যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে কবে ফিরবে লিমনের লাশ
মেলবোর্ন, ২৯ এপ্রিল- যুক্তরাষ্ট্রে নিহত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমনের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে আরও এক থেকে দুই দিন সময় লাগতে পারে…
মেলবোর্ন, ২৯ এপ্রিল- একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় চারদিকে যুদ্ধ, মৃত্যু আর অনিশ্চয়তার মধ্যে সীমান্তের ওপারে ভারতের ত্রিপুরায় গড়ে উঠেছিল এক অনন্য মানবিক উদ্যোগ ‘বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল’। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের চিকিৎসা দিতে গড়ে ওঠা সেই অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্রই পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ স্বাস্থ্যভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের জন্ম দেয়। মুক্তিযুদ্ধের সহোদর হিসেবে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠান সাভারের মির্জানগরে সদর দপ্তর স্থাপন করে ধীরে ধীরে সারা দেশে বিস্তার লাভ করে। বর্তমানে এর ৪৩টি উপকেন্দ্র, গণবিশ্ববিদ্যালয়, ওষুধ উৎপাদন, নারী উন্নয়ন, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, কৃষি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক উন্নয়নসহ বিস্তৃত কার্যক্রম রয়েছে। দেশের স্বাস্থ্যখাতে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি স্বাধীনতা পুরস্কারও অর্জন করে।
কিন্তু দীর্ঘদিনের এই গৌরবময় ইতিহাসের বিপরীতে সাম্প্রতিক সময়ে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রকে ঘিরে তৈরি হয়েছে গুরুতর বিতর্ক, অভিযোগ ও দখলের নাটকীয় ঘটনা। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এই প্রতিষ্ঠানটি মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর পেছনে জড়িত হিসেবে নাম এসেছে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৩ সালের ১১ এপ্রিল গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মৃত্যু ঘটার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটি ঘিরে অস্থিরতা শুরু হয়। সেই সময় থেকেই একটি পক্ষ প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা চালায়। এই প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় ২০২৪ সালের ২৪ আগস্ট, যখন অর্ধশতাধিক ব্যক্তি সাভারের মির্জানগরে অবস্থিত গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সদর দপ্তরে প্রবেশ করে এক ধরনের মব পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।
ঘটনার দিন উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শী ও কর্মকর্তাদের বর্ণনায় জানা যায়, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ৫০ থেকে ৬০ জনের একটি দল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালকের কার্যালয়ে ঢুকে পড়ে। তারা প্রতিষ্ঠানের একমাত্র জীবিত প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি মুক্তিযোদ্ধা ডা. নাজিমউদ্দিন আহমেদ এবং পরিচালক ডা. মাহবুব জুবায়েরকে পদত্যাগের জন্য চাপ দিতে থাকে। টানা প্রায় চার ঘণ্টা ধরে চলে এই চাপ প্রয়োগ, যা বিকেল চারটা পর্যন্ত স্থায়ী হয়। পুরো সময়জুড়ে ডা. নাজিমউদ্দিনকে ঘিরে রাখা হয় এবং তাকে মানসিকভাবে চাপে রাখা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
ডা. নাজিমউদ্দিন আহমেদ দাবি করেন, এই ঘটনার পেছনে পরিকল্পিত নির্দেশনা ছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওইদিন তাঁকে জোরপূর্বক একটি কাগজে স্বাক্ষর করানো হয়, যেখানে লেখা ছিল তিনি স্বেচ্ছায় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সকল দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিচ্ছেন। কিন্তু তিনি এটিকে আনুষ্ঠানিক পদত্যাগ হিসেবে স্বীকার করেন না। বরং তাঁর দাবি, এটি ছিল ভয়ভীতি ও চাপের মুখে নেওয়া স্বাক্ষর।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, পুরো ঘটনাটি পরিচালনায় বাইরে থেকে নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছিল। এমনকি প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকলেও ‘ওপরের নির্দেশ’ থাকার কথা বলে তারা কার্যত কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এক পর্যায়ে তাকে পদত্যাগ না করলে গ্রেপ্তারের হুমকি দেওয়া হয় বলেও তিনি দাবি করেন।
ঘটনার ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, কয়েকজন ব্যক্তি নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যাদের মধ্যে চিকিৎসক ও প্রতিষ্ঠানের সাবেক বা বর্তমান সংশ্লিষ্টদের নাম উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, সে সময় দেশে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ‘ট্যাগিং’ সংস্কৃতির সুযোগ নিয়ে অনেক জায়গায় মব সৃষ্টির ঘটনা ঘটে এবং গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রেও সেই পরিস্থিতি কাজে লাগানো হয়।
অনুসন্ধানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে, যা হলো একটি কথিত নতুন ট্রাস্টি বোর্ড গঠন। ২০২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি আশুলিয়া সাবরেজিস্ট্রি কার্যালয়ে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের নামে একটি নতুন ট্রাস্ট দলিল তৈরি করা হয় বলে জানা গেছে। সেখানে সাতজনকে নিয়ে নতুন বোর্ড গঠনের উল্লেখ রয়েছে, যাদের মধ্যে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের নামও রয়েছে।
আইন অনুযায়ী, কোনো ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠানের ট্রাস্টি বোর্ড গঠনের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠাতাদের হাতে থাকে। কিন্তু এখানে প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের বাইরে রেখে নতুন বোর্ড গঠন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে এই বোর্ডের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এই নতুন বোর্ডের কয়েকজন সদস্য সম্পর্কে অনুসন্ধানে জানা গেছে, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ অতীতে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে বরখাস্ত হয়েছিলেন। দখলের পর তাঁরা আবার প্রতিষ্ঠানে ফিরে এসে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
অন্যদিকে ডা. নাজিমউদ্দিন আহমেদ দাবি করেন, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মৃত্যুর পর তিনি প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন খাতে অডিট কার্যক্রম শুরু করেছিলেন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিচ্ছিলেন। এই উদ্যোগের কারণেই একটি প্রভাবশালী পক্ষ তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং তাকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে মোট ছয়জনের নাম রয়েছে। ১৯৭২ সালের নিবন্ধিত দলিলে তাদের নাম উল্লেখ রয়েছে। তবে বর্তমানে জীবিত প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে কেবল ডা. নাজিমউদ্দিনই সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন বলে জানা গেছে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর অবদানও উল্লেখযোগ্য। আগরতলায় ২ নম্বর সেক্টরে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা দিতে তিনি প্রথমে একটি অস্থায়ী হাসপাতাল গড়ে তোলেন, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতালের ভিত্তি তৈরি করে। বিভিন্ন গবেষণা ও বইয়েও তাঁর এই অবদানের স্বীকৃতি রয়েছে।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র দখলের প্রক্রিয়া যে হঠাৎ করে হয়নি, তারও প্রমাণ মিলেছে অনুসন্ধানে। ২০২৩ সালের আগস্টে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ডা. গিয়াস উদ্দিন আহমেদকে অপমান করে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাকে এই দখল প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পরে তিনি দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যান।
বর্তমানে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট অনেকেই। ডা. নাজিমউদ্দিন আহমেদ দাবি করেছেন, প্রতিষ্ঠানটি এখন অবৈধভাবে দখলে রয়েছে এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তিনি এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত এবং সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
অন্যদিকে অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে সরাসরি স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন বলেছেন, বিষয়টি আইনগত এবং বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। তবে ফোনে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অনীহা প্রকাশ করেছেন তারা।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে জন্ম নেওয়া একটি ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান এখন অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, ক্ষমতার লড়াই এবং বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে সংকটের মুখে পড়েছে। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের মতো একটি প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে এমন পরিস্থিতি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, বরং দেশের স্বাস্থ্যখাত ও নাগরিক সমাজের জন্যও একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্রঃ কালের কণ্ঠ
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au