তুরস্কের হাতায় প্রদেশে পড়া ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ। ছবি: রয়টার্স
মেলবোর্ন, ১৩ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ইরানের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার নির্ভুলতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে। গোয়েন্দা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একাংশের ধারণা, হামলার লক্ষ্যভেদ আরও নিখুঁত করতে চীনের স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থা ‘বাইডো’ ব্যবহার করে থাকতে পারে তেহরান।
ফ্রান্সের সাবেক বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক আলাঁ জুইয়েঁ এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইসরায়েলের সঙ্গে গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার নির্ভুলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তার মতে, চীন সম্ভবত ইরানকে বাইডো স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার দিয়েছে।
তিনি বলেন, “এই যুদ্ধে সবচেয়ে বড় বিস্ময়ের একটি হলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যভেদের নির্ভুলতা। আট মাস আগের তুলনায় এগুলো অনেক বেশি সঠিকভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করছে, যা নির্দেশনা প্রযুক্তি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।”
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরানের বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা নিহত হন। এর জবাবে ইরান ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে শত শত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করে। ইসরায়েল ও তাদের মিত্ররা এসবের অনেকগুলো প্রতিহত করলেও কিছু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আঘাত হানে।
বিশ্লেষকদের মতে, আগে ইরানের সামরিক বাহিনী প্রধানত যুক্তরাষ্ট্রের গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম বা জিপিএসের ওপর নির্ভর করত। তবে যুক্তরাষ্ট্র চাইলে এই সংকেত সীমিত বা বিঘ্নিত করতে পারে। কিন্তু চীনের বাইডো সিস্টেম ব্যবহার করলে সেই সংকেত বন্ধ করা ওয়াশিংটনের জন্য অনেক কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে ইরান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি যে তারা বাইডো স্যাটেলাইট ব্যবস্থা ব্যবহার করছে। তেহরান এ বিষয়ে কোনো মন্তব্যও করেনি।
চীনের তৈরি বাইডো স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের জিপিএসের বিকল্প হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। ২০২০ সালে এই ব্যবস্থার সর্বশেষ সংস্করণ চালু করা হয়। একই বছর জুলাইয়ে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে এক অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আনুষ্ঠানিকভাবে এর উদ্বোধন করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের জিপিএস ব্যবস্থায় ২৪টি স্যাটেলাইট থাকলেও বাইডো নেটওয়ার্কে রয়েছে প্রায় ৪৫টি স্যাটেলাইট। এ ছাড়া বিশ্বের বড় নেভিগেশন ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে রাশিয়ার গ্লোনাস এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের গ্যালিলিওতেও ২৪টি করে স্যাটেলাইট রয়েছে।
বাইডো ব্যবস্থায় মহাকাশ অংশ, স্থল নিয়ন্ত্রণ অংশ এবং ব্যবহারকারী অংশ মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো রয়েছে। এতে গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন, পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র এবং স্যাটেলাইটের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার বিশেষ অবকাঠামো রয়েছে।
চীন–ইরান সম্পর্ক নিয়ে গবেষক থিও নেনচিনি জানান, ২০১৫ সালেই ইরান তাদের সামরিক অবকাঠামোতে বাইডো–২ প্রযুক্তি যুক্ত করার জন্য একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল জিপিএসের বেসামরিক সংকেতের তুলনায় আরও নির্ভুল স্যাটেলাইট সংকেত ব্যবহার করা।
তার মতে, ২০২১ সালে চীন ও ইরানের মধ্যে কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষরের পর এই সহযোগিতা আরও জোরদার হয়। তখন চীন ইরানকে বাইডোর এনক্রিপ্টেড সামরিক সংকেত ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে থাকতে পারে।
এর পর থেকে ইরান ধীরে ধীরে তাদের ড্রোন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং নিরাপদ যোগাযোগ নেটওয়ার্কে বাইডোর ব্যবহার বাড়াতে শুরু করে। ২০২১ সালের পর থেকে তারা পর্যায়ক্রমে মার্কিন জিপিএস ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমিয়েছে বলেও ধারণা করা হয়।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক এলিয়াহ ম্যাগনিয়ার বলেন, আগে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো মূলত ‘ইনার্শিয়াল নেভিগেশন সিস্টেম’-এর ওপর নির্ভর করত। এই প্রযুক্তি বাইরের হস্তক্ষেপ প্রতিরোধ করতে সক্ষম হলেও দীর্ঘ দূরত্বে লক্ষ্যভেদের ক্ষেত্রে সামান্য ত্রুটি থেকে যায়।
স্যাটেলাইট নেভিগেশন যুক্ত হলে সেই ত্রুটি অনেকটাই কমে যায় এবং ক্ষেপণাস্ত্র আরও নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাইডো সিস্টেমের ‘মার্জিন অব এরর’ এক মিটারেরও কম। তাছাড়া এতে শর্ট মেসেজ প্রযুক্তি রয়েছে, যার মাধ্যমে উৎক্ষেপণের পরও প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূর থেকে ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথ পরিবর্তন করা সম্ভব।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক প্যাট্রিসিয়া মারিন্স বলেন, বাইডো–৩ এর সামরিক সংকেত এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে সেটিকে জ্যাম বা বিঘ্নিত করা প্রায় অসম্ভব।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের হাতে যদি বাইডো প্রযুক্তির পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার থাকে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
থিও নেনচিনি মনে করেন, এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা প্রমাণিত হলে ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোও মার্কিন জিপিএসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকতে পারে।
অন্যদিকে বিশ্লেষকদের ধারণা, এই সংঘাতের মধ্য দিয়ে চীনও তাদের স্যাটেলাইট প্রযুক্তির সক্ষমতা পরোক্ষভাবে পরীক্ষা করার সুযোগ পাচ্ছে।