মেলবোর্ন, ৩ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি ও ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণার প্রভাব এখন বাংলাদেশকেও ভাবাচ্ছে। হরমুজ প্রণালি হলো বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ, যা পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এই করিডোরের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান তেল ও গ্যাস উৎপাদক দেশগুলো থেকে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এ পথে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন হয়, যা বৈশ্বিক তেলের বাজারের ২০ শতাংশের সমতুল্য।

ছবি: আল জাজিরা
যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সরকার জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প উৎস ও পরিস্থিতি মূল্যায়নে ব্যস্ত। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) পাইপলাইনে থাকা জ্বালানি সরবরাহ ঠিক রাখতে বিশেষ মনোযোগ দিচ্ছে। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে আসা সাতটি এলএনজি কার্গো ইতোমধ্যেই দেশে পৌঁছেছে, দুটি কার্গো নিয়ে কিছুটা সংশয় রয়েছে।
বিপিসির পরিচালক (বাণিজ্য) একেএম আজাদুর রহমান বলেন, “এখনো দেশে ডিজেলের মজুত ১৫ দিন, কেরোসিন মজুত ১০০ দিন, অকটেন ২০-২৫ দিন এবং ফারনেস তেল ৯০ দিন পর্যন্ত পর্যাপ্ত।” অর্থাৎ আপাতত সরবরাহে কোনো বড় সংকট নেই। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে, মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ বন্ধ হলে জ্বালানি ও অন্যান্য খাতে প্রভাব পড়বে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের জ্বালানি চাহিদার সিংহভাগ মেটে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা তেল ও এলএনজিতে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে সরাসরি পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন না পড়লেও, পরোক্ষভাবে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে এবং মূল্যস্ফীতি উসকে দেবে। পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা উল্লেখ করেছেন, তেলের দাম বাড়লে কাঁচামাল ও অন্যান্য উপকরণের মূল্যও বাড়বে, ফলে রপ্তানি বাজারে চাপ পড়বে।
টিএডি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশিকুর রহমান তুহিন বলেন, “সাম্প্রতিক সময়ে জাহাজে হুতিদের হামলার কারণে আফ্রিকার সমুদ্রপথ ব্যবহার করা হচ্ছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলেও সরাসরি সমস্যার সম্মুখীন হয় না, তবে উৎপাদন খরচা বাড়ার পর রপ্তানিতে প্রভাব পড়বে।”
শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক খায়রুল আলম সুজন বলেন, তেলের বাজার অস্থির হলে জাহাজ ভাড়া বাড়বে। দেশের শিল্প, কৃষি, পরিবহন ও বিদ্যুৎ খাতে প্রভাব পড়বে। জ্বালানি তেলের বিকল্প উৎস খুঁজতে হবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শিবির বিচিত্র বড়ুয়া জানিয়েছেন, আপাতত কোনো শঙ্কা নেই, তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে আমদানি নির্ভর পণ্য প্রথমে প্রভাবিত হবে।
অর্থনীতিবিদ কে এ এস মুরশিদ বলেছেন, “ডে-টু-ডে বাজারের উপর নির্ভর করাটা বোকামি। তেলের মজুত রাখার মাধ্যমে ভবিষ্যতে অপ্রত্যাশিত সংকট থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।”
তিনি আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে খাদ্যপণ্য ও ওষুধ আমদানি ও রপ্তানির ক্ষেত্রে বিকল্প পথের ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদে যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে এবং জ্বালানি খাতের অস্থিতিশীলতা উৎপাদন ও রপ্তানিতে প্রভাব ফেলবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর হরমুজ প্রণালি বন্ধের প্রভাব আপাতত সীমিত হলেও, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি ও বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
সূত্র: বিডিনিউজ২৪