ইউরোপের মাটিতে ইতিহাস গড়ে সান মারিনোকে হারালো বাংলাদেশ। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৬ জুন- ইউরোপের মাটিতে ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল। স্বাগতিক সান মারিনোকে ২-১ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো ইউরোপের কোনো দলের বিপক্ষে জয় পেয়েছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজতেই বাংলাদেশ দলের ফুটবলার ও কোচিং স্টাফরা মাঠে নেমে উল্লাসে মেতে ওঠেন। গ্যালারিতে উপস্থিত হাজারো বাংলাদেশি সমর্থকও বিজয়ের আনন্দে ফেটে পড়েন।
সান মারিনোর মাঠে অনুষ্ঠিত ম্যাচে বাংলাদেশের জয়ের নায়ক ছিলেন অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার তপু বর্মণ। ম্যাচের দুই অর্ধেই একটি করে গোল করে দলকে ঐতিহাসিক জয় এনে দেন তিনি। দুটি গোলই আসে তার হেড থেকে। দ্বিতীয়ার্ধে অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়া মাঠ ছাড়ার পর তপুর হাতেই ওঠে নেতৃত্বের আর্মব্যান্ড। অধিনায়কত্বের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দলকে জয়ও উপহার দেন তিনি।
ফিফা র্যাংকিংয়ের সর্বনিম্ন অবস্থানে থাকা সান মারিনো ইউরোপের দল হওয়ায় নিয়মিতভাবে জার্মানি, স্পেন, ইতালির মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে খেলে থাকে। সেই বিবেচনায় ইউরোপের মাটিতে ইউরোপের কোনো দলের বিপক্ষে বাংলাদেশের এই জয় বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। এর আগে ২০০০ সালে ইংল্যান্ডে ভারতের বিপক্ষে খেললেও জয় পায়নি বাংলাদেশ। এছাড়া ২০০১ সালে ভারতে বসনিয়ার বিপক্ষে ২-০ গোলে পরাজিত হয়েছিল দলটি।
ম্যাচের শুরুতে কিছুটা নড়বড়ে ছিল বাংলাদেশ। বলের দখল ও আক্রমণে এগিয়ে ছিল স্বাগতিকরা। তবে ১০ মিনিটের পর ধীরে ধীরে খেলায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে বাংলাদেশ। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯ মিনিটে এগিয়ে যায় সফরকারীরা। হামজা চৌধুরীর ফ্রি-কিক থেকে শেখ মোরসালিন ডান প্রান্ত দিয়ে ক্রস বাড়ালে তপু বর্মণ দারুণ এক হেডে বল জালে পাঠান। গোলের পর গ্যালারিতে থাকা বাংলাদেশি সমর্থকদের উল্লাসে মুখর হয়ে ওঠে পুরো স্টেডিয়াম।
তবে বাংলাদেশের সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ৩৩ মিনিটে রক্ষণভাগের ভুলের সুযোগ নিয়ে সমতায় ফেরে সান মারিনো। বেরার্দি আক্রমণ গড়ে বক্সের ভেতরে কাটব্যাক করলে নিকোলাস ফাঁকা জায়গা থেকে শট নেন। গোলরক্ষক মিতুল মারমা বল স্পর্শ করলেও তা জালে জড়িয়ে যায়।
প্রথমার্ধের বাকি সময়ে আবারও এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল বাংলাদেশ। শেখ মোরসালিনের বাড়ানো বল থেকে সাদ উদ্দিন গোলরক্ষকের মুখোমুখি হলেও লক্ষ্যভ্রষ্ট শট নেন।
বিরতির পর বাংলাদেশের কোচ থমাস ডুলি কৌশলগত পরিবর্তন এনে সামিত সোম, জায়ান আহমেদ ও সোহেল রানা জুনিয়রকে মাঠে নামান। তাদের উপস্থিতিতে আক্রমণের গতি বাড়ে। বাংলাদেশ একটি নিশ্চিত গোল থেকেও বঞ্চিত হয়, যখন ফয়সাল আহমেদ ফাহিমের জোরালো শট সাইড পোস্টে লেগে ফিরে আসে।
ম্যাচের ৭৫ মিনিটের দিকে বিশ্বনাথ ঘোষকে মাঠে নামান ডুলি। স্বাভাবিকভাবে ফুলব্যাক হিসেবে খেললেও এদিন তাকে ডান প্রান্তের আক্রমণভাগে ব্যবহার করা হয়। শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্তই ফল এনে দেয়। ৮৬ মিনিটে হামজা চৌধুরীর নেওয়া ফ্রি-কিক থেকে বিশ্বনাথের ভলি শটের পর বল তপু বর্মণের মাথায় লেগে জালে প্রবেশ করে। এতে ২-১ ব্যবধানে আবারও এগিয়ে যায় বাংলাদেশ।
শেষ দিকে সমতা ফেরানোর মরিয়া চেষ্টা চালায় সান মারিনো। চতুর্থ রেফারি চার মিনিট অতিরিক্ত সময় ঘোষণা করলে ম্যাচে উত্তেজনা আরও বাড়ে। এক পর্যায়ে গোলরক্ষক মিতুল মারমার হাত ফসকে বল গোললাইনের কাছাকাছি চলে গেলেও পুরোপুরি লাইন অতিক্রম না করায় বিপদ থেকে রক্ষা পায় বাংলাদেশ। শেষ মুহূর্তগুলো দৃঢ়তার সঙ্গে সামলে নিয়ে ঐতিহাসিক জয় নিশ্চিত করে লাল-সবুজের দল।
ইতালির ভেতরে অবস্থিত ক্ষুদ্র রাষ্ট্র সান মারিনোতে এদিন গ্যালারির বড় অংশজুড়েই ছিল বাংলাদেশি সমর্থকদের উপস্থিতি। ইতালির রোম, ভেনিসসহ বিভিন্ন শহর থেকে প্রবাসীরা হামজা চৌধুরীদের খেলা দেখতে স্টেডিয়ামে ছুটে আসেন। ফলে অ্যাওয়ে ম্যাচ হলেও পুরো স্টেডিয়ামজুড়ে ছিল যেন বাংলাদেশের ঘরের মাঠের আবহ।
ইউরোপের মাটিতে ইউরোপের দলের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচেই জয় তুলে নিয়ে বাংলাদেশের ফুটবল নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করল। এই জয় দেশের ফুটবলের জন্য যেমন অনুপ্রেরণার, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাসও বাড়িয়ে দিল বহুগুণ।