ফের হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধ
মেলবোর্ন, ১৮ এপ্রিল- বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে আবারও অবরোধ জারি করেছে ইরান। শনিবার দেশটির প্রতিরক্ষা…
মেলবোর্বন। ১৮ এপ্রিল- ভারতের লোকসভায় নারী সংরক্ষণ ও আসন বৃদ্ধি–সংক্রান্ত বহুল আলোচিত সংবিধান সংশোধনী বিল শেষ পর্যন্ত পাস করাতে ব্যর্থ হয়েছে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার। সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেও প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন না পাওয়ায় বিলটি বাতিল হয়ে যায়। এই ঘটনার পর দেশটির সংসদ ও রাজনীতিতে নতুন করে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে, পাশাপাশি ভবিষ্যতে নির্বাচন ব্যবস্থা ও প্রতিনিধিত্ব নিয়ে নানা প্রশ্নও সামনে এসেছে।
শুক্রবার লোকসভায় অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে বিলটির পক্ষে ২৯৮টি ভোট পড়ে এবং বিপক্ষে পড়ে ২৩০টি ভোট। মোট ৫২৮ জন সাংসদ এতে অংশ নেন। যদিও সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য বিলের পক্ষে অবস্থান নেন, কিন্তু সংবিধান সংশোধনী বিল পাসের জন্য উপস্থিত সদস্যদের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন হয়। সেই শর্ত পূরণ না হওয়ায় বিলটি গৃহীত হয়নি। ফলে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এই উদ্যোগ কার্যত ভেস্তে যায়।
এই বিলের মাধ্যমে লোকসভা এবং বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভায় নারীদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণের পাশাপাশি লোকসভার মোট আসন সংখ্যা বাড়িয়ে ৮৫০ করার প্রস্তাব ছিল। কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী অর্জুন রাম মেঘওয়াল সংসদে বিলটি উত্থাপন করেন। সংসদের বিশেষ অধিবেশনে এটি ছিল সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিল, যা নিয়ে সরকার ব্যাপক রাজনৈতিক সমর্থন গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিল।

ভারতের লোকসভা। ছবিঃ সংগৃহীত
বিলটি নিয়ে সংসদে দুই দিন ধরে দীর্ঘ ও উত্তপ্ত আলোচনা হয়। সরকারপক্ষের হয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেন, দেশের অনেক নির্বাচনী আসনে ভোটারের সংখ্যা অত্যন্ত বেশি হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও প্রায় ৪৮ লাখ ভোটার একটি আসনে অন্তর্ভুক্ত, যা একজন সাংসদের পক্ষে যথাযথভাবে প্রতিনিধিত্ব করা কঠিন করে তোলে। তিনি যুক্তি দেন, এই পরিস্থিতিতে আসন সংখ্যা বৃদ্ধি করা জরুরি, যাতে জনগণের সেবা ও প্রতিনিধিত্ব আরও কার্যকর হয়। একই সঙ্গে তিনি বিরোধীদের উদ্দেশে আহ্বান জানান, তারা যেন নারী সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে বিলটির পক্ষে ভোট দেন।
তবে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র সদস্যরা শুরু থেকেই বিলটির বিরোধিতা করে আসছিলেন এবং ভোটাভুটির সময়ও তারা নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকেন। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, সরকার নারী সংরক্ষণের বিষয়টিকে সামনে রেখে মূলত রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করছে। তাদের মতে, আসন সংখ্যা বৃদ্ধি ও পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের একটি কৌশল হিসেবে এই বিল আনা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের রায়গঞ্জে ১৪ই এপ্রিল একটি নির্বাচনী জনসভায় ভাষণ দিচ্ছেন ভারতের লোকসভার বিরোধী দলনেতা ও কংগ্রেসের শীর্ষনেতা রাহুল গান্ধী৷, ছবিঃ সংগৃহীত
বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী সংসদে বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেন, সরকার দেশের নির্বাচনী মানচিত্র পরিবর্তনের চেষ্টা করছে, যাতে উত্তর ভারতে আসনের সংখ্যা বাড়ে এবং দক্ষিণ ভারতের প্রভাব কমে যায়। তার মতে, এটি গণতান্ত্রিক ভারসাম্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তিনি আরও বলেন, বিরোধী দলগুলো একজোট হয়ে এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ করবে এবং দেশের জনগণের অধিকার রক্ষায় কাজ করবে।
বিরোধী নেতাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আপত্তি ছিল, নারী সংরক্ষণ বিলের সঙ্গে আসন বৃদ্ধি ও পুনর্বিন্যাসের মতো পৃথক বিষয়কে একসঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে কেন। তাদের দাবি, ২০২৩ সালে পাস হওয়া নারী সংরক্ষণ আইনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, প্রথমে জনগণনা সম্পন্ন হবে, এরপর আসন পুনর্বিন্যাস করা হবে এবং তারপর সেই আসনের ৩৩ শতাংশ নারীদের জন্য সংরক্ষণ করা হবে। কিন্তু বর্তমান বিলে সেই ধাপগুলো এড়িয়ে সরাসরি দুটি বিষয় একত্রে যুক্ত করা হয়েছে, যা তাদের কাছে সন্দেহজনক মনে হয়েছে।
বিরোধীদের মতে, এই প্রক্রিয়ায় অনগ্রসর শ্রেণির নারীরা বিশেষভাবে বঞ্চিত হতে পারেন। কারণ জনগণনার আগে আসন পুনর্বিন্যাস করলে বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে।
অন্যদিকে, সরকারপক্ষ দাবি করেছে, নারী সংরক্ষণ বিলের বিরোধিতা মানেই নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের বিরোধিতা করা। তারা বলছে, দীর্ঘ চার দশক ধরে নারী সংরক্ষণ নিয়ে আলোচনা হলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, তাই এবার তা বাস্তবায়নের সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত নয়।
ভোটাভুটির আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সংসদ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করার এটি একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সবাই বিলটির পক্ষে অবস্থান নেবেন। তবে বাস্তবে তার সেই আহ্বান প্রত্যাশিত সাড়া পায়নি।
এই বিলটি পাস না হওয়ায় সরকার পরবর্তী দুটি বিল নিয়েও ভোটাভুটিতে যায়নি। এর মধ্যে একটি ছিল লোকসভা আসন পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত বিল এবং অন্যটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোর আসন বৃদ্ধি সংক্রান্ত সংশোধনী বিল। ফলে পুরো আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়াই কার্যত থমকে যায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিল পাস না হওয়া ভারতের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করতে পারে। একদিকে নারী সংরক্ষণ প্রশ্নটি আবারও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ল, অন্যদিকে আসন বৃদ্ধি ও পুনর্বিন্যাস নিয়ে ভবিষ্যতে আরও বড় রাজনৈতিক সংঘাত দেখা দিতে পারে।
এ ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও সংবিধান সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিস্তৃত রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর করা সম্ভব নয়। ফলে ভবিষ্যতে এ ধরনের বিল পাস করতে হলে সরকারকে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আরও সমন্বয় ও আলোচনা বাড়াতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্রঃ আনন্দবাজার
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au