মেলবোর্ন, ১৭ ডিসেম্বর- প্রশান্ত মহাসাগরে মাদক পাচারের অভিযোগে তিনটি নৌযানে মার্কিন বাহিনীর হামলায় অন্তত আটজন নিহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, পরিচিত নার্কো-ট্রাফিকিং রুটে চলাচল করা এসব নৌযান মাদক পরিবহনে জড়িত ছিল বলে গোয়েন্দা তথ্যে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
ইউএস সাউদার্ন কমান্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হামলার ভিডিও প্রকাশ করে জানায়, অভিযানের লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক মাদক পাচার নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগর ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এ ধরনের অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
মার্কিন সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে এ দুই অঞ্চলে ২০টির বেশি নৌযানে হামলা চালানো হয়েছে। এসব অভিযানে অন্তত ৯০ জন নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। এই অভিযান চলছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মাদকবিরোধী কৌশলের অংশ হিসেবে, যেখানে তিনি আঞ্চলিক গ্যাং ও কার্টেলগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক প্রবাহের জন্য দায়ী করছেন।
তবে এসব অভিযানের বৈধতা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ বলছে, কিছু হামলা সশস্ত্র সংঘাত নিয়ন্ত্রণকারী আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। বিশেষ করে গত ২ সেপ্টেম্বরের একটি অভিযানে প্রথম হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের ওপর দ্বিতীয়বার আঘাত হানার ঘটনায় তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
একাধিক আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞের মতে, ভেনেজুয়েলীয় একটি মাদকবাহী নৌযানে দ্বিতীয় দফার হামলাটি সম্ভবত অবৈধ ছিল এবং সেটিকে আন্তর্জাতিক আইনে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের এক সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন, সামগ্রিকভাবে এই অভিযান শান্তিকালে বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ও পদ্ধতিগত হামলার পর্যায়ে পড়তে পারে।
এ অভিযোগের জবাবে হোয়াইট হাউস বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র সশস্ত্র সংঘাতের আইন মেনেই অভিযান পরিচালনা করছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, আমেরিকান জীবন ধ্বংস করতে চাওয়া মাদক কার্টেলগুলোর হাত থেকে দেশকে রক্ষা করাই এসব অভিযানের লক্ষ্য।
ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক প্রবাহে সহায়তার অভিযোগ এনে আসছে। একই সঙ্গে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আন্তর্জাতিকভাবে আরও একঘরে করতে কূটনৈতিক চাপ বাড়ানো হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ভেনেজুয়েলার কাছাকাছি এলাকায় হাজার হাজার মার্কিন সেনা এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিমানবাহী রণতরি মোতায়েন করা হয়েছে।
এর ধারাবাহিকতায় গত ১০ ডিসেম্বর ভেনেজুয়েলার উপকূলের কাছে একটি তেলবাহী জাহাজ জব্দ করে মার্কিন বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, জাহাজটি ভেনেজুয়েলা ও ইরান থেকে নিষেধাজ্ঞাভুক্ত তেল পরিবহনে ব্যবহৃত হচ্ছিল এবং এটি বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠনকে সহায়তাকারী একটি অবৈধ তেল নেটওয়ার্কের অংশ।
এই জব্দের ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে কারাকাস। ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভান গিল একে আন্তর্জাতিক জলদস্যুতা আখ্যা দিয়ে বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন দেশটির বিপুল তেলসম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।
মাদকবিরোধী অভিযান, সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং আইনি বিতর্ক মিলিয়ে প্রশান্ত মহাসাগর ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের তৎপরতা এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক স্পর্শকাতর ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
সুত্রঃ বিবিসি