সিডনি অপেরা হাউসে বর্ণাঢ্য বৈশাখী উদ্যাপন। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২০ এপ্রিল- অস্ট্রেলিয়ার সিডনি অপেরা হাউসে প্রথমবারের মতো বাঙালির প্রাণের উৎসব বাংলা নববর্ষকে ঘিরে বৈশাখী উৎসব উদ্যাপিত হয়েছে। ১৭ এপ্রিল সন্ধ্যায় বিশ্বের অন্যতম এই স্থাপত্য নিদর্শনের মঞ্চে নাচ, গান ও বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ। প্রবাসে থেকেও যেন এক টুকরো বাংলাদেশ তৈরি হয় অপেরা হাউসের ভেতরে।
অনুষ্ঠান কক্ষে প্রবেশ করতেই ভেসে আসে ঢোল, খোল-করতাল ও নূপুরের পরিচিত শব্দ। বাইরে প্রশান্ত মহাসাগরের নীল জলরাশি, আর ভেতরে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির উচ্ছ্বাস—দুই ভিন্ন জগতের এক অনন্য মেলবন্ধন তৈরি করে এই আয়োজন।
উৎসব উপলক্ষে এক বিশেষ বার্তায় অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ প্রবাসী বাঙালিদের শুভেচ্ছা জানান। তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়ার বৈচিত্র্যই দেশটির শক্তি, আর এই ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজন সেই বৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করে।
নিউ সাউথ ওয়েলসের মুখ্যমন্ত্রী ক্রিস মিনস প্রথাগত আনুষ্ঠানিকতা ভেঙে সাধারণ দর্শকদের সঙ্গে মিশে অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। প্রবাসীদের সঙ্গে আলাপ, ছবি তোলা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুভেচ্ছা বার্তায় তিনি জানান, বাঙালিরা এখন সিডনির অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং এই আয়োজন তাদের মেধা ও ঐক্যের প্রতিফলন।

উৎসবজুড়ে পরিবেশিত হয় বাঙালির ধ্রুপদি ও লোকজ সংস্কৃতির নানা উপস্থাপনা। ছবিঃ সংগৃহীত
অপেরা হাউস চত্বরে পতাকা, প্ল্যাকার্ড ও বর্ণাঢ্য সাজে বের হয় বৈশাখী শোভাযাত্রা। প্রবাসী বাঙালিদের এই আনন্দময় অংশগ্রহণ দেখে সেখানে উপস্থিত বিদেশি পর্যটকেরাও করতালির মাধ্যমে তাদের সমর্থন জানান।
উৎসবজুড়ে পরিবেশিত হয় বাঙালির ধ্রুপদি ও লোকজ সংস্কৃতির নানা উপস্থাপনা। রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি ও লোকগানের সুরে সুরে নৃত্য পরিবেশন দর্শকদের আবেগাপ্লুত করে তোলে। শোভাযাত্রায় সমবেত কণ্ঠে গাওয়া হয় ‘এসো হে বৈশাখ’। পাশাপাশি ‘হায় রে মানুষ রঙিন ফানুস’, ‘আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে’, ‘হারানো দিনের কথা মনে পড়ে যায়’সহ জনপ্রিয় গান পরিবেশিত হয়। ‘রেললাইন বহে সমান্তরাল’ ও নজরুলসংগীত ‘আলগা কর গো খোঁপার বাঁধন’ও দর্শকদের মুগ্ধ করে।
আয়োজক আবু রেজা আরেফিন বলেন, বিশ্বমঞ্চে বাঙালির শিকড় ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরা ছিল দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মিহির রায়ের মতে, বৈশ্বিক মঞ্চে বাংলা নববর্ষের এই উদ্যাপন গর্বের এক অধ্যায়। প্রবাসী মাবরুকা রহমানও এই আয়োজনকে বাংলাদেশিদের মূলধারায় স্বীকৃতি পাওয়ার নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করেন।

রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি ও লোকগানের সুরে সুরে নৃত্য পরিবেশন দর্শকদের আবেগাপ্লুত করে তোলে। ছবিঃ সংগৃহীত
অনুষ্ঠানে সঞ্চালনা করেন আসাদ শামস ও রোকসানা হোসেন জেবা। সংগীত পরিবেশন করেন নাবিলা আফ্রিদি, লুবাবা ইসলাম, অমিয়া মতিন, মেহেদী হাসান, মামুন হাসান খান, রাশনান জামান ও নিশাত সিদ্দিকী। নৃত্য পরিবেশনায় অংশ নেন শ্রেয়সী দাস, অঙ্কিতা রায়, ঐশিতা রায়, স্বাগতা চ্যাটার্জী, দেবযানী পাল ও পৌলোমী পান্ডা। কবিতা আবৃত্তি করেন মলয় বিশ্বাস এবং শ্রুতিনাট্যে অংশ নেন নুসরাত জাহান ও নাবিলা আফ্রিদি।
যন্ত্রীদলে ছিলেন অভিজিৎ দান (তবলা), সোহেল খান (গিটার), রাশনান জামান (কীবোর্ড), সাবিন ঘিসিং (বাঁশি) ও সৃজিত দান (শব্দ নিয়ন্ত্রণ)।
জন্মভূমি মিডিয়া, বাংলাদেশ লেডিস ক্লাব এবং বাংলাদেশ প্রেস মিডিয়া অ্যান্ড কালচারাল ক্লাবের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠান প্রমাণ করেছে, হাজার মাইল দূরে থেকেও বাঙালির শিকড়, সংস্কৃতি ও আবেগ এখনো অটুট রয়েছে।