মেলবোর্ন, ১০ আগষ্ট- কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে ওমানের সঙ্গে একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে ইরান। তবে প্রণালিটি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে হবে বলে জানিয়েছে তেহরান।
ইরানের শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে দেশটির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, সামরিক হুমকি বন্ধ, উপসাগরে মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া, ইরানের জব্দ করা সম্পদ ছাড় এবং সাম্প্রতিক হামলায় হওয়া ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়া।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে সংঘাত শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন হতো। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে কার্যত জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজার ও মূল্যস্ফীতিতে।
ওমানের সঙ্গে চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সোমবার জানান, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থা নিয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা ‘সুষ্ঠু ও গঠনমূলকভাবে’ এগোচ্ছে।
তেহরানে সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, জাহাজ চলাচলের জন্য একটি রুটের মানচিত্র নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে। তবে যৌথ বিবৃতির কিছু কারিগরি বিষয় এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।
নিরাপদ নৌ চলাচল, পরিবেশ সুরক্ষা, সামুদ্রিক সেবা এবং অপরাধ দমনের ব্যবস্থাও আলোচনায় এসেছে বলে জানান বাঘাই। এসব সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণত অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থাও থাকে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একাধিক শর্ত
রোববার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেছিলেন, ওমানের সঙ্গে চুক্তিটি ‘চূড়ান্ত পর্যায়ে’ রয়েছে। তবে তিনি স্পষ্ট করে দেন, শুধু ওমানের সঙ্গে সমঝোতা হলেই ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে না।
তেহরানের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত প্রণালিতে পূর্ণাঙ্গ নৌ চলাচল পুনরায় চালু করা হবে না বলে জানান তিনি।
আরাকচির ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি কোনো আলোচনা চলছে না। জুনে স্বাক্ষরিত একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি ওয়াশিংটন লঙ্ঘন করছে বলে মনে করে তেহরান। সে কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসতেও রাজি নয় ইরান। তবে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান হচ্ছে।
ট্রাম্পের মন্তব্য
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প Axios-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ‘লো-কি’ বা তুলনামূলকভাবে নীরব অবস্থানে রয়েছে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে ‘আংশিকভাবে আলোচনা’ করছে। একই সঙ্গে তিনি ইরানের উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক সংকটের কথাও তুলে ধরেন।তবে আরাকচি বলেন, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়টি নির্ভর করবে ইরানে ব্যাপক হামলায় সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ক্ষতিপূরণ দেয় কি না, তার ওপরও।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার বিদায়ী সচিব মোহাম্মদ বাঘের জোলকদরও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বেশ কিছু দাবি তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন মার্কিন হুমকি বন্ধ করা, ইরান ও লেবানন, ফিলিস্তিন, ইয়েমেন ও ইরাকের মিত্রদের বিরুদ্ধে হামলা বন্ধ করা, উপসাগরে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং জব্দ করা ইরানি সম্পদ মুক্ত করা।
এদিকে রোববার ইরান জানায়, সাবেক রেভল্যুশনারি গার্ডস কমান্ডার মোহসেন রেজাই জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদে দায়িত্ব নেবেন। তিনি জোলকদরের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন। জোলকদরের তুলনায় রেজাইকে আরও কট্টর ও স্পষ্টভাষী হিসেবে দেখা হয়।
তবে জোলকদরকে সরানোর কারণ জানানো হয়নি। এই পরিবর্তনের ফলে ইরানের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো পরিবর্তন আসবে কি না, সেটিও এখনো স্পষ্ট নয়।
চুক্তির আশায় তেলের দাম কিছুটা বেড়েছে
হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদ থাকলেও ইরানের শর্তের কারণে অনিশ্চয়তা কাটেনি। এর প্রভাব পড়েছে তেলের বাজারে।
সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৪ দশমিক ২২ ডলারে উঠেছে। এপ্রিলের শেষ দিকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্নের কারণে আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্টের দাম প্রায় ১২৬ ডলারে উঠেছিল, যা ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ।
ইরানে হামলার পক্ষে ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি ছিল, দেশটিকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখা এবং আঞ্চলিক হুমকি দেওয়ার সক্ষমতা কমানো। তবে যুদ্ধ শেষ করার জন্য ট্রাম্পের ওপর অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়ছে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধটি ক্রমেই অজনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
জুনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হলেও জুলাইয়ে উপসাগরে ইরানি জাহাজ চলাচলের ওপর যুক্তরাষ্ট্র আবার অবরোধ আরোপ করে। তেহরান এই পদক্ষেপকে যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন বলে অভিযোগ করে। এর মধ্যে যুদ্ধবিরতিও কার্যত ভেঙে পড়ে।
এক মার্কিন কর্মকর্তা শুক্রবার Reuters-কে বলেন, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নির্বিঘ্নে পুনরায় চালুর বিষয়ে চুক্তি ঘোষণা হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত অবরোধ তুলে নেবে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, ইরান তার প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করছে কি না, তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ভর করবে।
হরমুজ নিয়ে প্রস্তাবিত ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ
Reuters-এর কাছে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য চুক্তিতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজগুলোর চলাচল নিয়ন্ত্রণে ইরানকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেওয়ার বিষয়টি রয়েছে।
তবে জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাস্তবে এমন ব্যবস্থা কার্যকর করা কঠিন হতে পারে। ফলে সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে এখনো বেশ কিছু বাস্তবায়নগত প্রশ্ন রয়েছে।
ইয়েমেনে হুথিদের হামলাও বাড়ছে
হরমুজ প্রণালিতে ইরানি হামলার পাশাপাশি ইয়েমেনভিত্তিক ইরানের মিত্র হুথিদের হামলাও বেড়েছে। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মধ্যবর্তী আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথে হুথিরা জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে।
গত মাসে সৌদি আরবের বিরুদ্ধেও লোহিত সাগরে নৌ অবরোধ ঘোষণা করে হুথিরা। তাদের দাবি, ইয়েমেনে সৌদি আরব তাদের ওপর অবরোধ আরোপ করেছে। তবে রিয়াদ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সৌদি আরব ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন করে।
এদিকে ইয়েমেনে হুথি ও সরকারি বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষও তীব্র হয়েছে। ইয়েমেনের সামরিক বাহিনী সোমবার জানিয়েছে, লোহিত সাগরের বন্দরনগরী মোখায় হুথিদের হামলায় সামরিক সদস্য ও বেসামরিক নাগরিকসহ সাতজন নিহত হয়েছেন।
সামরিক বাহিনীর দাবি, হামলায় অংশ নেওয়া ১১টি হুথি ড্রোন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে ভূপাতিত করা হয়েছে।
ওমানের সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নতুন ব্যবস্থা নিয়ে ইরানের সমঝোতা প্রায় চূড়ান্ত হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বড় ধরনের মতপার্থক্য এখনো রয়ে গেছে। ক্ষতিপূরণ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, সামরিক হুমকি বন্ধ ও নৌ অবরোধ তুলে নেওয়াসহ একাধিক দাবি পূরণ না হলে প্রণালিটি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার পথে যাবে না তেহরান। ফলে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি।
সূত্র-রয়টার্স