বিশ্ব

ইরানে খামেনির লৌহকঠিন শাসনের অবসান

যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের ব্যাপক বিমান হামলার প্রথম দিনেই নিহত আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি; রাষ্ট্রীয় টিভিতে মৃত্যুর নিশ্চিতকরণ

  • 1:35 pm - March 01, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১২৫ বার
তিন দশকেরও বেশি সময় পর ইরানে আয়াতুল্লাহ খামেনির শাসনের অবসান।

মেলবোর্ন, ১ মার্চ: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির তিন দশকেরও বেশি সময়ের লৌহকঠিন শাসনের অবসান ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক বিমান হামলার প্রথম দিনেই তিনি নিহত হয়েছেন বলে ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পরে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনও ৮৬ বছর বয়সী এই নেতার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানে মাত্র দুজন সর্বোচ্চ নেতা ছিলেন। খামেনি ১৯৮৯ সাল থেকে এ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। সর্বোচ্চ নেতা পদটি ইরানে সর্বশক্তিমান—তিনি রাষ্ট্রপ্রধান, সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক এবং অভিজাত বিপ্লবী গার্ড বাহিনীরও নিয়ন্ত্রক।

যদিও তিনি প্রচলিত অর্থে একনায়ক ছিলেন না, তবুও জটিল ক্ষমতার কাঠামোর কেন্দ্রে অবস্থান করে রাষ্ট্রনীতির যেকোনো সিদ্ধান্তে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রাখতেন এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে প্রার্থীদের অনুমোদন দিতেন। বর্তমান প্রজন্মের বহু তরুণ ইরানি খামেনিকে ছাড়া কোনো শাসনব্যবস্থা দেখেননি।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তার প্রতিটি পদক্ষেপ প্রচার করা হতো। জনপরিসরে বিলবোর্ডে তার ছবি শোভা পেত, দোকানপাটেও তার প্রতিকৃতি ছিল সর্বত্র। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের প্রেসিডেন্টরা আলোচনায় থাকলেও দেশের ভেতরে প্রকৃত ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ছিল খামেনির হাতেই।

শৈশব ও উত্থান

১৯৩৯ সালে উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে জন্মগ্রহণ করেন আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ধর্মীয় পরিবারে বেড়ে ওঠা খামেনির পিতা ছিলেন শিয়া ইসলামের একজন মধ্যম পর্যায়ের আলেম। শৈশবকে তিনি পরে “দারিদ্র্যপূর্ণ কিন্তু ধর্মভীরু” হিসেবে বর্ণনা করেন। অল্প বয়সেই কোরআন অধ্যয়নে মনোনিবেশ করেন এবং ১১ বছর বয়সে আলেম হিসেবে স্বীকৃতি পান।

ইরানের শাহবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হয়ে তিনি একাধিকবার গ্রেপ্তার হন, নির্যাতনের শিকার হন এবং নির্বাসনে থাকেন। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর বিপ্লবের নেতা রুহুল্লাহ খোমেনি তাকে তেহরানের জুমার নামাজের খতিব নিয়োগ করেন। তার রাজনৈতিক ভাষণ দেশজুড়ে সম্প্রচারিত হতো এবং দ্রুতই তিনি নতুন নেতৃত্বের অংশ হয়ে ওঠেন।

ক্ষমতায় আরোহন ও যুদ্ধকালীন নেতৃত্ব

১৯৮১ সালে এক বোমা হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন এবং স্থায়ীভাবে ডান হাতের শক্তি হারান। একই বছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং ১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যুর পর বিশেষজ্ঞ পরিষদ তাকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচন করে।

তার শাসনামলে ইরান-ইরাক যুদ্ধ (১৯৮০–১৯৮৮) দেশকে রক্তাক্ত করে তোলে। ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আট বছরের যুদ্ধে বিপুল প্রাণহানি ঘটে। যুদ্ধ খামেনির যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি গভীর অবিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করে।

কঠোর অভ্যন্তরীণ নীতি ও মানবাধিকার ইস্যু

পরবর্তী তিন দশকে তিনি সংসদ, বিচারব্যবস্থা, পুলিশ, গণমাধ্যম ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অনুগত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। সমালোচকদের মতে, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও ভিন্নমত দমনে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন তিনি।

১৯৯৯ সালের ছাত্র আন্দোলন, ২০০৯ সালের নির্বাচনী বিক্ষোভ, ২০১৯ সালের জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি বিরোধী প্রতিবাদ—সবকটিই কঠোরভাবে দমন করা হয়। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ অনুযায়ী, বহু মানুষ নিহত ও আটক হন।

২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে শতাধিক মানুষের প্রাণহানির অভিযোগ ওঠে।

পররাষ্ট্রনীতি ও পারমাণবিক বিতর্ক

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খামেনির নেতৃত্বে ইরানকে প্রায়শই একঘরে রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরানকে “অ্যাক্সিস অব ইভিল”-এর অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন।

ইসরায়েলের সঙ্গে বৈরিতা, লেবাননে হিজবুল্লাহকে সমর্থন এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমাদের সঙ্গে দীর্ঘ বিরোধ তার আমলের বৈশিষ্ট্য। যদিও তিনি একসময় পারমাণবিক অস্ত্রকে ‘ইসলামবিরোধী’ ঘোষণা করে ফতোয়া জারি করেছিলেন, তবুও পশ্চিমা বিশ্ব সন্দেহ করে যে ইরান গোপনে পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করেছে।

২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তিতে তিনি সরাসরি বাধা দেননি, তবে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে চুক্তি মানবে কি না সে বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন।

সহিংস পরিস্থিতিতে তার মৃত্যু ইরানের জন্য এক নতুন ও অনিশ্চিত অধ্যায়ের সূচনা করল। দেশটির ক্ষমতার ভারসাম্য, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক রাজনীতিতে এর গভীর প্রভাব পড়তে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

এই শাখার আরও খবর

ঈদুল গাদিরে দুই হাজারের বেশি বন্দিকে সাধারণ ক্ষমা দিলেন মোজতবা খামেনি

মেলবোর্ন,০৬জুন-ইরানের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব ঈদুল গাদির উপলক্ষে দুই হাজারের বেশি দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দির সাজা মওকুফ করেছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মোজতবা খামেনি। শুক্রবার ইরানের বিচার…

তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীদের জন্য বাউবির দরজা সবসময় খোলা: উপাচার্য

মেলবোর্ন,০৬জুন-তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি) প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান। তিনি বলেছেন, শিক্ষা…

অস্ট্রেলিয়া সিরিজে জাতীয় দলে ফিরছেন সালাউদ্দিন, কোচিং স্টাফে বড় পরিবর্তন

মেলবোর্ন,০৬জুন-আসন্ন অস্ট্রেলিয়া সিরিজকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের কোচিং স্টাফে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। কোচিং স্টাফে জনবল সংকট দেখা দেওয়ায় আবারও জাতীয় দলের…

বউকে বাঁচাতে গিয়ে শাশুড়ির মৃত্যু, কটিয়াদীতে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে প্রাণ গেল দুজনের

মেলবোর্ন,০৬জুন-কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলায় মর্মান্তিক বিদ্যুৎস্পৃষ্টের ঘটনায় এক গৃহবধূ ও তার শাশুড়ির মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার দুপুরে উপজেলার আচমিতা ইউনিয়নের উখরাশাল গ্রামে এ দুর্ঘটনা ঘটে। পরিবারের এক…

চার সীমান্ত দিয়ে পুশ–ইন চেষ্টা প্রতিহত করল বিজিবি ও স্থানীয়রা

মেলবোর্ন,০৬জুন-লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ অন্তত ৬০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর (পুশ ইন) চেষ্টা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)।…

ইসরায়েল ও ইরানের ওপর চটলেন লেবাননের প্রধানমন্ত্রী

মেলবোর্ন, ৫ জুন-  দক্ষিণ লেবাননে চলমান সংঘাত ও মানবিক সংকটের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েল এবং ইরান উভয়ের প্রতিই কড়া বার্তা দিয়েছেন লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম। তিনি একদিকে বেসামরিক…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au