মেলবোর্ন, ২১ ফেব্রুয়ারি- বিচারপ্রার্থীদের বোধগম্য ভাষায় বিচারকার্য পরিচালনার দাবি দীর্ঘদিনের। সংবিধান ও আইনে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও দেশের সর্বোচ্চ আদালত বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট–এ বাংলা ভাষার পূর্ণাঙ্গ প্রয়োগ এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। রায় লেখায় বাংলার ব্যবহার বেড়েছে, আদালত পরিচালনাতেও মাতৃভাষার উপস্থিতি স্পষ্ট, তবে মামলার আরজি, আবেদন ও বহু আইনি পরিভাষায় ইংরেজির ওপর নির্ভরতা রয়ে গেছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ১৫৩ (৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ইংরেজি ও বাংলার মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে বাংলাই প্রাধান্য পাবে। পাশাপাশি ১৯৮৭ সালের বাংলা ভাষা প্রচলন আইনের ৩ ধারায় সরকারি দপ্তর ও আদালতে সব চিঠিপত্র, সওয়াল-জবাব ও আইনগত কার্যাবলি বাংলায় লেখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আইন অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধানও রাখা হয়েছে।
তবে আদালত অঙ্গনের বাস্তব চিত্রে দেখা যায় ভিন্নতা। বিশেষ করে উচ্চ আদালতে এখনও বহু ইংরেজি ও লাতিন শব্দের ব্যবহার প্রচলিত, যেগুলোর যথাযথ বাংলা প্রতিশব্দ অনেক ক্ষেত্রেই সুস্পষ্ট নয়। দীর্ঘদিনের অভ্যাস ও আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর প্রভাবেও ইংরেজি ভাষা প্রাধান্য ধরে রেখেছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফরহাদ উদ্দিন আহমেদ ভূঁইয়া বলেন, বর্তমানে অনেক বিচারক রায় বাংলায় লিখছেন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে আদালত পরিচালিত হচ্ছে বাংলায়। তবে মামলার আরজি বা আবেদন সাধারণত ইংরেজিতেই দাখিল করা হয়। তাঁর মতে, দেশি-বিদেশি অধিকাংশ আইন, চুক্তি ও কনভেনশন ইংরেজিতে প্রণীত হওয়ায় আইনজীবীরা ইংরেজি পরিভাষায় বেশি স্বচ্ছন্দ। বহু আইনি শব্দের প্রমিত বাংলা প্রচলিত না থাকায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
তিনি মনে করেন, সাধারণ মানুষের বোধগম্যতা নিশ্চিত করতে আইনি ইংরেজি ও লাতিন শব্দগুলোর মানসম্মত বাংলা প্রতিশব্দ নির্ধারণ এবং তা ব্যবহারে উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রযুক্তির অগ্রগতিকে কাজে লাগিয়ে আইনি ভাষান্তরের কাজ আরও বিস্তৃত করা যেতে পারে।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, বিচারিক প্রক্রিয়ায় ইংরেজির দীর্ঘ ব্যবহারের ইতিহাস রয়েছে। তাই রাতারাতি পরিবর্তন সম্ভব নয়। তাঁর মতে, ধাপে ধাপে উদ্যোগ নিতে হবে এবং নতুন প্রজন্মের আইনজীবীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও মানসিক প্রস্তুতি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি আরও বলেন, সুপ্রিম কোর্টে বাংলার ব্যবহার নিয়ে যে বিতর্ক ছিল, তার অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা গেছে। এখন নিয়মিতভাবে বাংলায় রায় দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বিশেষ অনলাইন অ্যাপের মাধ্যমে ইংরেজি রায় বাংলায় রূপান্তরের সুযোগও তৈরি হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, ন্যায়বিচারে অংশগ্রহণেরও প্রধান শর্ত। বিচারপ্রার্থীরা যাতে নিজেদের মামলা ও রায়ের ভাষা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেন, সেজন্য আদালতে বাংলার কার্যকর ও প্রমিত প্রয়োগ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন