ক্রুজ জাহাজে টানা মৃত্যু, হান্টাভাইরাস আতঙ্কে তদন্তে নেমেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ,ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৯ মে- হান্টাভাইরাসে আক্রান্ত একটি প্রমোদতরীকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের মধ্যে নিজেদের নাগরিকদের ফিরিয়ে আনার প্রস্তুতি শুরু করেছে অস্ট্রেলিয়া। স্পেন নিয়ন্ত্রিত ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের দিকে যাত্রারত ওই প্রমোদতরী থেকে চারজন অস্ট্রেলীয় নাগরিক ও একজন স্থায়ী বাসিন্দাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
ডাচ পতাকাবাহী ‘এমভি হন্ডিয়াস’ নামের জাহাজটি বর্তমানে পশ্চিম আফ্রিকার উপকূলের কাছে অবস্থিত ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের তেনেরিফে বন্দরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় সময় শনিবার দুপুর নাগাদ জাহাজটি সেখানে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। অস্ট্রেলীয় সময় অনুযায়ী, এটি রাত ৯টার দিকে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
স্পেনের জরুরি সেবা বিভাগের প্রধান ভার্জিনিয়া বারকোনেস জানিয়েছেন, জাহাজটি পৌঁছানোর পর যাত্রীদের সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ও নিরাপত্তা বেষ্টিত একটি এলাকায় নেওয়া হবে। কাউকে দ্বীপে অবস্থান করতে দেওয়া হবে না এবং বাণিজ্যিক ফ্লাইটে নিজ দেশে ফেরার অনুমতিও দেওয়া হবে না। ফলে বিভিন্ন দেশকে নিজেদের নাগরিকদের ফেরাতে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ার রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র জানিয়েছে, তারা দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ও অঞ্চলের সঙ্গে সমন্বয় করে কোয়ারেন্টিন, স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষার ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছে। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য বিভাগ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত অস্ট্রেলীয় যাত্রীদের কারও শরীরে হান্টাভাইরাসের উপসর্গ দেখা যায়নি।

ডাচ পতাকাবাহী ‘এমভি হন্ডিয়াস’ নামের জাহাজে প্রাণঘাতী হান্টাভাইরাস শনাক্ত , ছবি : সংগৃহীত
দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, কনস্যুলার কর্মকর্তারা তেনেরিফেতে যাচ্ছেন, যাতে অস্ট্রেলীয় নাগরিকদের সহায়তা করা যায় এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে সমন্বয় করা যায়। তিনি বলেন, আক্রান্ত জাহাজে থাকা চার অস্ট্রেলীয় নাগরিক ও একজন স্থায়ী বাসিন্দাকে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার বিভিন্ন উপায় বিবেচনা করা হচ্ছে।
এদিকে, জাহাজটিতে থাকা ১৪০ জনের বেশি যাত্রী ও নাবিককে সরিয়ে নিতে বড় ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য ইতোমধ্যে নিজেদের নাগরিকদের ফিরিয়ে আনতে বিশেষ বিমান পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া জাহাজ থেকে নেমে যাওয়া অন্তত পাঁচজন যাত্রীর শরীরে হান্টাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। তবে প্রমোদতরী পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ওশানওয়াইড এক্সপেডিশনস জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত জাহাজে এমন কোনো ব্যক্তি ছিলেন না যাদের মধ্যে নতুন করে সংক্রমণের উপসর্গ দেখা গেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, সাধারণ মানুষের জন্য এই ভাইরাসের ঝুঁকি এখনও কম। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, সংক্রমিত এক যাত্রীর অল্প সময়ের জন্য ব্যবহৃত বিমানের এক বিমানকর্মীর শরীরে ভাইরাস পাওয়া যায়নি। এতে মানুষের মধ্যে ভাইরাসটি সহজে ছড়িয়ে পড়তে পারে কি না, সে বিষয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল তা অনেকটাই কমেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মুখপাত্র ক্রিশ্চিয়ান লিন্ডমেইয়ার বলেন, “এটি নতুন কোনো কোভিড নয়। ঝুঁকি এখনও খুবই কম।”
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, সাধারণত ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর মল বা বর্জ্য থেকে বাতাসের মাধ্যমে হান্টাভাইরাস ছড়ায়। এটি সহজে মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হয় না। তবে এই ঘটনায় শনাক্ত হওয়া ‘অ্যান্ডিজ ভাইরাস’ বিরল ক্ষেত্রে মানুষে মানুষে ছড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভাইরাসটির উপসর্গ সাধারণত সংস্পর্শে আসার এক থেকে আট সপ্তাহের মধ্যে দেখা দেয়।
বর্তমানে চারটি মহাদেশের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জাহাজ থেকে আগে নেমে যাওয়া দুই ডজনের বেশি যাত্রীর সন্ধান ও পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে তারা ওই যাত্রীদের সংস্পর্শে আসা অন্যদেরও শনাক্ত করার চেষ্টা করছে।
গত ২৪ এপ্রিল, জাহাজে প্রথম মৃত্যুর প্রায় দুই সপ্তাহ পর অন্তত ১২টি দেশের দুই ডজনের বেশি যাত্রী কোনো ধরনের কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং ছাড়াই জাহাজ ত্যাগ করেন। পরে ২ মে প্রথমবারের মতো এক যাত্রীর শরীরে হান্টাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
ভাইরাস পরীক্ষা নেগেটিভ আসা বিমানকর্মীটি ২৫ এপ্রিল জোহানেসবার্গ থেকে আমস্টারডামগামী একটি ফ্লাইটে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ওই ফ্লাইটে সংক্রমিত এক ডাচ নারী স্বল্প সময়ের জন্য ছিলেন। ওই নারীর স্বামী জাহাজেই মারা যান। পরে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে জোহানেসবার্গে বিমান থেকে নামিয়ে নেওয়া হয় এবং সেখানেই তার মৃত্যু হয়।
ডাচ স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ এখন ওই ফ্লাইটের যাত্রীদের শনাক্ত করে তাদের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করছে।
যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, জাহাজে থাকা আরও এক ব্রিটিশ নাগরিকের শরীরে হান্টাভাইরাস থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। ওই ব্যক্তি বর্তমানে দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের প্রত্যন্ত ব্রিটিশ অঞ্চল ট্রিস্টান দা কুনহা দ্বীপে রয়েছেন।
এছাড়া স্পেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় আলিকান্তে প্রদেশের এক নারীর শরীরেও হান্টাভাইরাসের উপসর্গ পাওয়া গেছে। তিনি সেই একই বিমানে ছিলেন, যেখানে পরে মারা যাওয়া ডাচ নারী ভ্রমণ করেছিলেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ছবিঃ সংগৃহীত
জাহাজে থাকা আরও দুই ব্রিটিশ নাগরিকের শরীরে ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। তাদের একজন নেদারল্যান্ডসে এবং অন্যজন দক্ষিণ আফ্রিকায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
দক্ষিণ আফ্রিকার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষও জাহাজ থেকে নামা যাত্রীদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে ২৫ এপ্রিল সেন্ট হেলেনা দ্বীপ থেকে জোহানেসবার্গগামী একটি ফ্লাইটের যাত্রীদের ওপর নজর দেওয়া হচ্ছে।
ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কমাতে স্পেনের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যাত্রীদের ছোট নৌকায় করে জাহাজ থেকে নামানো হবে এবং সরাসরি বিশেষ বাসে তোলা হবে। তাদের পরিবহনের জন্য আলাদা নিরাপত্তাবেষ্টিত যানবাহন ব্যবহার করা হবে। বিমানবন্দরের যে অংশ দিয়ে তারা চলাচল করবেন, সেটিও সাধারণ মানুষের জন্য বন্ধ রাখা হবে।
স্পেন সরকার জানিয়েছে, যদি কোনো যাত্রীর মধ্যে উপসর্গ দেখা যায়, তাহলে ব্যবহারের জন্য বিশেষ চিকিৎসা সুবিধাসম্পন্ন বিমান প্রস্তুত রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তারা জাহাজে থাকা ১৭ জন মার্কিন নাগরিককে ফিরিয়ে আনতে বিশেষ বিমান পাঠাবে। দেশে ফেরার পর তাদের নেব্রাস্কা মেডিকেল সেন্টারের জাতীয় কোয়ারেন্টিন ইউনিটে রাখা হবে। এই ইউনিট আগে ইবোলা ও কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল।
নেব্রাস্কা মেডিসিনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ডা. মাইকেল অ্যাশ বলেন, “এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্যই আমরা প্রস্তুত আছি।”
একইভাবে যুক্তরাজ্য সরকারও জানিয়েছে, জাহাজে থাকা প্রায় দুই ডজন ব্রিটিশ নাগরিককে ফিরিয়ে আনতে তারা বিশেষ ফ্লাইটের ব্যবস্থা করবে।
সূত্রঃ নাইন নিউজ