বিশ্ব

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত ইরান

  • 1:06 pm - June 03, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৩২ বার
ইরানের পতাকায় দেশটির নেতাদের ছবি। রয়টার্স

মেলবোর্ন, ৩ জুন- যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতার পথ এখনো পুরোপুরি বন্ধ করেনি ইরান। তবে চলমান সংঘাত, পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারসহ নানা ইস্যুতে দুই পক্ষের মধ্যে গভীর মতপার্থক্য রয়ে যাওয়ায় কোনো চূড়ান্ত চুক্তি এখনো অধরাই থেকে গেছে। একই সঙ্গে ইরানের রাজনৈতিক, সামরিক ও ধর্মীয় নেতৃত্বের ভেতরেও আলোচনার প্রশ্নে বিভিন্ন মাত্রার অবস্থান দেখা যাচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলমান সংঘাতের পরও ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কোনো সমঝোতা হয়নি। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের বিষয়টি এখনো অন্যতম বিরোধপূর্ণ ইস্যু হিসেবে রয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে চায় ইরান। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সমুদ্রবন্দরগুলোর ওপর বিভিন্ন ধরনের অবরোধ ও চাপ বজায় রেখেছে।

এ ছাড়া ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় সংরক্ষিত উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এবং ভবিষ্যতে পরমাণু সমৃদ্ধকরণের সীমা নির্ধারণ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমঝোতার সম্ভাবনা স্পষ্ট নয়। একই সঙ্গে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রশ্নও অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন বাহিনী ও ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) মধ্যে একাধিক পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে। তেহরানের অভিযোগ, গত এপ্রিলের শুরুতে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি যুক্তরাষ্ট্র বারবার লঙ্ঘন করছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটনও ইরানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তুলছে।

গত রোববার রাজধানী তেহরানের আন্দিশেহ এলাকায় একটি আবাসিক ভবনে বিস্ফোরণের ঘটনাকে ঘিরেও নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। কিছু ইসরায়েলি গণমাধ্যম দাবি করেছে, আইআরজিসির এক জেনারেলকে লক্ষ্য করে হামলাটি চালানো হয়েছিল। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো বলছে, গ্যাসলাইনের ত্রুটির কারণেই বিস্ফোরণ ঘটে।

ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে গভীর অবিশ্বাস এখনো প্রবল। দেশটির শীর্ষ ধর্মীয়, সামরিক ও রাজনৈতিক নেতারা প্রকাশ্যে বলে আসছেন, কোনো পরিস্থিতিতেই তারা ‘আত্মসমর্পণ’ করবেন না। তবে এই কঠোর অবস্থানের মধ্যেও আলোচনার প্রশ্নে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে।

ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। ছবিঃ সংগৃহীত

সাম্প্রতিক হামলায় নিহত সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পর তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনি দেশের ক্ষমতার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন। হামলায় আহত হওয়ার পর তাঁকে ধর্মীয় ও সামরিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়। নিরাপত্তাজনিত কারণে তিনি প্রকাশ্যে খুব কমই আসছেন। তবে তাঁর নামে প্রকাশিত বিভিন্ন বার্তায় আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়নি।

মোজতবা খামেনি বলেছেন, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ভবিষ্যৎ যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবমুক্ত হতে হবে। তাঁর মতে, ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি দেশের জাতীয় সম্পদ এবং এগুলোকে ভৌগোলিক সীমান্তের মতোই সুরক্ষিত রাখতে হবে। তিনি সমর্থকদের রাস্তায় সক্রিয় থাকার আহ্বান জানিয়েছেন এবং দেশের অর্থনীতিকে আরও এক বছর ‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’র জন্য প্রস্তুত রাখার কথাও বলেছেন, যা মূলত দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞার বাস্তবতা মেনে নেওয়ার ইঙ্গিত বহন করে।

যুদ্ধের পর সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে সামরিক ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলো। বিশেষ করে আইআরজিসির শীর্ষ জেনারেলরা এখন রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তারা প্রকাশ্যে আলোচনার বিষয়ে কম কথা বললেও যুক্তরাষ্ট্রকে বড় ধরনের ছাড় দেওয়ার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন বলে মনে করা হয়।

আইআরজিসির প্রধান কমান্ডার আহমাদ ভাহিদি যুক্তরাষ্ট্রকে ‘পতনোন্মুখ পরাশক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, ইরান ও তার মিত্ররা ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেছে। ভবিষ্যতে আবার যুদ্ধ শুরু হলে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও কঠোর জবাব দেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।

সশস্ত্র বাহিনীর খাতাম আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের কমান্ডার আলী আবদুল্লাহি বলেছেন, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ইরানের বাহিনীর হাতে রয়েছে এবং প্রয়োজন হলে তারা শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করতেও প্রস্তুত।

আইআরজিসির মহাকাশ শাখার প্রধান মাজিদ মুসাভি সম্প্রতি নিহত আয়াতুল্লাহ খামেনির একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেন, শত্রুর সঙ্গে আলোচনা প্রায়ই ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ ধরনের বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে সামরিক নেতৃত্বের একটি বড় অংশ এখনো আলোচনার বিষয়ে সন্দিহান।

অন্যদিকে আইআরজিসির সাবেক প্রধান কমান্ডার মোহাম্মদ আলী জাফরি সম্ভাব্য সমঝোতার জন্য পাঁচটি শর্ত দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে লেবানন ও অন্যান্য মিত্র অঞ্চলে যুদ্ধের অবসান, সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ করা সম্পদ ফেরত দেওয়া, যুদ্ধক্ষতির ক্ষতিপূরণ এবং হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌম অধিকার স্বীকার করা।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র এর পতাকা। প্রতিকী ছবি

ইরানের কট্টরপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থান প্রবল। ‘পায়দারি ফ্রন্ট’-এর নেতা সাঈদ জালিলি দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে কঠোর অবস্থান বজায় রাখার পক্ষে। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা রেখে কোনো দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করা উচিত নয়। বরং এমন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে যাতে নিষেধাজ্ঞা, গুপ্তহত্যা কিংবা সামরিক চাপ প্রয়োগের সুযোগ শত্রুপক্ষের হাতে না থাকে।

জালিলি সম্প্রতি বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা আর যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল নির্ধারণ করবে না। তাঁর দাবি, ‘প্রতিরোধ শক্তি’র বিজয়ই ভবিষ্যতের আঞ্চলিক কাঠামো নির্ধারণ করবে।

তবে সরকারের ভেতরে তুলনামূলক বাস্তববাদী একটি অবস্থানও রয়েছে। পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি প্রকাশ্যে বলেছেন, জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে একটি বাস্তবসম্মত চুক্তির মাধ্যমে উত্তেজনা কমানো সম্ভব। তারা আত্মসমর্পণের বিরোধিতা করলেও কূটনৈতিক সমাধানের পথ পুরোপুরি বন্ধ করতে চান না।

এদিকে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এবং আইআরজিসি-ঘনিষ্ঠ গণমাধ্যমগুলো আরও কঠোর অবস্থান প্রচার করছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সমর্থকদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন কোনো চুক্তির জন্য যেসব শর্ত গ্রহণযোগ্য হতে পারে, সেগুলোর মধ্যে হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ, আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের নতুন নিয়ম, ট্রানজিট ফি আরোপ এবং বিদেশে আটকে থাকা অন্তত এক হাজার ২০০ কোটি ডলারের সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়গুলো তুলে ধরা হচ্ছে।

কট্টরপন্থী দৈনিক কায়হানও দীর্ঘদিন ধরে কঠোর অবস্থানের পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে আসছে। পত্রিকাটির সম্পাদক হোসেইন শরিয়তমাদারি একাধিকবার হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসা এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রগুলো এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো না কোনো ধরনের সমঝোতার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করছে না। তবে সামরিক নেতৃত্ব, কট্টরপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠী এবং রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্রের কঠোর অবস্থানের কারণে দ্রুত কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা কমার বদলে আগামী মাসগুলোতে আরও জটিল রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সূত্রঃ আল জাজিরা

এই শাখার আরও খবর

ইরানি হামলায় সব ফ্লাইট বাতিল করল ইজিপ্টএয়ার

মেলবোর্ন, ৪ জুন- কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় দুই দিনের সব ফ্লাইট বাতিল করেছে মিসরের রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা…

মুক্তি পেলেন সেলিনা হায়াৎ আইভী

মেলবোর্ন, ৪ জুন- নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগের নেত্রী সেলিনা হায়াৎ আইভী কারামুক্ত হয়েছেন। বুধবার রাতে গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তিনি…

অতিগোপনে প্রস্তুতি ম্যাচ খেলবে ইরান, থাকবে না গণমাধ্যমকর্মীও

মেলবোর্ন, ৪ জুন- ফিফা বিশ্বকাপকে সামনে রেখে নিজেদের চূড়ান্ত প্রস্তুতিতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছে ইরান জাতীয় ফুটবল দল। বিশ্বকাপের আগে শেষ প্রস্তুতি ম্যাচটি সম্পূর্ণ গোপনীয়তার…

বীর মুক্তিযোদ্ধা একেএম রহমতুল্লাহ আর নেই

মেলবোর্ন, ৪ জুন- সাবেক সংসদ সদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এ কে এম রহমতুল্লাহ মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি…

জেলা ডাকবাংলোয় মিলল মা ও মেয়ের মরদেহ

মেলবোর্ন, ৪ জুন-  বরগুনা জেলা পরিষদের ডাকবাংলো থেকে এক মা ও তার দুই মেয়ের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। বুধবার বিকেলে ডাকবাংলোর তৃতীয় তলার দুটি পৃথক…

প্রত্যাহার হচ্ছে প্রিপেইড মিটারের মাসিক চার্জ

মেলবোর্ন, ৪ জুন-  বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটারে আরোপিত অতিরিক্ত মাসিক চার্জ প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং খুব শিগগিরই আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au