বিশ্ব

আর্টেমিস-২ মিশন শুরু

চাঁদের পথে ১০ দিনের মানবযাত্রা, নতুন ইতিহাস গড়তে আর কত দেরি?

  • 1:31 pm - April 02, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৫২ বার
৫৩ বছর পর আবার চাঁদের পথে মানুষ, ইতিহাস গড়ল নাসা। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ২ এপ্রিল- প্রায় ৫৩ বছর পর আবারও মানুষকে চাঁদের কক্ষপথে পাঠিয়ে নতুন ইতিহাস রচনা করল মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। ১৯৭২ সালে অ্যাপোলো-১৭ মিশনের মাধ্যমে সর্বশেষ মানুষ চাঁদে গিয়েছিল। এরপর দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও আর কোনো মানববাহী মিশন চাঁদের দিকে পাঠানো হয়নি। সেই দীর্ঘ বিরতি ভেঙে আর্টেমিস-২ মিশনের মাধ্যমে আবারও মানব সভ্যতা গভীর মহাকাশ অভিযাত্রায় বড় এক পদক্ষেপ নিল।

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের কেনেডি মহাকাশ কেন্দ্র থেকে স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যা ৬টা ২৪ মিনিটের কিছু পর অত্যন্ত শক্তিশালী এসএলএস রকেটের মাধ্যমে আর্টেমিস-২ মিশনের সফল উৎক্ষেপণ সম্পন্ন হয়। উৎক্ষেপণের আগে কিছু প্রযুক্তিগত জটিলতা দেখা দেয়, বিশেষ করে লঞ্চ অ্যাবোর্ট সিস্টেম এবং একটি ব্যাটারি সংক্রান্ত সমস্যা। তবে নাসার প্রকৌশলীরা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে পুরোনো স্পেস শাটল কর্মসূচির কিছু যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে সমস্যার সমাধান করেন। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই উৎক্ষেপণ সম্ভব হয়।

উৎক্ষেপণের মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত রোমাঞ্চকর। বিশাল রকেটটি যখন জ্বলে ওঠা আগুনের শিখা আর প্রচণ্ড শব্দের সঙ্গে আকাশে উঠে যায়, তখন পুরো কেনেডি স্পেস সেন্টারজুড়ে উচ্ছ্বাস আর আবেগের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শুধু চোখে দেখা নয়, রকেটের শক্তি শরীরের ভেতর পর্যন্ত অনুভূত হচ্ছিল। কয়েক মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি শক্তি উৎপন্ন করে রকেটটি মহাকাশের দিকে ছুটে যায়।

আর্টেমিস-২ মিশন। ছবিঃ রয়টার্স

এই ঐতিহাসিক অভিযানে অংশ নিয়েছেন চারজন নভোচারী—মিশন কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান, পাইলট ভিক্টর গ্লোভার, মিশন বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিনা কচ এবং কানাডার জেরেমি হ্যানসেন। এই চারজনের দলটি শুধু একটি মহাকাশযাত্রাই নয়, বরং মানব ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে চলেছে। তাদের মধ্যে তিনজনের আগেও মহাকাশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থাকলেও জেরেমি হ্যানসেনের জন্য এটি প্রথম মহাকাশযাত্রা।

উৎক্ষেপণের কিছু সময়ের মধ্যেই মহাকাশযানটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল অতিক্রম করে কক্ষপথে প্রবেশ করে। কক্ষপথে পৌঁছানোর পর নভোচারীরা জানান, তারা চাঁদের উদয় এবং পৃথিবীর মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখতে পাচ্ছেন। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার দৃশ্য তাদের কাছে ছিল অত্যন্ত চমকপ্রদ।

এই মিশনে নভোচারীরা ‘ওরিয়ন’ নামের অত্যাধুনিক মহাকাশযানে যাত্রা করছেন, যা গভীর মহাকাশে মানুষের নিরাপদ ভ্রমণের জন্য তৈরি করা হয়েছে। এতে রয়েছে উন্নত জীবনরক্ষা ব্যবস্থা, শক্তিশালী নেভিগেশন প্রযুক্তি, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং তাপরোধী ঢাল।

উৎক্ষেপণের পর প্রথম ২৪ ঘণ্টা মহাকাশযানটি পৃথিবীর চারপাশে কয়েকবার প্রদক্ষিণ করবে। এই সময় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত পরীক্ষা চালানো হবে। নভোচারীরা নিজ হাতে মহাকাশযান পরিচালনা করে এর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা পরীক্ষা করবেন। ভবিষ্যতে চাঁদে অবতরণ মিশনের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

এই মিশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ‘ট্রান্স-লুনার ইনজেকশন’ ধাপ, যেখানে মহাকাশযানটি পৃথিবীর কক্ষপথ ছাড়িয়ে চাঁদের দিকে যাত্রা শুরু করবে। এই সময় মহাকাশযানটি প্রচণ্ড গতিতে এগিয়ে যাবে এবং পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ছাড়িয়ে গভীর মহাকাশে প্রবেশ করবে। এই ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন হলে নভোচারীরা আর শুধু পৃথিবীর কক্ষপথে সীমাবদ্ধ থাকবেন না, বরং তারা চাঁদের পথে যাত্রা করবেন।

চাঁদের দিকে যাত্রা করতে প্রায় চার দিন সময় লাগবে। এই সময় নভোচারীরা বিভিন্ন জরুরি পরিস্থিতির মহড়া দেবেন, যেমন সৌর বিকিরণ ঝড়ের সময় কীভাবে নিরাপদ থাকতে হবে। তারা নিজেদের ওপর চিকিৎসা সংক্রান্ত পরীক্ষাও চালাবেন এবং গভীর মহাকাশে মানুষের শরীরের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করবেন।

মিশনের এক পর্যায়ে মহাকাশযানটি পৃথিবী থেকে প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার মাইল দূরত্বে পৌঁছাবে এবং চাঁদের পেছনের অংশ ঘুরে আসবে। এই সময় তারা চাঁদের পৃষ্ঠের অত্যন্ত বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ করবেন। ক্রিস্টিনা কচ জানিয়েছেন, তারা প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চাঁদের পৃষ্ঠ বিশ্লেষণ করার সুযোগ পাবেন।

এই মিশনে ব্যবহৃত মহাকাশযানের সৌর প্যানেলগুলো খুলে দেওয়া হয়েছে, যা সূর্যের আলো থেকে শক্তি সংগ্রহ করে মহাকাশযান পরিচালনা করছে। প্রতিটি প্যানেলে হাজার হাজার সৌর কোষ রয়েছে, যা দীর্ঘ যাত্রায় প্রয়োজনীয় শক্তি সরবরাহ করবে।

অভিযানের শুরুতে একটি ছোটখাটো সমস্যা দেখা দেয় মহাকাশযানের টয়লেট ব্যবস্থায়, যেখানে একটি সতর্ক সংকেত জ্বলে ওঠে। যদিও এটি বড় কোনো সমস্যা নয় বলে জানানো হয়েছে এবং প্রকৌশলীরা বিষয়টি পর্যবেক্ষণে রেখেছেন।

নাসা জানিয়েছে, উৎক্ষেপণের পর কিছু সময়ের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থায় সমস্যা হয়েছিল, তবে তা দ্রুত সমাধান করা হয়েছে। বর্তমানে নভোচারীরা নিরাপদে আছেন এবং ভালো মানসিক অবস্থায় রয়েছেন।

এই মিশনের মাধ্যমে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস সৃষ্টি হতে যাচ্ছে। ভিক্টর গ্লোভার হচ্ছেন প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নভোচারী, যিনি চাঁদের এত কাছে পৌঁছাবেন। ক্রিস্টিনা কচ হচ্ছেন প্রথম নারী নভোচারী, যিনি চাঁদের কক্ষপথে যাওয়ার মিশনে অংশ নিচ্ছেন। আর জেরেমি হ্যানসেন হচ্ছেন প্রথম কানাডিয়ান নভোচারী, যিনি পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথের বাইরে যাচ্ছেন।

উৎক্ষেপণের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নাসা ও নভোচারীদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি এই মিশনকে মানবজাতির জন্য একটি বিশাল অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বলেন, এই রকেট মানব ইতিহাসে সবচেয়ে দূরত্বে যাওয়া মানববাহী রকেটগুলোর একটি হতে যাচ্ছে।

মিশন শেষে মহাকাশযানটি পৃথিবীতে ফিরে আসবে। ফেরার সময় এটি অত্যন্ত উচ্চ গতিতে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করবে, যেখানে তাপরোধী ঢাল তীব্র তাপ থেকে এটিকে রক্ষা করবে। এরপর প্যারাসুটের সাহায্যে এটি প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করবে এবং সেখান থেকে মার্কিন নৌবাহিনী নভোচারীদের উদ্ধার করবে।

নাসার আর্টেমিস কর্মসূচি একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, যার লক্ষ্য চাঁদে মানুষের স্থায়ী উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে মানুষ পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া। আর্টেমিস-২ এই কর্মসূচির প্রথম মানববাহী মিশন, যা ভবিষ্যতের আরও বড় অভিযানের পথ তৈরি করবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মিশন শুধু একটি প্রযুক্তিগত সাফল্য নয়, বরং মানব সভ্যতার ভবিষ্যৎ অভিযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। পৃথিবীর সীমানা পেরিয়ে নতুন জগৎ অন্বেষণের যে স্বপ্ন মানুষ বহুদিন ধরে দেখে আসছে, আর্টেমিস-২ সেই স্বপ্নকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল।

সূত্রঃ বিবিসি

এই শাখার আরও খবর

ইয়েমেনে ভয়াবহ সংঘর্ষ, একদিনেই নিহত ১৪১

ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার-সমর্থিত বাহিনী ও ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষে অন্তত ১৪১ যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। শনিবার দুপুর থেকে রোববার ভোর পর্যন্ত কয়েকটি…

সন্তানকে সম্পত্তি দানের পরও বাবা-মায়ের অধিকার, সংসদে বিল পাস

সন্তান বা নাতি-নাতনিকে সম্পত্তি দান করার পরও দাতার জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তি ভোগ ও দখলে রাখার অধিকার নিশ্চিত করতে ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে…

বিতর্কিত ১০০ কোটি ডলারের এলএনজি চুক্তি, বড় ধরণের জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় বাংলাদেশ

বাংলাদেশের জ্বালানি খাত বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই রাজনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে উচ্চ ব্যয়ের একটি নতুন ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক…

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ আরও ছয় মাস চলতে পারে: সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া সামরিক সংঘাত আরও অন্তত ছয় মাস চলতে পারে বলে সতর্ক করেছেন সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিওন প্যানেটা।…

রাষ্ট্র-মালিকানাধীন ৬ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা

রাষ্ট্র-মালিকানাধীন দেশের ছয়টি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে জনতা ব্যাংক পিএলসিতে। গত ৩০…

কোণঠাসা বিজেপি কি ফের কট্টর হিন্দুত্বের পথে?

টানা আড়াই দশক ধরে ভারতের রাজনীতিতে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকা ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নানা কারণে এখন কিছুটা চাপে। এই পরিস্থিতিতে দলটি আবারও কট্টর হিন্দুত্বের রাজনীতির…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au