মতামত

সম্পাদকীয়

বাংলাদেশ পরিবর্তনের সুবর্ণ সুযোগ- না হলে আরেকটি ‘মিসড অপরচুনিটি

ড. প্রদীপ রায়

  • 10:00 pm - February 17, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৩২ বার
১৭ বছর পর দেশে ফিরে নির্বাচনে বিজয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

মেলবোর্ন, ১৭ ফেব্রুয়ারি: বাংলাদেশের ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদল ঘটছে। মব রাজ্য প্রতিষ্ঠাকারী ড. ইউনূস সরকার আজ বিদায় নিলেন। নিশ্চয়ই অনেক আনন্দের দিন। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই আজ এই আনন্দ প্রাণভরে উদযাপন করছে। 

দীর্ঘ নির্বাসনের পর তারেক রহমান এখন বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী। তবে তার সামনে প্রথম বড় পরীক্ষা হবে রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে। আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকায় বিএনপি যে শূন্যস্থান পূরণ করেছে, তার পেছনে রয়েছে দলটির উল্লেখযোগ্য ভোটব্যাংকের স্থানান্তর। 

এই ভোটাররা ইসলামী মৌলবাদের বিপরীতে স্থিতিশীলতা বেছে নিয়েছেন। এই ভোটাররা আদর্শগতভাবে বিএনপির হয়ে যাননি; তারা মূলত ইসলামী মৌলবাদের উত্থানের বিপরীতে একটি স্থিতিশীল, কেন্দ্রাভিমুখী বিকল্প বেছে নিয়েছেন। অর্থাৎ, এই সমর্থন শর্তসাপেক্ষ। তাদের প্রত্যাশা স্পষ্ট প্রতিহিংসার রাজনীতি নয়, ন্যায্যতা, সমান সুযোগ এবং একটি কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা। 

সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া অসংখ্য দৃশ্যমান পোস্ট, ভিডিও ও মন্তব্যে দেখা যাচ্ছে – অনেক ভোটার খোলাখুলিভাবে বলেছেন, তারা নির্বাচনে ‘ধানের শীষ’কে বেছে নিয়েছেন মূলত একটি রাজনৈতিক বার্তার কারণে। সেই বার্তাটি ছিল – ধানের শীষে ভোট দিলে আওয়ামী লীগ দেশে ফিরে আবার রাজনীতি করার সুযোগ পাবে। অর্থাৎ, বহু ভোটার বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন বিএনপির প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকে নয়; বরং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক পরিসর ফেরানোর প্রত্যাশা থেকে। তাদের কাছে ধানের শীষ হয়ে উঠেছিল এক ধরনের “পথিকের আশ্রয়” – যে পথে হাঁটলে রাজনৈতিক বহুত্ববাদ ফিরে আসতে পারে। এখন তাদের প্রত্যাশা প্রতিহিংসার রাজনীতি নয়, বরং ন্যায্যতা ও সমান সুযোগ। 

নির্বাচনের আগে বিএনপির একটি ইঙ্গিত ছিল যে তারা ক্ষমতায় আসলে আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফিরতে পারবে। এ অবস্থান বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের পরেও ধরে রাখলে প্রতিশোধের গন্ধ কম থাকবে। কিন্তু ক্ষমতা হাতে পেয়ে প্রতিহিংসার সুর বাজলে বাংলাদেশ আবারো দ্রুতই পুরোনো পথে ফিরবে। 

দ্বিতীয় বড় চ্যালেঞ্জ জামায়াতের উত্থান। ঐতিহাসিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রচিন্তার বিরোধী একটি শক্তির দ্রুত বিস্তার-রাষ্ট্রের জন্য সতর্কবার্তা। রাজনৈতিক বাস্তবতায় সমর্থন দরকার হতে পারে; কিন্তু নীতিগতভাবে লাগাম না টানলে ক্ষমতার ভারসাম্য ইসলামপন্থীদের দিকে হেলে পড়বে। এতে গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত হবে, সামাজিক সম্প্রীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তারেক রহমান বাংলাদেশকে যদি সত্যিই একটি সমানাধিকারের দেশ বানাতে হয়, তবে সংখ্যালঘু সুরক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ধর্মনিরপেক্ষতার সাংবিধানিক চেতনা প্রশ্নাতীতভাবে রক্ষা করতে হবে।

তৃতীয়ত, আইনের শাসন বনাম প্রতিহিংসা – এই দ্বন্দ্বই তারেক রহমানের রাষ্ট্রনায়কোচিত পরিচয়ের মাপকাঠি হবে। অতীতের ক্ষত গভীর; বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর মামলা, কারাবাস, রাজনৈতিক নিপীড়নের স্মৃতি রয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এসব ঘটনা নতুন নয়। অতীতেও এমনটা ঘটেছে – বিএনপি সরকারের সময় আওয়ামী লীগের বহু নেতাকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, কারাবরণ করেছেন।
দুঃখজনকভাবে, ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিপক্ষকে দমন করার এই প্রবণতাই ধীরে ধীরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা ব্যক্তিগত হিসাব মেটানোর ক্ষেত্র নয়। এই ব্যক্তিগত হিসাব মেটাতে গিয়েই অন্তর্ভুক্তি কালীন সরকারের প্রধান ডঃ মুহাম্মদ ইউনুস একটি দেশকে বহুদূর পিছনে নিয়ে গেছেন। নিরপেক্ষ তদন্ত, ন্যায্য বিচার, এবং প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ – এই তিনটি পথে হাঁটতে পারলেই প্রতিশোধের চক্র ভাঙবে। অন্যথায়, ক্ষমতার পালাবদল কেবল শাসকের নাম বদলাবে; শাসনের দাগ বদলাবে না।

চতুর্থত, জামায়াতকে ঠেকাতেই হিন্দু সম্প্রদায় বিএনপি-কে ভোট দিয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে খবর মিলছে। বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে ইসলামি শাসন ব্যবস্থা কায়েম করার বৃহত্তর কর্মসূচি রয়েছে জামায়াতের। ক্ষমতায় এলেই তারা এই কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ত বলে আশঙ্কা ছিল। ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দুরা বরাবরই আওয়ামী লীগ-সমর্থক হিসাবে পরিচিত। সেই কারণেই মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে একের পর এক সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব ভোট বয়কটের ডাক দিলেও দলের অধিকাংশ সমর্থক তাকে গুরুত্ব দেননি বলে মনে করা হচ্ছে। সংখ্যালঘু ভোটাররা ভোট দিয়েছেন তাদের নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য। বিভিন্ন হিন্দু প্রধান এলাকায় আওয়ামী – ভোটের জোরেই বিএনপি জয় পেয়েছে বলেও স্থানীয়রা দাবি করেছেন। নবনির্বাচিত কয়েকজন সংসদ সদস্য প্রকাশ্যে বলেছেন সংখ্যালঘুদের ভোটের কথা। বিএনপি’র জয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভেতরে জমে থাকা গভীর অনাস্থা ও নিরাপত্তাহীনতার প্রতিফলন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এখনো বিশ্বাস করে তাদের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাস প্রভুকে অনৈতিক, সংবিধানিক এবং অন্যায়ভাবে জেলে আটক রাখা হয়েছে। সুতরাং চিন্ময় কৃষ্ণ দাস প্রভুর মুক্তির দাবি কেবল মানবিক বা আইনি বিষয় নয়; এটি রাজনৈতিক আস্থার বিষয়। দ্রুত ও স্বচ্ছ আইনি প্রক্রিয়ায় তার মামলার নিষ্পত্তি ও মুক্তির ব্যবস্থা করতে হবে। চিন্ময় কৃষ্ণ দাস প্রভুর মুক্তি ‘ভোটের প্রতিফলন’ হিসেবেও দেখা হবে – কারণ সংখ্যালঘু ভোটাররা যে প্রত্যাশা নিয়ে ব্যালট দিয়েছেন, তার প্রথম দৃশ্যমান পরীক্ষা এখানেই। 

সবশেষে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও আমরা আবারও দেখেছি সেই চেনা রোগ – নির্বাচন-পূর্ব রাতে ব্যালট ভরার অভিযোগ, জাল ভোটের অভিযোগ, ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ। এই সংস্কৃতি আর কোনো দলের নয় –  এটি একটি ব্যবস্থাগত ব্যর্থতা। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ স্পষ্টভাবে চায় এসবের অবসান; তারা চায় প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, স্বাধীন গণমাধ্যম এবং জবাবদিহিমূলক সরকার।

তারেক রহমানের সামনে সুযোগ সত্যিই বিরল। তিনি চাইলে প্রতিহিংসার রাজনীতি থামিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র নির্মাণের পথে হাঁটতে পারেন – যেখানে বিরোধী মত দমন নয়, সহাবস্থান হবে রাজনীতির নীতি। আর না চাইলে ইতিহাস তাকে আরেকটি ‘মিসড অপরচুনিটি’ হিসেবেই মনে রাখবে।

ড. প্রদীপ রায়, সম্পাদক, ওটিএন বাংলা, মেলবোর্ন

 

এই শাখার আরও খবর

বিশ্বজুড়ে মার্কিন নাগরিকদের জন্য বৈশ্বিক নিরাপত্তা সতর্কতা জারি

মেলবোর্ন, ২১ জুলাই-  মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের জন্য বৈশ্বিক নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের…

ট্রাম্পের ঘোষণা: যুক্তরাষ্ট্র সফরে গ্রেপ্তার হবেন না নেতানিয়াহু

মেলবোর্ন, ২১ জুলাই- মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র সফরে এলে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে কোনোভাবেই গ্রেপ্তার করা হবে না। নিউইয়র্ক সিটির মেয়র…

মাইলস্টোনে বিমান দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনে যা উঠে এল

মেলবোর্ন, ২১ জুলাই- রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে গত বছরের ২১ জুলাই বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় পাইলটের উড্ডয়ন প্রশিক্ষণের ঘাটতিকে…

চিন্ময় দাসের জামিন নামঞ্জুর, আদালতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী

মেলবোর্ন, ২১ জুলাই- চট্টগ্রামের আলোচিত আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে আদালতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন অ্যাডভোকেট…

ভাইরাল ব্যক্তিগত ভিডিও ঘিরে আলোচনায় জামায়াতের এমপি

মেলবোর্ন, ২১ জুলাই-  সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে একটি ব্যক্তিগত ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে…

আমদানি-রফতানি কমেছে: কোন পথে যাচ্ছে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য?

মেলবোর্ন, ২১ জুলাই- বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে একদিকে আমদানি ও শিল্প বিনিয়োগে স্থবিরতা, অন্যদিকে প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল রফতানি প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। শিল্পের কাঁচামাল…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au