সৌদিতে সোফা কারখানায় আগুনে নিহত ১৬ বাংলাদেশি। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১০ আগষ্ট- সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের শিফা থানাধীন মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকায় একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১৬ বাংলাদেশির প্রাথমিক পরিচয় পাওয়া গেছে। রোববার (৯ আগস্ট) স্থানীয় সময় দুপুরে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। নিহতদের মধ্যে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ১৩ জন, নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার দুজন এবং রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার একজন রয়েছেন।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, অগ্নিকাণ্ডের সময় কারখানাটিতে মোট ১৭ জন বাংলাদেশি কর্মী ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ১৬ জনই মারা গেছেন। হাবিবুর রহমান হাবিব নামে একজন কর্মী ঘটনার সময় কারখানার বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান।
নিহতদের পরিচয় সংশ্লিষ্ট সৌদি কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং নিহতদের পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
নওগাঁর আত্রাই উপজেলার নিহতদের মধ্যে রয়েছেন গন্ডগোহালী গ্রামের মো. রুবেল প্রামানিক, তাঁর বাবার নাম মো. সাইদুর রহমান; কলিমউদ্দিন, তাঁর বাবার নাম মৃত বজলুর প্রামানিক; মো. মোহন ও মো. সুমন, তাঁদের বাবার নাম গুফফার প্রামানিক; এবং খরস্রোতা গ্রামের মজিদুল, তাঁর বাবার নাম মজনু। এ ছাড়া একই উপজেলার উ
জানপই গ্রামের ফরিদ, ডুবাই গ্রামের শুভ ও সুমন, বোয়ালা গ্রামের হৃদয়, নওগাঁ গ্রামের শাহিন, খরস্রোতা গ্রামের আব্দুল জলিল এবং সাদনগর গ্রামের সাগর নিহত হয়েছেন। মিনহাজের গ্রামের নিহত একজনের নাম প্রাথমিকভাবে জানা যায়নি।
নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার দিঘীরপাড় গ্রামের শামিম এবং খাজুরা গ্রামের সাব্বিরও অগ্নিকাণ্ডে মারা গেছেন। নিহত অপর বাংলাদেশি রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার মরুগ্রাম-ডাংগাপাড়া এলাকার শ্যামল।

সৌদিতে সোফা কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশি নিহত।ছবি: সংগৃহীত
আগুনের সূত্রপাত নিয়ে প্রাথমিক ধারণা
রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ জানতে সৌদি কর্তৃপক্ষের তদন্ত চলছে।
রোববার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার দিকে কারখানাটিতে আগুন লাগে। খবর পেয়ে সৌদি ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার ও আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ শুরু করে। স্থানীয় সময় রাত ১১টার দিকে উদ্ধার অভিযান শেষ হয়। দূতাবাসের লেবার উইংয়ের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থল থেকে ১৬টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
স্থানীয় ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে আটজন সরাসরি আগুনে পুড়ে মারা গেছেন। অন্যরা কারখানার ভেতরে ছড়িয়ে পড়া ঘন কালো ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যান।
চুল কাটতে গিয়ে বেঁচে গেলেন হাবিবুর
ভয়াবহ এ দুর্ঘটনা থেকে একমাত্র জীবিত বাংলাদেশি কর্মী হাবিবুর রহমান হাবিব। ঘটনার সময় তিনি কারখানার বাইরে ছিলেন।
দূতাবাসের লেবার উইংকে দেওয়া বক্তব্যে হাবিবুর জানান, রোববার দুপুর দেড়টার দিকে তিনি চুল কাটার জন্য একটি সেলুনে যান। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে কারখানায় আগুন জ্বলতে দেখেন। পরে জানতে পারেন, ভেতরে থাকা তাঁর ১৬ সহকর্মীই মারা গেছেন। তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে দূতাবাসের প্রাথমিক তথ্যও মিলেছে।
হাবিবুর জানান, তাঁরা শুধু ওই কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন না, নিজেরাই কারখানাটি পরিচালনা করতেন। সেখানে সোফা ও আসবাব তৈরি করে নিজেরাই বিক্রি করতেন।
মরদেহ দেশে ফেরানোর উদ্যোগ
মর্মান্তিক এ ঘটনায় নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে পরিবারের কাছে হস্তান্তর এবং প্রয়োজনীয় ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করা, আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে দূতাবাস প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, নিহতদের পরিচয় শনাক্তকরণ এবং মরদেহ দেশে পাঠানোর আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে।
রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের একটি প্রতিনিধি দল ঘটনার খবর পাওয়ার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে যায় এবং তথ্য সংগ্রহ শুরু করে। নিহতদের পরিচয় নিশ্চিতকরণ, আইনি প্রক্রিয়া এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সার্বিক সহায়তায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে সৌদি আরবে অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশির মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা ও পরিবারগুলোর জন্য সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন।
সৌদি আরব বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার
সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান এবং সবচেয়ে বড় বৈদেশিক শ্রমবাজার। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের জন্য দেশটিতে যান। ২০২৫ সালেও বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য যাওয়া কর্মীদের বড় অংশ সৌদি আরবে গেছেন।
ফলে দেশটিতে কর্মরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা, কর্মপরিবেশ এবং কর্মস্থলে অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। রিয়াদের এই অগ্নিকাণ্ডে একই কারখানার ১৬ বাংলাদেশির মৃত্যু প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মস্থলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
নিহত ১৬ জন হলেন: ফরিদ, শুভ, মো. রুবেল প্রামাণিক, সুমন, মো. কলিম উদ্দিন, মো. মোহন, মো. সুমন, মিনহাজ, হৃদয়, শাহিন, আব্দুল জলিল, মজিদুল, সাগর, শামিম, সাব্বির ও শ্যামল। তাঁদের মধ্যে শামিম ও সাব্বির নাটোরের নলডাঙ্গা এবং শ্যামল রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার বাসিন্দা। নিহতদের পূর্ণ পরিচয় ও পারিবারিক তথ্য যাচাই শেষে আরও বিস্তারিত জানানো হবে।