নিহত লিলি জেমস। ছবিঃ এবিসি নিউজ
মেলবোর্ন, ২৮ নভেম্বর- অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসের স্টেট করোনার টেরেসা ও’সুলিভান জানিয়েছেন, লিলি জেমসকে হত্যা করার ঘটনাটি স্পষ্টভাবে লিঙ্গভিত্তিক ও পারিবারিক সহিংসতার অংশ। লিলি ২০২৩ সালের ২৫ অক্টোবর সিডনির সেন্ট অ্যান্ড্রুজ ক্যাথেড্রাল স্কুলের জিমের বাথরুমে তার সাবেক প্রেমিক পল থাইজেনের হাতে নিহত হন।
লিলির বয়স ছিল ২১ বছর। তার মৃত্যুর কারণ ছিল মাথা ও ঘাড়ে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত।
করোনার জানান, লিলি সম্পর্ক ভাঙার পর থাইজেনের আচরণ ভয়ংকরভাবে নিয়ন্ত্রণমূলক ও হিংস্র হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, সম্পর্ক শেষ হওয়ার সিদ্ধান্ত থাইজেনকে উত্তেজিত করে তোলে এবং কয়েক দিনের মধ্যে তার আচরণ আরও নিয়ন্ত্রণমূলক, আক্রমণাত্মক ও ভয় দেখানো ধরনের হয়ে ওঠে, যা শেষ পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডে গড়ায়।
তদন্তে দেখা গেছে, মৃত্যুর আগে সাতবার থাইজেন সরাসরি লিলিকে অনুসরণ করেছে এবং পুরো ঘটনাটি আগে থেকেই পরিকল্পনা করে রেখেছিল। আদালতের ভাষায় এটি হঠাৎ রাগের ঘটনা নয়, বরং পরিকল্পিত হত্যা।
হত্যার পর থাইজেন সিডনির ভক্লুজ এলাকায় গিয়ে জরুরি সেবায় ফোন করে লিলির অবস্থান জানায়, তারপর নিজেই একটি খাড়া পাহাড়ের ধারে গিয়ে নিচে পড়ে আত্মহত্যা করেন বলে ধারণা করা হয়। দুদিন পর তার লাশ উদ্ধার করা হয়।
তদন্তে দেখা গেছে, লিলি ও থাইজেন মূলত স্ন্যাপচ্যাটে যোগাযোগ করতেন, যেখানে বার্তা মুছে যায়। এতে বেশ কিছু তথ্য পাওয়া যায়নি। থাইজেন নিজের ফোন এবং লিলির ফোনও নষ্ট বা সরিয়ে ফেলেছিল। পুলিশ যে ফোনটি পায় সেটি তার আসল নম্বরের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। হত্যার অস্ত্রও উদ্ধার করা যায়নি।
লিলি মে ২০০২ সালে জন্ম নেন। তিনি পরিবারের সঙ্গে থাকতেন, ভাই ম্যাক্সের সঙ্গে তার সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ট ছিল। স্কুলজীবনে তিনি নাচ, নেটবল ও ওয়াটার পোলো খেলতেন। মৃত্যুর সময় তিনি ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি সিডনিতে স্পোর্টস ম্যানেজমেন্টে পড়ছিলেন। পাশাপাশি সেন্ট অ্যান্ড্রুজ স্কুলে ফুল টাইম স্পোর্টস সহকারী হিসেবে কাজ করতেন এবং স্কুল সম্প্রদায়ের কাছে তিনি অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন।
আদালতের বাইরে লিলির বাবা বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা নিয়ে সচেতনতা, শিক্ষা এবং কথা বলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, প্রতিদিন তারা ভাবেন, আর কী করলে হয়তো লিলিকে বাঁচানো যেত। তিনি অনুরোধ করেন, নারীর ওপর সহিংসতা নিয়ে নিয়মিত আলোচনা হোক এবং হত্যাকারীর চরিত্র নিয়ে অযথা ইতিবাচক মন্তব্য বন্ধ করা হোক।
করোনার লিলিকে সামাজিক, প্রাণবন্ত ও অনেক বন্ধু ঘেরা একজন মানুষ হিসেবে বর্ণনা করেন। তার মৃত্যুকে তিনি অর্থহীন ও বর্বরতাপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়ায় লিঙ্গভিত্তিক ও পারিবারিক সহিংসতা একটি বড় সামাজিক সংকট এবং লিলির মৃত্যু এই ধারাবাহিকতারই অংশ। নারীর নিরাপত্তায় জরুরি ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ প্রয়োজন।
তিনি লিলির পরিবারসহ থাইজেনের নেদারল্যান্ডসে থাকা পরিবারকেও সমবেদনা জানান।
তদন্তে প্রমাণ পাওয়া গেছে, থাইজেন বারবার লিলির লোকেশন চেক করত। সম্পর্ক ভাঙার পর সে লিলিকে চাপ দিতে নানা কৌশল নেয়, এমনকি লিলির ব্যক্তিগত ছবি বন্ধুদের কাছে পাঠায়। এছাড়া তিনি একটি ভুয়া স্ন্যাপচ্যাট অ্যাকাউন্টও তৈরি করেছিলেন।
করোনার বলেন, প্রযুক্তি ব্যবহার করে সঙ্গীকে নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা বাড়ছে এবং গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি দশজনের একজন মনে করে লোকেশন শেয়ার করে সঙ্গীকে ট্র্যাক করা স্বাভাবিক বিষয়। তিনি তরুণদের নিয়মিত নিজেদের প্রযুক্তি ব্যবহার, বিশেষ করে লোকেশন শেয়ারিং নিয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
আদালত তরুণদের জন্য আরও সচেতনতা কর্মসূচি, বিশেষ করে ছেলেদের আচরণ পরিবর্তন সম্পর্কিত শিক্ষা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে।
করোনার বলেন, লিলি ও পলের মৃত্যু সংশ্লিষ্ট সবার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে এবং এই ঘটনার যন্ত্রণা দীর্ঘস্থায়ী হবে।
সূত্রঃ এবিসি নিউজ