সুদের হার আরও বাড়াল অস্ট্রেলিয়ার রিজার্ভ ব্যাংক। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৫ মে- অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক (রিজার্ভ ব্যাংক) সুদের হার আরও ০.২৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৪ দশমিক ৩৫ শতাংশে উন্নীত করেছে। এর ফলে নগদ সুদের হার লক্ষ্য আবারও ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির অবস্থানে ফিরে গেছে। গত বছর সুদ কমানোর যে ধারা শুরু হয়েছিল, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সেটি পুরোপুরি উল্টে গিয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে ঋণগ্রহীতাদের ওপর চাপ আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সুদের হার ৪ দশমিক ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪ দশমিক ৩৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। চলতি বছরে এটি তৃতীয়বারের মতো সুদ বাড়াল রিজার্ভ ব্যাংক। এর আগে ফেব্রুয়ারি ও মার্চেও একইভাবে হার বাড়ানো হয়েছিল।
সাম্প্রতিক এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এসেছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় অস্ট্রেলিয়ায় মূল্যস্ফীতি আবারও বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে মার্চ মাসে জ্বালানি তেলের দাম ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। এর প্রভাব ধীরে ধীরে অন্যান্য পণ্য ও সেবার দামেও পড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নর মিশেল বুলক সতর্ক করে বলেছেন, সুদের হার বাড়ালেও আগামী ছয় মাসে মূল্যস্ফীতি কমার সম্ভাবনা খুব কম। তার মতে, সামনে অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতির জন্য কঠিন সময় আসতে পারে। মূল্যস্ফীতি বাড়বে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাবে এবং বেকারত্ব ধীরে ধীরে বাড়তে পারে।
এই সিদ্ধান্তের এক সপ্তাহ পরই দেশটির সরকার জাতীয় বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে, যা ১২ মে উপস্থাপন করা হবে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতির এমন প্রেক্ষাপটে বাজেট আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রিজার্ভ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত বোর্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে গৃহীত হয়েছে। নয় সদস্যের মধ্যে আটজন সুদের হার বাড়ানোর পক্ষে ভোট দেন, আর একজন আগের হার অপরিবর্তিত রাখার পক্ষে মত দেন।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা লেগেছে। সাম্প্রতিক সময়ে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ মার্কিন ডলারের বেশি হয়ে গেছে, যা ১৯৭০–এর দশকের পর সবচেয়ে বড় জ্বালানি সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর প্রভাব অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতিতেও পড়ছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ শুরুর আগেই মূল্যস্ফীতি রিজার্ভ ব্যাংকের নির্ধারিত ২ থেকে ৩ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার ওপরে ছিল। তাই সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার বিষয়ে ব্যাংকের অঙ্গীকার দেখানো জরুরি ছিল।
কিছু অর্থনীতিবিদ ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ বা উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও কম প্রবৃদ্ধির ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেছেন। যদিও বর্তমান পরিস্থিতি এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি, তবুও ঝুঁকি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না বলে তারা মনে করছেন।
সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ব্যবসায়িক আস্থা ও ভোক্তাদের আত্মবিশ্বাস কমে গেছে। মার্চ মাসে ব্যবসায়িক আস্থার বড় ধরনের পতন লক্ষ্য করা গেছে, যা আগামী মাসগুলোতে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
রিজার্ভ ব্যাংক তাদের সাম্প্রতিক পূর্বাভাসে জানিয়েছে, চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে ‘ট্রিমড মিন’ বা মূল মূল্যস্ফীতি ৩ দশমিক ৮ শতাংশে উঠতে পারে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে গিয়ে বছর শেষে ১ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে আসতে পারে। বেকারত্বের হারও আগামী দুই বছরে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
যদি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে সতর্ক করেছে রিজার্ভ ব্যাংক। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বা জ্বালানি উৎপাদনে বড় ধরনের ক্ষতি হলে জ্বালানির দাম আরও বেড়ে যেতে পারে, যার প্রভাব সরাসরি অর্থনীতিতে পড়বে।
গভর্নর মিশেল বুলক বলেন, জ্বালানি দামের ধাক্কায় মানুষের প্রকৃত আয় ইতোমধ্যে কমে গেছে এবং অনেকেই আর্থিক চাপ অনুভব করছেন। তার মতে, মূল্যস্ফীতির প্রভাব সামাল দিতে মানুষ বেতন বাড়ানোর দাবি তুলতে পারেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই পরিস্থিতি যেন ভবিষ্যতে স্থায়ী মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা তৈরি না করে, সেটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
সূত্রঃ এবিসি নিউজ