বাংলাদেশ

ভারতবিরোধী রাজনীতি, অন্তর্বর্তী শাসন ও বদলে যাওয়া কূটনীতি:

বাংলাদেশ কি সত্যিই ‘নতুন পাকিস্তান’ হয়ে উঠছে?

  • 5:17 pm - January 30, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৮২ বার

মেলবোর্ন, ৩০ জানুয়ারি- শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর থেকে ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক দ্রুত অবনতির পথে। সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখতে দুই পক্ষের আনুষ্ঠানিক বার্তা ও উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবে পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ, কূটনৈতিক উত্তেজনা এবং রাজনৈতিক বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের পর এই উত্তেজনা প্রকাশ্যে এসেছে নতুন মাত্রায়। বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে দুই দেশ একে অপরের হাইকমিশনার তলব করেছে এবং নিরাপত্তার অজুহাতে বন্ধ রাখা হয়েছে ভিসা কার্যক্রম।

হাসিনা সরকারের পতনের পর ঢাকায় ভারতীয় ভিসা কেন্দ্র ও ভারতীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে হামলার ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কে বড় ধাক্কা দেয়। একই সময়ে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের দিকে মিছিল এবং চট্টগ্রামে ভারতের সহকারী হাইকমিশনে হামলার ঘটনাও ঘটে। বিপরীতে, দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনের সামনে সীমিত আকারের বিক্ষোভ হয়, যা ছিল দাসের লিঞ্চিংয়ের প্রতিবাদে। এই বৈপরীত্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়াগুলো দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক আবহের ভিন্নতাই স্পষ্ট করে।

নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশে ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর নেতৃত্বে ক্রমবর্ধমান ভারতবিরোধিতা এখন একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখা যাচ্ছে। ইসলামপন্থীরা দীর্ঘদিন ধরেই পাকিস্তানের সঙ্গে আদর্শিক ও রাজনৈতিক সাযুজ্যের কথা বলে আসছে এবং ভারতকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরছে। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সঞ্চিত ক্ষোভ পরিকল্পিতভাবে ভারতের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভারতবিদ্বেষী পোস্টগুলোতে দাবি করা হচ্ছে, ভারত শুধু শেখ হাসিনাকেই নয়, হাদির হত্যাকারীদেরও আশ্রয় দিয়েছে। এমনকি কিছু পোস্টে ভারত আক্রমণ করলে পাকিস্তানের ক্ষেপণাস্ত্র ও চীনের সামরিক শক্তির সমন্বয়ে পাল্টা জবাব দেওয়ার কথাও বলা হচ্ছে।

তবে এই ভারতবিরোধী আবহ নতুন নয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলের শেষদিকে পাকিস্তানপন্থী শক্তি এবং যারা সরকারকে অতিমাত্রায় ভারতঘেঁষা মনে করত, তারা ভারতবিরোধী মনোভাব উসকে দিয়েছিল। মুজিব-পরবর্তী অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে যে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, সেই সময়েও এই অনুভূতিকে রাজনৈতিকভাবে পুষ্ট করা হয়।

ঐতিহাসিকভাবে পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ভারতের নীতি ছিল ভিন্নধর্মী। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময়গুলোতেও পূর্ব পাকিস্তানের তুলনামূলক অরক্ষিত অবস্থার সুযোগ ভারত নেয়নি। দেশভাগের সময় পশ্চিম সীমান্তের পাঞ্জাব অঞ্চলে ভয়াবহ সহিংসতা হলেও দুই বাংলায় সহিংসতা ছিল তুলনামূলকভাবে সীমিত। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধ পর্যন্ত রেল, সড়ক ও নৌপথে যোগাযোগ অব্যাহত ছিল। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত ঘনিষ্ঠতাকে পাকিস্তানি রাষ্ট্র সন্দেহের চোখে দেখত এবং ইসলামপন্থীরা সচেতনভাবেই এই সম্পর্ককে খাটো করে উপস্থাপন করত।

ইসলামপন্থী ও বামপন্থী উভয় রাজনৈতিক বয়ানেই ভারতকে আধিপত্যবাদী ও সম্প্রসারণবাদী শক্তি হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা অনেক সময় পাকিস্তান বিভাজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখানো হয়েছে, যদিও বাস্তবে ভারত এক কোটিরও বেশি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছিল এবং বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বৈরী আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলা করেছিল। এই সম্মিলিত বয়ান ভারতের দীর্ঘমেয়াদি সম্পৃক্ততাকে দুর্বল করেছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে হাসিনা সরকারের প্রতি ভারতের সমর্থনকেই ভারতবিরোধিতার প্রধান ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, যা বাংলাদেশের একাংশ অভিজাত শ্রেণির মধ্যেও গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।

২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ভাষ্য ও রাজনৈতিক বক্তব্যে পাকিস্তানি রাষ্ট্রের কিছু পরিচিত বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়ে উঠছে। শত্রুভাবাপন্ন ভাষা, আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক মন্তব্য এবং ভারতের ভৌগোলিক অখণ্ডতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রবণতা বাড়ছে। সরকার ও সরকারবহির্ভূত বিভিন্ন মহল বৃহত্তর বাংলা ধারণা সামনে আনছে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল নিয়ে দাবি করছে বা সিলিগুড়ি করিডর বিচ্ছিন্ন করার হুমকি দিয়ে বাংলাদেশকে বঙ্গোপসাগরের অভিভাবক হিসেবে উপস্থাপন করছে।

২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং মন্তব্য করেছিলেন, বাংলাদেশের অন্তত ২৫ শতাংশ মানুষ জামায়াতে ইসলামীর আদর্শে বিশ্বাসী এবং তারা প্রবলভাবে ভারতবিরোধী, অনেক ক্ষেত্রে আইএসআইয়ের প্রভাবাধীন। সে সময় এই বক্তব্য বাংলাদেশে বিতর্ক সৃষ্টি করলেও বর্তমান পরিস্থিতি অনেক বিশ্লেষকের কাছে সেই সতর্কবার্তার প্রতিফলন বলেই মনে হচ্ছে। জামায়াতের সঙ্গে ভারতীয় কর্মকর্তাদের যোগাযোগ থাকলেও ভারতবিরোধী মনোভাব উসকে দিতে দলটির ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ কাটেনি। হাদির নেতৃত্বাধীন ইসলামিক মঞ্চ নিয়েও বিতর্ক চলছে, যাকে জামায়াতে ইসলামীর একটি ফ্রন্ট হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ভারতবিরোধী নির্বাচনী রাজনীতি নতুন না হলেও আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকা এবং রাজনৈতিক আলোচনা যখন মূলত তাদের শাসনামলের অপকর্ম ও শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে, তখন এই রাজনীতি নতুন গতি পেয়েছে।

নির্বাচন সামনে রেখে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ভারত বাংলাদেশকে নন-ফ্যামিলি স্টেশন ঘোষণা করেছে। সহিংসতা ও জনতার হামলার আশঙ্কাই এর পেছনে প্রধান কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশ কার্যত ইরাক, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় চলে গেছে।

কলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে খেলতে না পারা মুস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরে বিতর্ক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বেসরকারি লিগে অংশগ্রহণের অনুমতি না পাওয়ার পর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড আসন্ন ভারত ও শ্রীলঙ্কায় আয়োজিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দেয় এবং নিরাপত্তার অজুহাতে ভেন্যু পরিবর্তনের দাবি তোলে। এর সঙ্গে সংহতি জানিয়ে পাকিস্তানও একই পথে হাঁটার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে, যখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করছে।

হাসিনা অপসারণের পর বাংলাদেশ ভারতের প্রতি বিরূপ অবস্থান জোরালো করতে পাকিস্তানের আরও কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশে ভারতকে কোণঠাসা করার কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে এই ঘনিষ্ঠতা তুলে ধরার সুযোগ পাকিস্তান হাতছাড়া করছে না। অন্তর্বর্তী সরকারের নিযুক্ত তদন্ত কমিশনের সদস্য অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এএলএম ফজলুর রহমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেছেন, পাহালগাম হামলার পর ভারত যদি পাকিস্তানে আক্রমণ করে, তবে বাংলাদেশ ও চীন একসঙ্গে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল দখল করা উচিত। এই বক্তব্য আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে।

সব মিলিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারতবিরোধিতার উত্থান দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে গভীর সংকটে ফেলেছে। কূটনীতিক তলব, পাল্টাপাল্টি বক্তব্য এবং নির্বাচনী উত্তেজনার মধ্যে তৈরি হওয়া এই বাস্তবতায় ভারতীয় বিশ্লেষকদের কাছে বাংলাদেশ ক্রমেই ‘নতুন পাকিস্তান’-এর মতো প্রতীয়মান হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করতে বাস্তববাদী ও সংযত কূটনীতিই দুই দেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই শাখার আরও খবর

জাতিসংঘে বড় পদের আশায় কূটনৈতিক তৎপরতায় ব্যস্ত খালিলুর রহমান

মেলবোর্ন,২৯ এপ্রিল- বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খালিলুর রহমানকে ঘিরে কূটনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। খুব শিগগিরই তাঁর চীন সফরের প্রস্তুতির খবরের মধ্যেই ঢাকায় গুঞ্জন ছড়িয়েছে, জাতিসংঘ…

বাংলাদেশের ৫ জেলায় বন্যার আশঙ্কা, ৪ নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে

বন্যা। ফাইল ছবি মেলবোর্ন, ২৯ এপ্রিল- দেশজুড়ে টানা ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের কারণে বাংলাদেশের পাঁচটি জেলায় বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও…

কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুললেন মমতা 

মেলবোর্ন, ২৯ এপ্রিল-পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে দ্বিতীয় দফার ভোটের আগের রাত থেকেই কেন্দ্রীয় বাহিনী এলাকায় অত্যাচার চালাচ্ছে বলে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভোটের…

আরও পেছাল শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালুর সময় 

মেলবোর্ন, ২৯ এপ্রিল- ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহুল প্রতীক্ষিত তৃতীয় টার্মিনাল চালুর সময় আরও পিছিয়ে যাচ্ছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী চলতি বছরের ডিসেম্বরেই এটি চালুর…

৯ মাসেই ব্যাংক থেকে এক লাখ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে  সরকার

মেলবোর্ন, ২৩ এপ্রিল–     দৈনন্দিন খরচ, উন্নয়ন ব্যয় এবং বাজেট ঘাটতি সামাল দিতে ব্যাংক খাতের ওপর সরকারের নির্ভরতা বাড়ছে। রাজস্ব আদায়ে প্রত্যাশিত গতি না থাকায়…

যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে কবে ফিরবে লিমনের লাশ

মেলবোর্ন, ২৯ এপ্রিল- যুক্তরাষ্ট্রে নিহত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমনের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে আরও এক থেকে দুই দিন সময় লাগতে পারে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au