শত শত প্রাণহানির পরও থামছে না গণপিটুনি, বিচার নিয়ে প্রশ্ন
বাংলাদেশে গণপিটুনিতে প্রাণহানির ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। ২০২৪ সাল থেকে এ ধরনের সহিংসতায় শত শত মানুষের মৃত্যু হলেও আলোচিত অনেক হত্যাকাণ্ডের বিচার এখনো শেষ হয়নি। সরকার…
মেলবোর্ন,২০ ডিসেম্বর- বাংলাদেশের দুটি শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনায় দেশজুড়ে উদ্বেগ ছড়িয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে বিক্ষোভকারীদের হামলায় ভবনের ভেতরে আটকে পড়া অনেক কর্মী জানান, ধোঁয়ায় তারা শ্বাস নিতে পারছিলেন না। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, দীর্ঘ সময় ছাদে আশ্রয় নিয়ে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করতে হয় তাদের।
এই সহিংসতার সূত্রপাত হয় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। গত সপ্তাহে ঢাকায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার তার মৃত্যু হয়। খবর ছড়িয়ে পড়ার পরই রাজধানীতে উত্তেজনা বাড়তে থাকে।
বৃহস্পতিবার রাতেই শত শত বিক্ষোভকারী প্রথমে ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার, পরে বাংলা দৈনিক প্রথম আলোর কার্যালয়ে হামলা চালায়। ভবনের ভেতরে ভাঙচুরের পর একাধিক স্থানে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। বিক্ষোভ পরদিন শুক্রবার পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।
দ্য ডেইলি স্টার এক বিবৃতিতে ঘটনাটিকে বাংলাদেশের স্বাধীন সাংবাদিকতার ইতিহাসে “সবচেয়ে অন্ধকার দিনগুলোর একটি” হিসেবে বর্ণনা করেছে। পত্রিকাটির কনসালটিং সম্পাদক কামাল আহমেদ বিবিসিকে জানান, ৩৫ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম তারা ছাপা সংস্করণ প্রকাশ করতে পারেননি এবং আপাতত পত্রিকাটি কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে।
তিনি বলেন, “আমাদের ২৮ জন সহকর্মী ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভবনের ছাদে আটকে ছিলেন। চারপাশে ধোঁয়া, ভেতরে আগুন। তারা তাজা বাতাসের জন্য হাঁপাচ্ছিলেন। অতিরিক্ত সামরিক বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পরই তাদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়।”
কেউ গুরুতর আহত না হলেও শুক্রবার বিবিসি বাংলার সাংবাদিকরা ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে দেখতে পান, ভবনের বড় অংশ সম্পূর্ণভাবে পুড়ে গেছে। প্রথম আলোর ভবন থেকেও তখনো ধোঁয়া বের হচ্ছিল।
ঘটনার পর নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দোষীদের বিরুদ্ধে “পূর্ণ বিচার” নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছে। শুক্রবার দেওয়া এক বিবৃতিতে সরকার বলেছে, সাংবাদিকদের ওপর হামলা মানে সত্যের ওপর হামলা।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, দেশ একটি ঐতিহাসিক গণতান্ত্রিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী এবং শান্তি প্রত্যাখ্যানকারীদের কারণে ব্যাহত হতে দেওয়া যাবে না।
শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর প্রথমবারের মতো আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। কেন বিক্ষোভকারীরা প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারকে লক্ষ্যবস্তু করল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। এই দুটি পত্রিকা দীর্ঘদিন ধরেই ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল হিসেবে পরিচিত এবং শেখ হাসিনার শাসনামলেও তারা প্রায়ই চাপ ও সমালোচনার মুখে পড়েছে।
তবে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পরও পত্রিকা দুটি অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু নীতির সমালোচনা অব্যাহত রাখায় ইউনূস প্রশাসনের কিছু সমর্থক ক্ষুব্ধ হয়ে থাকতে পারেন বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
একই রাতে দেশের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে শেখ হাসিনার বাবা ও বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতেও ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।
৩২ বছর বয়সী শরিফ ওসমান হাদি ছিলেন ছাত্র আন্দোলনভিত্তিক সংগঠন ইনকিলাব মঞ্চের জ্যেষ্ঠ নেতা এবং শেখ হাসিনার পতনে ভূমিকা রাখা যুব আন্দোলনের অন্যতম মুখ। প্রতিবেশী ভারত নিয়ে তার প্রকাশ্য সমালোচনাও তাকে আলোচনায় রাখে। বর্তমানে শেখ হাসিনা স্বেচ্ছা নির্বাসনে ভারতে অবস্থান করছেন।
গত বছরের আন্দোলনের পর হাদি নিয়মিত টেলিভিশন ও অনলাইন আলোচনায় অংশ নিতেন। এতে তার সমর্থক যেমন বেড়েছে, তেমনি বিরোধীর সংখ্যাও বাড়ে। আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পরিকল্পনাও ছিল তার।
১২ ডিসেম্বর ঢাকায় একটি মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় মুখোশধারী হামলাকারীরা তাকে গুলি করে। গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে ঢাকায়, পরে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা চলাকালে তিনি মারা যান।
মুহাম্মদ ইউনূস হাদির মৃত্যুতে একে “জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি” বলে উল্লেখ করে বলেন, এটি নির্বাচন ভণ্ডুল করার ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে। বৃহস্পতিবার টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, ভয়, সন্ত্রাস বা রক্তপাতের মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা থামানো যাবে না।
অন্তর্বর্তী সরকার শনিবার জাতীয় শোক দিবস ঘোষণা করেছে। গুলির ঘটনাটি তদন্তাধীন রয়েছে এবং ইতোমধ্যে কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে।
শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র নেতৃত্বাধীন টানা আন্দোলনের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান। এর মধ্য দিয়ে তার প্রায় ১৫ বছরের ক্রমশ কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটে। গত নভেম্বরে আন্দোলনের সময় বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার দায়ে তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ওই সহিংসতায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়।
সুত্রঃ বিবিসি
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au