বাংলাদেশ

যশোরে উদীচী হামলার ২৭ বছর

রাষ্ট্রের উদাসীনতায় আটকে বিচার, স্বজনদের নীরব কান্নাই যেন ‘তীব্র প্রতিবাদ’

  • 3:20 pm - March 06, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৫৬ বার
উদীচী হামলায় নিহতদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ, কৃত্রিম পা লাগানো আহত এক কর্মী এবং বিস্ফোরণ-পরবর্তী ধ্বংসস্তূপ। ছবি: সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ৬ মার্চ- যশোরে উদীচীর সম্মেলনে ভয়াবহ বোমা হামলার ২৭ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো শেষ হয়নি বিচার প্রক্রিয়া। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের শনাক্ত করা যায়নি, চূড়ান্ত শাস্তিও নিশ্চিত হয়নি। দীর্ঘ এই সময় ধরে বিচার না পাওয়ার হতাশা আর বেদনা নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন নিহতদের স্বজন ও আহতরা।

১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ গভীর রাতে যশোর টাউন হল ময়দানে উদীচীর দ্বাদশ জাতীয় সম্মেলনের শেষ দিনে চলছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সে সময় হঠাৎ পরপর দুটি শক্তিশালী বোমার বিস্ফোরণে মুহূর্তেই রণক্ষেত্রে পরিণত হয় অনুষ্ঠানস্থল। বিস্ফোরণের পর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ধ্বংসস্তূপ, আতঙ্কে ছুটতে থাকে মানুষ। আহতদের আর্তনাদ ও স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। সেই ভয়াবহ হামলায় প্রাণ হারান ১০ জন এবং আহত হন আড়াই শতাধিক সাংস্কৃতিক কর্মী ও দর্শক। অনেকে গুরুতরভাবে আহত হয়ে দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিয়েছেন, কেউ কেউ এখনো শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জীবনযাপন করছেন। দেশের ইতিহাসে সংগঠিত বোমা হামলার অন্যতম ভয়াবহ ঘটনা হিসেবে এই হামলাকে দেখা হয় এবং অনেকের মতে, এ ঘটনার মধ্য দিয়েই দেশে ধারাবাহিক বোমা হামলার এক অন্ধকার অধ্যায়ের সূচনা হয়।

সেই হামলায় নিহত হন নাজমুল হুদা তপন, সন্ধ্যা রানী ঘোষ, নূর ইসলাম, ইলিয়াস মুন্সী, বাবুল সূত্রধর, শাহ আলম মিলন, মোহাম্মদ বুলু, রতন কুমার বিশ্বাস, শাহ আলম পিন্টু ও বাবু রামকৃষ্ণ।

ঘটনার পর টাউন হল ময়দানের রওশন আলী মঞ্চের পাশে নিহতদের স্মরণে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। প্রতি বছর মার্চ মাস এলেই সেখানে ভিড় করেন নিহতদের স্বজন, সাংস্কৃতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষ। অনেকেই নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন, কেউ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। নিহত নাজমুল হুদা তপনের বোন বিউটি আক্তার প্রায়ই সেখানে গিয়ে বসে থাকেন। স্মৃতিস্তম্ভের সামনে দাঁড়ালে তার চোখ ভিজে ওঠে। ভাই হারানোর বেদনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ২৭ বছরেও বিচার না পাওয়ার তীব্র হতাশা। তিনি জানান, তার মা জীবদ্দশায় ছেলের হত্যার বিচার দেখে যেতে পারেননি। এখন তিনিও অসুস্থ, নিজের জীবনেও সেই বিচার দেখতে পারবেন কি না তা নিয়ে শঙ্কায় আছেন।

এই হামলার ভয়াবহ স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন আহতদের অনেকেই। উদীচীর কর্মী সুকান্ত দাস সেই দিনটিকে আজও ভুলতে পারেন না। বিস্ফোরণে তিনি একটি পা হারিয়েছেন, গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার হাত ও কান। এখন কৃত্রিম পা ব্যবহার করে চলাফেরা করতে হয় তাকে। তিনি জানান, ঘটনার সময় তিনি ছিলেন তরুণ। কিন্তু সেই হামলার ক্ষত আজও তার শরীর ও জীবনে গভীরভাবে রয়ে গেছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে নানা রোগও বাসা বেঁধেছে। ২০২২ সালে কানের চিকিৎসার জন্য তাকে ভারতে গিয়ে অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছে। পায়ে সব সময় যন্ত্রণা অনুভব করেন বলে বেশি হাঁটাচলা করতে পারেন না। ডান হাত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় গত ২৭ বছর ধরে বাম হাত দিয়েই খাওয়া, লেখা ও দৈনন্দিন কাজ করতে হয়। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এত বছরেও ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন হয়নি। মামলার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কেও তারা অনেক সময় স্পষ্ট তথ্য পান না।

সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষও এই ঘটনায় বিচার না পাওয়ায় হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক সানোয়ার আলম খান দুলু বলেন, বিভিন্ন সময়ে সরকার পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু তাদের সহকর্মীদের হত্যার বিচার এখনো হয়নি। তিনি বলেন, এত বড় একটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কারা জড়িত ছিল, তা-ও এখনো স্পষ্টভাবে জানা যায়নি। দীর্ঘদিন ধরে বিচার দাবির পরও ফল না পাওয়ায় অনেকের মধ্যেই হতাশা তৈরি হয়েছে।

উদীচী যশোর শাখার সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুর রহমান খান বিপ্লব বলেন, বিচার না পাওয়ার কারণে নিহতদের পরিবার ও আহতরা নিজেদের অসহায় মনে করেন। আহতদের অনেকেই এখনো যোগাযোগ করেন এবং তাদের কষ্টের কথা জানান। অনেকেই মানবেতর জীবনযাপন করছেন। একই সঙ্গে নিহত ১০টি পরিবারের সদস্যরাও নিয়মিত বিচার দাবির কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, বহুবার বিভিন্ন পর্যায়ে দাবি জানানো হলেও এখনো পর্যন্ত রাষ্ট্র এই হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে পারেনি।

আইনজীবীরা বলছেন, আইনি জটিলতার কারণেই মামলাটি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাবেরুল হক সাবু জানান, তদন্ত সংস্থার দেওয়া ত্রুটিপূর্ণ অভিযোগপত্রের কারণে ২০০৬ সালের ৩০ মে আদালত এই মামলার সব আসামিকে খালাস দেন। পরে ২০০৭ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ওই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করলে মামলাটি আবার সচল হয়। খালাস পাওয়া আসামিরা পরে আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নেন। এদের অনেকেই ইতোমধ্যে মারা গেছেন। তবে এখনো আপিল শুনানি শেষ হয়নি। শুনানি শেষ না হলে মামলাটির চূড়ান্ত অগ্রগতি সম্ভব নয় বলেও জানান তিনি।

বিচার না পাওয়ার হতাশার মধ্যেই প্রতি বছর নানা কর্মসূচির মাধ্যমে দিনটি স্মরণ করা হয়। উদীচী ট্র্যাজেডির ২৭তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে শুক্রবার যশোরে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। উদীচী যশোর শাখার উদ্যোগে বেলা সাড়ে ১১টায় প্রতিবাদী সমাবেশ এবং সন্ধ্যায় শহীদদের স্মরণে মশাল প্রজ্বালন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানানো হবে।

এই শাখার আরও খবর

বন্ডাই সন্ত্রাসী হামলার আগে ইহুদিবিদ্বেষের হুমকি অবমূল্যায়িত হয়েছিল: মাইক বার্জেস

সিডনি: বন্ডাই সন্ত্রাসী হামলার আগে অস্ট্রেলিয়ায় ক্রমবর্ধমান ইহুদিবিদ্বেষের ভয়াবহতা নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিরা যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারেননি বলে মন্তব্য করেছেন অস্ট্রেলিয়ান সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশনের (এএসআইও) মহাপরিচালক মাইক…

মাদরাসায় সাত বছরের শিশুকে ছয় মাস ধরে বলাৎকার করছিলেন ৬জন

সাভার পৌর এলাকার শাহীবাগ মহল্লার মারকাযুল উলূম আশ-শরইয়্যাহ মাদরাসায় সাত বছরের এক শিশু শিক্ষার্থীকে প্রায় ছয় মাস ধরে বিভিন্ন সময়ে বলাৎকার ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ…

বাংলাদেশে পানির লবণাক্ততা: নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকিতে উপকূলের মানুষ

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ পানীয় জল দিন দিন দুর্লভ হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলোচ্ছ্বাস ও নদীপথে লবণাক্ত পানি প্রবেশের কারণে উপকূলের বিস্তীর্ণ…

বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় ঢাকায় উদযাপিত হলো জন্মাষ্টমী

যথাযোগ্য মর্যাদায় হিন্দু সম্প্রদায়ের আরাধ্য ভগবান শ্রী কৃষ্ণের জন্মতিথি, শুভ জন্মাষ্টমী ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও আনন্দ উৎসবের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে। জন্মাষ্টমী উপলক্ষে শুক্রবার রাজধানী ঢাকাসহ…

আরজি করের নারী চিকিৎসক ধর্ষণ-হত্যা: সাবেক পৌর চেয়ারম্যান গ্রেপ্তার

কলকাতার আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নারী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় মরদেহ দ্রুত সৎকারের অভিযোগে উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটি পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান ও তৃণমূল…

ব্রিকসে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে ধোঁয়াশা, তারেকের সফর নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা

আসন্ন ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অংশ নেবেন কি না, কিংবা তিনি অংশ না নিলে বাংলাদেশের হয়ে অন্য কোনো প্রতিনিধি সম্মেলনে যোগ দেবেন…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au