বাংলাদেশ সরকারের প্রকাশিত ‘জুলাই শহীদ’ গেজেট নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তুলেছে ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও অবসরপ্রাপ্ত কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার সমন্বয়ে গঠিত অনানুষ্ঠানিক জোট MARK&AUA। ছবি : সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৩ জুলাই: বাংলাদেশ সরকারের প্রকাশিত ‘জুলাই শহীদ’ গেজেট নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তুলেছে ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও অবসরপ্রাপ্ত কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার সমন্বয়ে গঠিত অনানুষ্ঠানিক জোট MARK&AUA। তাদের নয় মাসব্যাপী তদন্তে দাবি করা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন, এমন বহু ব্যক্তিকে গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাদের অভিযোগ, আন্দোলনকে আরও ব্যাপক ও প্রাণঘাতী হিসেবে উপস্থাপনের উদ্দেশ্যেই এটি করা হয়েছে।
তদন্তে আরও দাবি করা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না, এমন বহু ব্যক্তির নাম গেজেটে স্থান পেয়েছে। এমনকি তালিকাভুক্তদের প্রায় অর্ধেকই ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মারা গেছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
MARK&AUA-এর অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকার জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনের কাছে ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য সরবরাহ করেছে, যার ফলে তদন্ত প্রভাবিত হয়েছে।
তদন্তে উত্থাপিত প্রধান দাবি
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,গেজেটের ১ থেকে ২৪ নম্বর পর্যন্ত তালিকাভুক্ত ২৪ জনই ৫ আগস্টের আগে মারা গেলেও, তাদের কেউই কোটা আন্দোলন বা সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নিহত হননি।
২৫ থেকে ১০০ নম্বর পর্যন্ত ৭৬ জনের সবাই ৫ আগস্ট বা তার পরে মারা যান, তবে তাদের মৃত্যুও কোটা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় বলে দাবি করা হয়েছে। ১০১ থেকে ৩৫৮ নম্বর পর্যন্ত ২৫৮ জনের মৃত্যু ৫ আগস্ট বিভিন্ন থানায় হামলা কিংবা অজ্ঞাত স্নাইপারের গুলিতে হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ৩৫৯ থেকে ৩৭০ নম্বর পর্যন্ত ১২ জন ৫ আগস্টের আগে থানায় হামলা এবং পুলিশের প্রতিরোধের সময় নিহত হন বলে দাবি করা হয়েছে।
সরকারি শহীদের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কহীন বিভিন্ন কারণে নিহত ব্যক্তিদেরও গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
কবির’ আসলে ‘বাখের আলী’?
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে থানায় সমন্বিত হামলা হয়। উত্তরা পূর্ব থানাতেও হামলার ঘটনা ঘটে। আত্মরক্ষার্থে পুলিশ শটগানের গুলি ছোড়ে।
MARK&AUA-এর দাবি, টঙ্গী থেকে বিজয় মিছিলে অংশ নিতে আসা ‘কবির’ নামে এক ব্যক্তি আজমপুর এলাকায় অজ্ঞাত স্নাইপারের গুলিতে আহত হন। পরে তাকে উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ‘কবির’ই অন্তর্বর্তী সরকারের জুলাই শহীদ গেজেটের ২০৪ নম্বরে অন্তর্ভুক্ত। তবে তদন্তকারীদের দাবি, ‘কবির’ নামে পরিচিত ওই ব্যক্তি আসলে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি বাখের আলী।
বাখের আলী সম্পর্কে যা বলা হয়েছে
MARK&AUA-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বাখের আলী চরমপন্থী সশস্ত্র সংগঠন লাল্টু বাহিনীর সদস্য ছিলেন। গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি টঙ্গীর আরিচপুর এলাকায় স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে ভুয়া পরিচয়ে বসবাস করতেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ১৯৯৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে জাসদ নেতা ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক কাজী আরেফ আহমেদ হত্যাকাণ্ডে বাখের আলী অভিযুক্ত ছিলেন। ওই মামলায় নয়জনের মৃত্যুদণ্ড হয়। তদন্তে দাবি করা হয়েছে, তিনজনের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে, একজন কারাগারে মারা গেছেন, একজন ২০২১ সালে গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং বাখের আলীসহ চারজন দীর্ঘদিন পলাতক ছিলেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধের সময় বাখের আলী নিহত হন। পরে তাকে ‘কবির’ পরিচয়ে জুলাই শহীদ গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়েছে, বাখের আলীর প্রকৃত স্থায়ী ঠিকানা ছিল কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার বোয়ালিয়া ইউনিয়নের কিশোরীনগর গ্রামে। কিন্তু গেজেটে তার স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার কলেজপাড়া উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও তাকে নিজ গ্রামের কবরস্থানে দাফন করা হয়।
প্রতিবেদনের দাবি, ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট তার মৃত্যুর প্রথম বার্ষিকীতে দৌলতপুর উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারাও তার কবর জিয়ারত ও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
‘গণহত্যার বর্ণনা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা’
MARK&AUA-এর প্রতিবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, গণমাধ্যম ও জাতিসংঘকে বিভ্রান্ত করতে ‘গণহত্যা’ ও ‘শহীদ’ সংক্রান্ত একটি নির্দিষ্ট বর্ণনা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, জুলাই আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে পরিচিত আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হননি এবং মুগ্ধও অজ্ঞাত স্নাইপারের গুলিতে নিহত হন। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটি ‘গণহত্যার বর্ণনা’ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়েছে বলেও তদন্তকারীরা অভিযোগ করেছেন।
উল্লেখ্য, MARK&AUA-এর এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ বা অভিযুক্ত পক্ষের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়াও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
সূত্র: নর্থইস্ট নিউজ