে গুরুত্ব দেয়। তাদের কাছে হাসিনা এখনো সেই নিরাপদ বিকল্প।

সব মিলিয়ে রায়টি বাংলাদেশের ভবিষ্যত রাজনীতির পথচিত্র বদলে দিচ্ছে। এটি ক্ষমতার বয়ান উল্টে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আর শেখ হাসিনাকে অন্যায্য বিচারের মাধ্যমে এমন একটি জায়গায় দাঁড় করিয়েছে, যেখান থেকে তিনি সহজেই একটি নৈতিক প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠতে পারেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন মুহূর্ত খুব কম এসেছে যা একক ঘটনায় এতগুলো স্তরে প্রভাব ফেলতে পারে। এই রায় তারই একটি বড় উদাহরণ, যা বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জিওপলিটিক্যাল মানচিত্র নতুন করে আঁকছে।

লেখক: প্রফেসর ড. শ্যামল দাস– অধ্যাপক, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ও সমাজবিজ্ঞান, এলিজাবেথ সিটি স্টেট ইউনিভার্সিটি, নর্থ ক্যারোলাইনা, যুক্তরাষ্ট্র।

 

ডিসক্লেইমার:
ওটিএন বাংলার মতামত বিভাগে প্রকাশিত লেখা, ছবি, কার্টুন, স্কেচ, অডিও বা ভিডিও- একান্তই লেখকের নিজস্ব চিন্তা-ভাবনার বহিঃপ্রকাশ। প্রকাশিত মতামত ওটিএন বাংলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।

এই শাখার আরও খবর

তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীদের জন্য বাউবির দরজা সবসময় খোলা: উপাচার্য

মেলবোর্ন,০৬জুন-তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি) প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান। তিনি বলেছেন, শিক্ষা…

অস্ট্রেলিয়া সিরিজে জাতীয় দলে ফিরছেন সালাউদ্দিন, কোচিং স্টাফে বড় পরিবর্তন

মেলবোর্ন,০৬জুন-আসন্ন অস্ট্রেলিয়া সিরিজকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের কোচিং স্টাফে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। কোচিং স্টাফে জনবল সংকট দেখা দেওয়ায় আবারও জাতীয় দলের…

বউকে বাঁচাতে গিয়ে শাশুড়ির মৃত্যু, কটিয়াদীতে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে প্রাণ গেল দুজনের

মেলবোর্ন,০৬জুন-কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলায় মর্মান্তিক বিদ্যুৎস্পৃষ্টের ঘটনায় এক গৃহবধূ ও তার শাশুড়ির মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার দুপুরে উপজেলার আচমিতা ইউনিয়নের উখরাশাল গ্রামে এ দুর্ঘটনা ঘটে। পরিবারের এক…

ইসরায়েলি রোগীদের বিরুদ্ধে হুমকির অভিযোগে দুই নার্সের বিচার ঘিরে নতুন বিতর্ক

মেলবোর্ন, ৫ জুন- অস্ট্রেলিয়ার সিডনির ব্যাংকসটাউন হাসপাতালের দুই নার্স সারা আবু লেবদেহ ও আহমদ রাশাদ নাদিরের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি রোগীদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগে বহুল আলোচিত মামলার…

আইএসআইএস-সম্পর্কিত নারী জেইনাব আহমদের জামিন শুনানিতে চাঞ্চল্যকর সাক্ষ্য

মেলবোর্ন, ৫ জুন- আইএসআইএস-সম্পর্কিত দাসত্ব ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত নারী জেইনাব আহমদের জামিন শুনানিতে তার চাচা আব্রাহাম আব্বাস সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএসআইএসকে ‘অশুভ’ বলে তীব্র…

বিমানবন্দরে বিমান ছিনতাইচেষ্টার অভিযুক্ত কিশোর অস্ট্রেলিয়া ছাড়তে চেয়েছিল: আদালত

মেলবোর্ন, ৫ জুন- অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া রাজ্যের অ্যাভালন বিমানবন্দরে জেটস্টার এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট ছিনতাইয়ের চেষ্টার অভিযোগে অভিযুক্ত এক কিশোর দেশ ছাড়ার উদ্দেশ্যে এই ঘটনা ঘটিয়েছিল বলে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au