হরমুজ প্রণালি এখন যুদ্ধাঞ্চলে পরিণত হয়েছে : ইরান
মেলবোর্ন, ১২ মে- মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিকে এখন পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধাঞ্চল হিসেবে দাবি করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌ শাখা। আঞ্চলিক উত্তেজনা ও সামরিক…
মেলবোর্ন, ১২ মে- পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ নতুন নয়। সীমান্তবর্তী এই রাজ্যের নির্বাচন এলেই অনুপ্রবেশ, সীমান্ত নিরাপত্তা, সংখ্যালঘু রাজনীতি কিংবা বাংলাদেশ থেকে আসা মানুষের প্রসঙ্গ বারবার উঠে আসে। তবে এবারের বিধানসভা নির্বাচনে বিষয়টি আরও ভিন্ন ও অনেক বেশি আবেগনির্ভরভাবে সামনে আনা হয়েছে। নির্বাচনের বহু আগে থেকেই রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএস পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় ঘরোয়া প্রচার, সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং মতাদর্শভিত্তিক প্রচারণার মাধ্যমে এই বার্তা ছড়িয়ে দেয় যে, বাংলাদেশে যেভাবে হিন্দুরা ‘চাপের মুখে’ রয়েছে, ভবিষ্যতে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদের অবস্থাও সেরকম হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রচারণা কেবল নির্বাচনী রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্তরে যে মতাদর্শিক প্রস্তুতি সংঘ তৈরি করছিল, এবারের নির্বাচন ছিল তার বড় রাজনৈতিক বহিঃপ্রকাশ।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির বড় জয়ের পর রাজনৈতিক মহলে সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি উঠে এসেছে তা হলো, এই জয়ের পেছনে আরএসএসের ভূমিকা কতটা ছিল।
সংঘ বরাবরই দাবি করে যে তারা সরাসরি নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশ নেয় না। তারা নিজেদের একটি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন হিসেবে পরিচয় দেয়। কিন্তু বাস্তবে বিজেপির মতাদর্শগত ভিত্তি হিসেবেই আরএসএসকে দেখা হয়। ফলে নির্বাচনে বিজেপির উত্থান বা সাফল্যের সঙ্গে সংঘের সাংগঠনিক কার্যক্রমের সম্পর্ক নিয়ে বরাবরই আলোচনা থাকে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন কিংবা ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে সংঘ তুলনামূলকভাবে সংযত ভূমিকা নিয়েছিল। কিন্তু এবারের নির্বাচনে তারা তৃণমূল স্তরে অনেক বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে।
আরএসএসের এক প্রচারক বিবিসিকে জানিয়েছেন, এবারের নির্বাচনে সংঘের শত শত কর্মী এবং স্বয়ংসেবক পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে একটিই মূল বার্তা দিয়েছেন, “এই নির্বাচন শুধু সরকার পরিবর্তনের নির্বাচন নয়, এটি হিন্দু সমাজের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।”
সমালোচকদের মতে, “অস্তিত্বের সংকট” শব্দবন্ধটি ব্যবহার করে ধর্মীয় মেরুকরণকে আরও তীব্র করা হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিভিন্ন ঘটনা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং সীমান্ত এলাকার মানুষের আবেগকে কাজে লাগানো হয়েছে।
আরএসএসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ভিত্তি হলো তাদের ‘শাখা’। স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিদিন বা সাপ্তাহিকভাবে আয়োজিত এসব শাখায় শারীরিক প্রশিক্ষণ, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, দেশপ্রেম ও মতাদর্শভিত্তিক আলোচনা হয়।
বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে আরএসএসের প্রায় সাড়ে চার হাজার শাখা সক্রিয় রয়েছে বলে জানা গেছে। এক দশক আগেও এই সংখ্যা ছিল প্রায় এক হাজারের মতো। অর্থাৎ গত কয়েক বছরে সংগঠনটি দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে।
কলকাতার একটি শাখায় অংশ নেওয়া কয়েকজন স্বয়ংসেবক জানিয়েছেন, তারা সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে প্রচার করেন না। তাদের কাজ হলো জনগণকে “রাষ্ট্রীয় স্বার্থ” সম্পর্কে সচেতন করা এবং ভোটাধিকার প্রয়োগে উৎসাহ দেওয়া।
আরএসএসের ‘প্রান্ত ব্যবস্থা প্রমুখ’ সীতারাম দাগা বলেছেন, সংঘের কর্মীরা বাড়ি-বাড়ি গিয়ে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, তবে তারা সরাসরি বিজেপির নাম উচ্চারণ করেননি।
তার ভাষায়, “আমরা মানুষকে বলেছি যারা রাষ্ট্রীয় স্বার্থে কাজ করছে, হিন্দুত্বের জন্য কাজ করছে, সমাজের সেবা করছে, তাদেরই সমর্থন করুন। আমরা কখনও বলিনি বিজেপিকে ভোট দিন।”
তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, এই বক্তব্যের মধ্যেই পরোক্ষ রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট। কারণ বিজেপি এবং আরএসএসের মতাদর্শিক সম্পর্ক ভারতের রাজনীতিতে সুপরিচিত।

আরএসএস সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে প্রচার করেন না। ছবিঃ সংগৃহীত
এবারের নির্বাচনে আরএসএসের প্রচারণার সবচেয়ে আলোচিত দিক ছিল বাংলাদেশ প্রসঙ্গ। সংঘের কর্মীরা সীমান্তবর্তী জেলা থেকে শুরু করে কলকাতা ও শহরতলির মধ্যবিত্ত হিন্দু পরিবারগুলোতেও এই বার্তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছে যে, “বাংলাদেশে হিন্দুরা যেভাবে নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে, পশ্চিমবঙ্গেও ভবিষ্যতে একই পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।”
আরএসএসের সঙ্গে যুক্ত প্রবীণ প্রচারক বিজয় আঢ্য বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে দেশভাগের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের বোঝানো হয়েছে যে, একসময় পূর্ববঙ্গ থেকে লাখ লাখ হিন্দু উদ্বাস্তু হয়ে পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নিয়েছিল। এখন যদি “হিন্দু স্বার্থ রক্ষা” না করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আবারও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন। ছবিঃ সংগৃহীত
বিজয় আঢ্যের ভাষায়, “পশ্চিমবঙ্গই বাঙালি হিন্দুদের একমাত্র মাতৃভূমি। বাংলাদেশের হিন্দুদের যে অবস্থা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গেও সেই পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। মানুষকে আমরা সেটাই বুঝিয়েছি।”
তিনি আরও বলেন, “তৃণমূল কংগ্রেস মুসলমানদের তোষণ করছে। যদি বিজেপির সরকার গঠন না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে হিন্দুদের আবারও পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে যেতে হতে পারে।”
বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্যগুলো মূলত ভয় ও অনিশ্চয়তার মনস্তত্ত্বকে কাজে লাগানোর কৌশল।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে সংঘের সহযোগী সংগঠনগুলো বিশেষভাবে সক্রিয় ছিল। এর মধ্যে ‘সীমান্ত চেতনা মঞ্চ’ অন্যতম।
এই সংগঠনটি সীমান্ত নিরাপত্তা, অনুপ্রবেশ, চোরাচালান এবং জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুকে সামনে এনে প্রচার চালিয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় বসবাসকারী মানুষের মধ্যে এই বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে যে সীমান্ত পরিস্থিতি বদলে গেলে পশ্চিমবঙ্গের জনবিন্যাসও বদলে যেতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রচারণা সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বিজেপির ভোটব্যাংক শক্তিশালী করতে বড় ভূমিকা রেখেছে।

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন। ছবিঃ সংগৃহীত
এবারের নির্বাচনে বিজেপি ২০৭টি আসনে জয় পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, দুর্নীতির অভিযোগ, প্রশাসনিক বিতর্ক এবং শাসনব্যবস্থার সমালোচনা বিজেপির জয়ের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তবে একইসঙ্গে এই প্রশ্নও সামনে এসেছে, আরএসএসের দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক কাজ ছাড়া বিজেপি কি এত বড় জয় পেত?
পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার বলেছেন, সংঘের কর্মীরা জাতীয়তাবাদ ও সুশাসনের পক্ষে কাজ করেছেন। বিজেপিও একই আদর্শে বিশ্বাস করে বলেই দুই পক্ষের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্ক রয়েছে।
তার ভাষায়, “সংঘ তৃণমূল স্তরে মানুষের কাছে গেছে। জাতীয়তাবাদ, সুশাসন ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের কথা বলেছে। বিজেপিও তো একই কথা বলে।”

জয়ের পর শুভেন্দু অধিকারী। ছবিঃ সংগৃহীত
বিশ্লেষকদের মতে, আরএসএসের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তারা সরাসরি রাজনৈতিক ভাষা ব্যবহার না করেও দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক প্রভাব তৈরি করতে পারে।
তারা বড় রাজনৈতিক সভা বা আগ্রাসী প্রচারণার চেয়ে পারিবারিক যোগাযোগ, সামাজিক সম্পর্ক, নিয়মিত সাক্ষাৎ, স্থানীয় সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং মতাদর্শভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
কলকাতার প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক জাদ মাহমুদ বলেন, “আরএসএস মানুষের মধ্যে ধীরে ধীরে মতাদর্শগত পরিবর্তন আনে। তারা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে কাজ করে মানুষের চিন্তাভাবনা বদলানোর চেষ্টা করে।”
তার মতে, পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যে বাঙালি মধ্যবিত্ত সংস্কৃতি ছিল, সেখানে বিজেপির জন্য জায়গা তৈরি করতেও আরএসএস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তিনি বলেন, “একসময় পশ্চিমবঙ্গে বিজেপিকে বহিরাগতদের দল হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু এখন শিক্ষিত মধ্যবিত্তের একটি অংশও প্রকাশ্যে বিজেপিকে সমর্থন করছে। এই পরিবর্তন হঠাৎ হয়নি। দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কাজের ফল এটি।”
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী প্রকাশ্যে বলেছেন, এই জয় ‘হিন্দুত্বের জয়’।
এরপর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে, পশ্চিমবঙ্গের এবারের নির্বাচন কি কার্যত হিন্দু বনাম মুসলমান ভোটযুদ্ধে পরিণত হয়েছিল?
অধ্যাপক জাদ মাহমুদ মনে করেন, এবারের নির্বাচনে ধর্মীয় মেরুকরণ স্পষ্ট ছিল। তার মতে, রাজনৈতিক বক্তব্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণা এবং সংগঠিত সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে সমাজে বিভাজন আরও গভীর হয়েছে।
তিনি বলেন, “মানুষের মনে ধীরে ধীরে একটা ধারণা তৈরি করা হয়েছে যে তারা হুমকির মুখে রয়েছে। এই মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের পেছনে আরএসএসের দীর্ঘদিনের কাজ রয়েছে।”
বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করার পর এখন নতুন প্রশ্ন হলো, আগামী দিনে সংঘের প্রভাব কতটা বাড়বে।
সংঘের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা মনে করছেন, এখন পশ্চিমবঙ্গে তাদের কাজ করার পরিবেশ আরও সহজ হবে। আগে যারা প্রকাশ্যে সংঘের সঙ্গে যুক্ত হতে ভয় পেতেন, তারাও এখন আরও সক্রিয় হবেন।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আরএসএসের কার্যক্রম শুধু সরকার গঠনের ওপর নির্ভর করে না। বিজেপি ক্ষমতায় থাকুক বা বিরোধী দলে থাকুক, সংঘ দীর্ঘমেয়াদে সাংগঠনিক ও মতাদর্শিক কাজ চালিয়ে যায়।
পশ্চিমবঙ্গের এবারের নির্বাচন আবারও দেখিয়েছে যে দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল স্তরে সংগঠন, মতাদর্শ এবং সাংস্কৃতিক প্রচারণা একসঙ্গে চললে তার রাজনৈতিক প্রভাব একসময় নির্বাচনের ফলাফলেও প্রতিফলিত হয়।
এখন নজর থাকবে, বিজেপি সরকারের আমলে পশ্চিমবঙ্গে আরএসএসের সাংগঠনিক বিস্তার ও সামাজিক প্রভাব ভবিষ্যতে আরও কতটা বৃদ্ধি পায়।
সূত্রঃ বিবিসি বাংলা
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au