চন্দ্রাভিযান শেষে পৃথিবীতে ফিরলেন চার নভোচারী। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১১ এপ্রিল- চাঁদের কক্ষপথ প্রদক্ষিণের ঐতিহাসিক অভিযান সফলভাবে শেষ করে পৃথিবীতে ফিরেছেন আর্টেমিস-২ মিশনের চার নভোচারী। শনিবার সকাল ৬টা ৭ মিনিটে (যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় শুক্রবার রাত ৮টা ৭ মিনিট) তাঁদের বহনকারী ওরিয়ন মহাকাশযান ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো উপকূলসংলগ্ন প্রশান্ত মহাসাগরে নিরাপদে অবতরণ করে।
সমুদ্রে অবতরণের পরপরই মিশনের কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান ওরিয়ন ক্যাপসুলের ভেতর থেকে নভোচারীদের শারীরিক অবস্থার বিষয়ে ইতিবাচক বার্তা দেন। তিনি জানান, পুরো যাত্রা ছিল অসাধারণ এবং চারজন নভোচারীই সুস্থ আছেন। তাঁর ভাষায়, সবাই ‘গ্রিন’ অবস্থায় রয়েছেন, অর্থাৎ শারীরিকভাবে কোনো জটিলতা নেই।
নাসার উদ্ধার কার্যক্রম অনুযায়ী, অবতরণের পরপরই নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় নভোচারীদের ক্যাপসুল থেকে বের করে আনার প্রস্তুতি শুরু হয়। আর্টেমিস-২ ল্যান্ডিং ও রিকভারি কার্যক্রমের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লিলিয়ানা ভিলারিয়াল জানান, প্রায় দুই ঘণ্টার মধ্যে পুরো উদ্ধার কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে। এরপর নভোচারীদের মার্কিন নৌবাহিনীর উদ্ধারকারী জাহাজ ইউএসএস জন পি. মুরথা–এর মেডিকেল বিভাগে নেওয়া হবে।
উদ্ধার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রথমে নভোচারীদের ক্যাপসুলসংলগ্ন একটি ভেলায় আনা হয়, যাকে ‘ফ্রন্ট পোর্চ’ বলা হয়। এরপর সেখান থেকে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে তাঁদের উদ্ধারকারী জাহাজে স্থানান্তর করা হয়। নাসার ফ্লাইট কন্ট্রোলার জেফ র্যাডিগান জানান, সমুদ্র শান্ত থাকলে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সাধারণত ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট সময় লাগে।
জাহাজে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে নভোচারীদের উড়োজাহাজে করে যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে অবস্থিত জনসন মহাকাশ কেন্দ্রে নেওয়া হবে, যেখানে তাদের আরও বিস্তারিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ করা হবে।
১০ দিনের এই চন্দ্রাভিযান শুরু হয়েছিল ১ এপ্রিল। এতে অংশ নেন যুক্তরাষ্ট্রের নভোচারী রিড ওয়াইজম্যান, ক্রিস্টিনা কোচ, ভিক্টর গ্লোভার এবং কানাডার জেরেমি হ্যানসেন। পুরো মিশনজুড়ে তারা চাঁদের কক্ষপথ প্রদক্ষিণ করে পৃথিবীতে ফিরে আসেন।
এই মিশনটি একাধিক দিক থেকে ইতিহাস গড়েছে। চাঁদের দূরবর্তী অংশে অবস্থানকালে নভোচারীরা পৃথিবী থেকে প্রায় ২ লাখ ৫২ হাজার ৭৫৭ মাইল দূরে অবস্থান করেন, যা ১৯৭০ সালের অ্যাপোলো-১৩ মিশনের রেকর্ড ভেঙে নতুন উচ্চতা তৈরি করে।
একই সঙ্গে এই অভিযানে ভিক্টর গ্লোভার প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নভোচারী হিসেবে, ক্রিস্টিনা কোচ প্রথম নারী হিসেবে এবং জেরেমি হ্যানসেন প্রথম অ-মার্কিন হিসেবে চাঁদের কক্ষপথে ভ্রমণের কৃতিত্ব অর্জন করেন।
মিশন চলাকালে নভোচারীরা চাঁদের পৃষ্ঠে একাধিক বিরল দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন। বিশেষ করে অন্তত ছয়টি উজ্জ্বল উল্কাপাত সরাসরি দেখার অভিজ্ঞতা তাদের জন্য ছিল অনন্য।
আর্টেমিস-২ মিশনকে নাসার ভবিষ্যৎ চন্দ্রাভিযানের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষামূলক ধাপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ২০২৮ সালের মধ্যে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে মানুষ পাঠানোর যে পরিকল্পনা রয়েছে, এই মিশন তার প্রস্তুতির অংশ।
ঐতিহাসিক এই প্রত্যাবর্তন বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্প্রচার মাধ্যমে সরাসরি দেখানো হয়। সব মিলিয়ে, আর্টেমিস-২ মিশনের সফল সমাপ্তি মহাকাশ গবেষণায় নতুন এক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্রেঃ এএফপি