যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। ছবি: রয়টার্স
মেলবোর্ন, ২১ জুলাই- যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নিয়েছেন লেবার পার্টির নেতা অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। সোমবার (স্থানীয় সময়) দুপুরে বাকিংহাম প্যালেসে রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তিনি সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম ভাষণে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেন।
এর আগে বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার রাজা তৃতীয় চার্লসের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান।
প্রথম ভাষণে যে বার্তা দিলেন
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম ভাষণে বার্নহ্যাম বলেন, “আমরা যথেষ্ট ভালো ছিলাম না। আমাদের আরও ভালো হতে হবে। আমরা তা-ই হব।”
তিনি জানান, চলতি বছরের শেষ নাগাদ যুক্তরাজ্যের জন্য ১০ বছরের একটি জাতীয় পরিকল্পনা প্রকাশ করা হবে। এতে অর্থনীতি, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন এবং আঞ্চলিক উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা তুলে ধরা হবে।
বার্নহ্যাম বলেন, ব্রিটিশ রাজনীতিতে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনাই হবে তাঁর সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
তিনি বলেন, “আজকের মুহূর্তটি যুক্তরাজ্যের জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট। আজ থেকেই আমরা নতুনভাবে শুরু করছি।”
অগ্রাধিকার কী?
প্রধানমন্ত্রী জানান, জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে সরকারের কর্মসূচি মঙ্গলবার থেকে ঘোষণা করা হবে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকা কিছু ক্ষমতা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, তাঁর সরকার যুক্তরাজ্যকে আবার শিল্পোন্নত রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করবে। একই সঙ্গে জনসেবা আরও সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করা এবং শিল্পখাতে নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত করার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন।
গৃহহীনতা মোকাবিলায় কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়ে বার্নহ্যাম বলেন, “আমাদের দেশের কাউকে যেন রাস্তায় রাত কাটাতে না হয়, এটি নিশ্চিত করাই হবে আমার প্রথম নির্দেশ।”
এ ছাড়া আরও বেশি কাউন্সিল হাউস নির্মাণ, তরুণদের কর্মসংস্থান বাড়াতে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, মানসিক স্বাস্থ্যসেবাসহ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং প্রতিরক্ষা খাতে বিদ্যমান অঙ্গীকার বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
জাতীয় ঐক্যের আহ্বান
ভাষণের শেষ দিকে বার্নহ্যাম বলেন, “মানুষের যত্ন নেওয়াই হবে আমার সরকারের কেন্দ্রবিন্দু। আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। আমরা নতুন একটি জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলব। আজ সেই দিন, যেদিন ব্রিটেন আবার বিশ্বাস করতে শুরু করবে, যেদিন আমরা আশা ফিরিয়ে আনব।”
ভাষণ শেষে সমর্থকদের করতালির মধ্যে স্ত্রী মেরি-ফ্রান্স ভ্যান হিলকে শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে প্রবেশ করেন।
যেভাবে প্রধানমন্ত্রী হলেন
সাম্প্রতিক স্থানীয় সরকার নির্বাচনে লেবার পার্টির ভরাডুবির পর প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে দলের ভেতরে তীব্র চাপ তৈরি হয়। পরে তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দিলে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
এ সময় উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে অ্যান্ডি বার্নহ্যাম হাউস অব কমন্সে ফিরে আসেন। পরে দলীয় ভোটে লেবার পার্টির নেতা নির্বাচিত হন। রাজা তৃতীয় চার্লস সরকার গঠনের আহ্বান জানালে ব্রিটিশ সাংবিধানিক রীতি অনুযায়ী তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
বার্নহ্যামের দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে গত চার বছরে যুক্তরাজ্য পঞ্চম প্রধানমন্ত্রী পেল। নেতৃত্বের ধারাবাহিক পরিবর্তনের কারণে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, নতুন প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রথম ভাষণেই সেই আস্থা পুনর্গঠনের অঙ্গীকার করেছেন।
মন্ত্রিসভা গঠনের কাজ শুরু
দায়িত্ব নেওয়ার পর বার্নহ্যামের প্রথম বড় দায়িত্ব নতুন মন্ত্রিসভা গঠন। এরই মধ্যে আগের মন্ত্রিসভার কারাগারবিষয়ক মন্ত্রী লর্ড টিম্পসন পদত্যাগ করেছেন। ডাউনিং স্ট্রিট জানিয়েছে, দিনভর নতুন মন্ত্রী নিয়োগ ও দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের কাজ চলবে। তবে নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের নাম এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি।
কে এই অ্যান্ডি বার্নহ্যাম?
৫৬ বছর বয়সী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ইংল্যান্ডের মেরসিসাইডে জন্মগ্রহণ করেন। ২০০১ সালে প্রথমবারের মতো লেবার পার্টির সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। টনি ব্লেয়ার ও গর্ডন ব্রাউনের সরকারের সময়ে স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি ও অর্থ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
২০১০ ও ২০১৫ সালে লেবার পার্টির নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরাজিত হলেও ২০১৭ সালে গ্রেটার ম্যানচেস্টরের মেয়র নির্বাচিত হন এবং টানা তিন মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। কোভিড-১৯ মহামারির সময় স্থানীয় জনগণের স্বার্থে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার কারণে তিনি জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।