বিশ্ব

নরেন্দ্র মোদির সরকার কীভাবে ভারতকে একদলীয় ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে

  • 4:36 pm - May 16, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২০০ বার
ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন নরেন্দ্র মোদি।ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ১৬ মে- ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে তৃতীয়বারের মতো ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন নরেন্দ্র মোদি। তবে এই জয় আগের দুই নির্বাচনের মতো জাঁকজমকপূর্ণ ছিল না। ভোটের সংখ্যা আগের নির্বাচনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং শেষ পর্যন্ত তার দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেয়ে জোট জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট (এনডিএ)-এর সমর্থনে সরকার গঠন করে।

নরেন্দ্র মোদি ভারতের ইতিহাসে মাত্র দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী যিনি টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় থাকেন। কিন্তু ২০২৪ সালের ফলাফল বিশ্লেষকরা একে “দুর্বল জয়” হিসেবেই দেখেন। চার বছর আগের তুলনায় আসন ও ভোট দুটোই কমে আসে। যদিও এনডিএ ২৯৩ আসন পায়, বিরোধী জোট ২৩২ আসন পেয়ে শক্ত অবস্থান তৈরি করে, যা থেকে অনেকেই ভেবেছিলেন ভারতের রাজনীতিতে ভারসাম্য ফিরবে। তবে দুই বছর পর সেই ধারণা আর বাস্তবে রূপ নেয়নি।

২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে মোদি ও বিজেপির রাজনৈতিক প্রভাব ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। দলটির আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে পরিচিত “হিন্দুত্ববাদ” এবং মোদির ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় পরিবর্তন এনেছে। বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্রীয় ক্ষমতার কৌশলগত ব্যবহার, শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো এবং মোদির “ম্যাগনেটিক” নেতৃত্ব মিলিয়ে বিজেপির প্রভাব দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে।

ইসরায়েল সফরে নরেন্দ্র মোদি। ছবিঃ এক্স

২০১৪ সালে বিজেপির নিয়ন্ত্রণে ছিল মাত্র ৭টি রাজ্য। বর্তমানে দলটি ২২টি রাজ্য এবং একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক সন্দীপ শাস্ত্রীর মতে, ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থা এখন ক্রমশ একদলীয় প্রাধান্যের দিকে যাচ্ছে।

তার ভাষায়, “ভারতের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এখন ধীরে ধীরে একদলীয় প্রভাবশালী ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে।”

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির অগ্রগতি

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য নির্বাচনে বিজেপি প্রথমবারের মতো বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করে। ভারতের রাজনৈতিক মহলে এই ফলাফল বিশেষভাবে আলোচিত হয়, কারণ ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর বিজেপির প্রভাব কমছে বলে যে ধারণা ছিল, তা এই ফলাফল নাকচ করে দেয়।

পশ্চিমবঙ্গের ভোটার কালিনা রায় জানান, আগে তারা স্থানীয় দলকে ভোট দিলেও এবার বিজেপিকে সমর্থন করেছেন। তার ভাষায়, দিল্লিতে বিজেপির জয় দেখে তারা পরিবর্তনের আশা করেছিলেন।

পশ্চিমবঙ্গ দীর্ঘদিন ধরে শাসন করছে তৃণমূল কংগ্রেস, যার নেতৃত্বে আছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি রাজ্যের প্রভাবশালী রাজনৈতিক মুখ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে “দিদি” নামে পরিচিত।

‘বাংলার জনগণকে প্রণাম’-শুভেন্দুর মঞ্চে মাথা নত করলেন মোদি । ছবিঃ সংগৃহীত

বিজেপির মুখপাত্র সৈয়দ জাফর ইসলাম দাবি করেন, পশ্চিমবঙ্গের মানুষ পরিবর্তন চেয়েছে এবং সেই কারণেই তারা বিজেপিকে ভোট দিয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ ভারতের সংসদীয় আসনের দিক থেকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য এবং সেখানে মুসলিম জনসংখ্যাও তুলনামূলকভাবে বেশি। তাই এই রাজ্যে বিজেপির অগ্রগতি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হয়।

তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে দাবি করেন, কেন্দ্রীয় সরকারের সহায়তায় ভোট প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলা হয়েছে। বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

ভোটার তালিকা সংস্কার নিয়ে বিতর্ক

ভারতে মোট ১৩টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভোটার তালিকা হালনাগাদ প্রক্রিয়া চালু হয়েছে। এর উদ্দেশ্য মৃত বা অযোগ্য ভোটারদের বাদ দেওয়া এবং অবৈধ অভিবাসীদের তালিকা থেকে সরানো।

পশ্চিমবঙ্গে এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রায় ৯০ লাখ ভোটার বাদ দেওয়া হয়, যা মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ। এর মধ্যে ৬০ লাখকে মৃত বা অনুপস্থিত হিসেবে বাদ দেওয়া হয়, আর প্রায় ২৭ লাখের নাম চূড়ান্তভাবে অনিশ্চিত অবস্থায় থাকে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবিঃ সংগৃহীত

অনেক ভোটার অভিযোগ করেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে না পারায় তাদের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, যদিও তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র ছিল।

একাডেমিক বিশেষজ্ঞদের মতে, দরিদ্র মানুষের জন্য বারবার নথি প্রমাণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে, ফলে তারা ভোটাধিকার হারানোর ঝুঁকিতে পড়েন।

বিরোধী দল কংগ্রেস ও তৃণমূল কংগ্রেস এই প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিযোগ করে। তবে বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন এসব দাবি অস্বীকার করে।

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু এই সংস্কার নয়, বরং দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা নেতৃত্বের প্রতি জনমনে ক্লান্তি এবং স্থানীয় নেতৃত্বের মাধ্যমে বিজেপির প্রচারণা কৌশলও ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জাতীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা রাজ্যগুলোর ক্ষমতা সীমিত করছে। এর ফলে বিরোধী দল শাসিত রাজ্যগুলো অনেক ক্ষেত্রে আর্থিক ও প্রশাসনিক চাপে পড়ছে।

একজন বিশ্লেষক এটিকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর চাপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে তিনি এটাও বলেন যে, এমন প্রবণতা শুধু ভারতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

ভ্লাদিমির পুতিন ও নরেন্দ্র মোদি। ছবি: সংগৃহীত

দিলিমিটেশন বিল ও বিতর্ক

বিজেপি সরকার সম্প্রতি সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব দেয়, যা দিলিমিটেশন বিল নামে পরিচিত। সরকারের দাবি, এতে নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়বে এবং সংসদে নারীদের আসন এক-তৃতীয়াংশে উন্নীত করা সম্ভব হবে।

তবে বিরোধীরা অভিযোগ করে, এই প্রক্রিয়া রাজনৈতিক সুবিধার জন্য জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন পুনর্বিন্যাসের চেষ্টা। দক্ষিণ ভারতের কম জনসংখ্যা বৃদ্ধির রাজ্যগুলো এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, আর উত্তর ভারতের জনবহুল অঞ্চলগুলো লাভবান হতে পারে, যেখানে বিজেপির প্রভাব বেশি।

বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের পরিবর্তন রাজনৈতিক ভারসাম্যে বড় প্রভাব ফেলতে পারে এবং এটি “জেরিম্যান্ডারিং” এর ঝুঁকি তৈরি করে।

বিরোধী দলের দুর্বলতা

কংগ্রেস দল ২০১৪ সালের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে দুর্বল হয়েছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা এই দল এখন সংগঠনগত বিভাজন ও নেতৃত্ব সংকটে ভুগছে বলে বিশ্লেষকদের মত।

অনেক ভোটার উন্নয়ন প্রকল্প ও কর নীতির কারণে বিজেপির দিকে ঝুঁকেছেন। “এক দেশ, এক কর” নীতি অনেকের কাছে ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে দেখা হয়েছে।

অন্যদিকে বিজেপি দক্ষভাবে রাজনৈতিক সুযোগ কাজে লাগাতে পারছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। ছবিঃ সংগৃহীত

হিন্দুত্ববাদ ও রাজনৈতিক ভিত্তি

বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপির রাজনৈতিক শক্তির কেন্দ্রবিন্দু হলো হিন্দুত্ববাদী আদর্শ এবং আরএসএস-এর মতো সংগঠনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব। এই আদর্শ ভারতীয় সমাজে একটি বৃহত্তর হিন্দু পরিচয়ের ধারণা তৈরি করেছে।

নরেন্দ্র মোদি নিজেও আরএসএস-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যা তার রাজনৈতিক উত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মোদি ও ভবিষ্যৎ রাজনীতি

নরেন্দ্র মোদি এখনও ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনীতিকদের একজন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে অনুসরণকৃত নেতাদের একজন।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের পর থেকে “মোদি ব্র্যান্ড”-এর প্রভাব কিছুটা কমতে শুরু করেছে। অতীতে যেখানে নির্বাচন মূলত মোদির ব্যক্তিত্বকে কেন্দ্র করে হতো, এখন সেই প্রবণতায় পরিবর্তন এসেছে।

২০২৯ সালের পরবর্তী নির্বাচনের আগে মোদির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে ধারণা করা হচ্ছে, বিজেপির পরবর্তী নেতৃত্ব আরএসএস-এর ঘনিষ্ঠ বলয়ের মধ্য থেকেই আসবে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হলেও বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি এবং আদর্শিক ভিত্তি দেশটির রাজনৈতিক কাঠামোকে দীর্ঘ সময় প্রভাবিত করবে।

সূত্রঃ এবিসি নিউজ

এই শাখার আরও খবর

নতুন হামলার জেরে হরমুজ প্রণালিতে কমেছে জাহাজ চলাচল

মেলবোর্ন, ২২ জুলাই:  যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে হামলার পর নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল আরও…

সাত মাসের শিশু কন্যাকে আছড়ে হত্যার মামলায় বাবা গ্রেপ্তার

মেলবোর্ন, ২২ জুলাই: রাজধানীর উত্তরার সিরাজ মার্কেট এলাকায় সাত মাস বয়সী শিশুকন্যাকে আছড়ে হত্যার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় বাবা কবির ইসলামকে গ্রেপ্তার দেখানোর নির্দেশ দিয়েছেন…

জাবি মেডিক্যাল সেন্টারে ২১ দিনে প্রায় ২০ হাজার ওষুধের গরমিল

মেলবোর্ন, ২২ জুলাই- জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) মেডিক্যাল সেন্টারে মাত্র ২১ দিনের ব্যবধানে প্রায় ১৯ হাজার ৫৬৭ পিস ওষুধের গরমিল ধরা পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ ক্রয় কমিটির…

৯ জেলায় বন্যার শঙ্কা, আগামী ২৪-৪৮ ঘণ্টায় প্লাবিত হতে পারে নিম্নাঞ্চল

মেলবোর্ন, ২২ জুলাই- আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশের অন্তত ৯ জেলায় বন্যার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। একই সঙ্গে…

মন্দিরে নেওয়ার কথা বলে কিশোরীকে অপহরণের পর সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ, নারীসহ গ্রেপ্তার ৩

মেলবোর্ন, ২২ জুলাই:  ভারতের কর্নাটকের দেবনাহাল্লিতে ১৪ বছরের এক কিশোরীকে অপহরণের পর জোরপূর্বক মদ খাইয়ে এক নির্মাণাধীন ভবনে সারা রাত সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনা…

দিল্লিতে রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী আটক, মোদীর বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ

মেলবোর্ন, ২২জুলাই- ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারি বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী, কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au