মেলবোর্ন, ১০ আগষ্ট- পশ্চিম এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন একটি সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দিয়েছে বাংলাদেশ। লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দাব প্রণালি ও এডেন উপসাগর হয়ে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত নৌবাণিজ্যপথে নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়তে থাকায় এই জোট গঠন করা হয়েছে।
সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত নতুন এই জোটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ১৪টি দেশ। এগুলো হলো সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, পাকিস্তান, তুরস্ক, মিসর, জর্ডান, ইয়েমেন, বাংলাদেশ, নাইজেরিয়া, সুদান, জিবুতি ও সোমালিয়া।
জোটটির নেতৃত্ব দেবে সৌদি আরব এবং দেশটিতেই এর সদর দপ্তর স্থাপন করা হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সদস্য দেশগুলোর মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ পরিকল্পনা এবং সমন্বিত সামুদ্রিক অভিযান পরিচালনা করা হবে। তবে জোটের সনদ, কমান্ড কাঠামো এবং কোন পরিস্থিতিতে কী ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি আন্দোলনের পক্ষ থেকে সৌদি আরবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজে হামলা এবং গত ২০ জুলাই নৌ অবরোধ ঘোষণার পর সৌদি নেতৃত্বাধীন এই উদ্যোগ সামনে আসে। এর পর হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় সৌদি আরব তার প্রধান লোহিত সাগরীয় বন্দর ইয়ানবুর মাধ্যমে আরও বেশি পরিমাণে তেল পরিবহন শুরু করে। ফলে বাব আল-মান্দাব প্রণালির ওপরও চাপ ও নিরাপত্তাঝুঁকি বেড়েছে।
এর ফলে আরব উপদ্বীপ থেকে জ্বালানি সরবরাহের জন্য ব্যবহৃত দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ঘিরেই সৌদি আরবকে নতুন করে নিরাপত্তাঝুঁকির মুখে পড়তে হচ্ছে।
কেন জোটে যোগ দিল বাংলাদেশ
নতুন জোটের মূল লক্ষ্য সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার করা, নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলো সুরক্ষিত রাখা। বাংলাদেশও এ উদ্যোগে সমর্থন জানিয়েছে।
গত ২২ জুলাই হুতি আন্দোলনের নৌ অবরোধের নিন্দা জানিয়েছিল বাংলাদেশ। তখন ঢাকা সতর্ক করে বলেছিল, এ ধরনের পদক্ষেপ আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটাতে পারে।
আঞ্চলিক সংকটের কারণে বাংলাদেশের নিজেদের অর্থনীতি ও বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইউরোপে বাংলাদেশের বিপুল পরিমাণ তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি হয়। এসব পণ্যবাহী জাহাজ সাধারণত লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল ব্যবহার করে ইউরোপে যায়।
নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে জাহাজগুলো যদি এই নৌপথ এড়িয়ে চলতে বাধ্য হয়, তাহলে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তের কেপ অব গুড হোপ ঘুরে যেতে হয়। এতে জাহাজের যাত্রাপথ দীর্ঘ হয় এবং জ্বালানি ব্যবহার, পণ্য পরিবহন ব্যয়, বীমা খরচ ও পণ্য পৌঁছাতে সময় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
শুধু রপ্তানি নয়, লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল হয়ে বাংলাদেশ তুলা, রাসায়নিক পদার্থ, যন্ত্রপাতি ও বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল আমদানি করে। নৌপথে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা তৈরি হলে এসব পণ্যের পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে উৎপাদন ব্যয় ও ভোক্তা পর্যায়ের পণ্যের দামেও।
সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে সৌদি আরবের একটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ১৯৭৫ সালে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। এর পরের বছর থেকেই বাংলাদেশিদের সৌদি আরবে কর্মসংস্থানের প্রবাহ শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে শ্রমবাজার, প্রবাসী আয়, জ্বালানি ও উন্নয়ন সহযোগিতা দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে।
শুধু ২০২৫ সালেই বাংলাদেশ থেকে ৭ লাখ ৫২ হাজারের বেশি মানুষ কাজের জন্য সৌদি আরবে গেছেন। ওই বছর বিদেশে বাংলাদেশের মোট শ্রমিক পাঠানোর দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি ছিল সৌদি আরবগামী কর্মী।
সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম বড় প্রবাসী আয় উৎসও। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশিরা দেশে প্রায় ৫২৮ কোটি মার্কিন ডলার পাঠিয়েছেন। এটি ওই সময়ে বাংলাদেশে আসা মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় ১৬ শতাংশ।
এই অর্থ বাংলাদেশের লাখ লাখ পরিবারের খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও আবাসন ব্যয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি প্রবাসী আয় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতেও সহায়তা করে।
সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা শুধু শ্রমবাজার ও প্রবাসী আয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের জ্বালানি খাতেও অর্থায়ন করছে। ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক ইসলামিক বাণিজ্য অর্থায়ন করপোরেশন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের জ্বালানি আমদানির জন্য ১৪০ কোটি মার্কিন ডলার অর্থায়নে সম্মত হয়। এ ছাড়া সৌদি উন্নয়ন তহবিল ১৯৭৭ সাল থেকে বাংলাদেশে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ করে আসছে।
এই বাস্তবতাগুলোই সৌদি আরবের প্রস্তাবে বাংলাদেশের ইতিবাচক সাড়া দেওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন এই উদ্যোগে অংশ না নিলে শ্রমবাজার, প্রবাসী আয়, জ্বালানি সরবরাহ ও উন্নয়ন অর্থায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্কে অস্বস্তি তৈরি হতে পারত।
জোটে বাংলাদেশের ভূমিকা কী হবে
তবে নতুন এই জোটে বাংলাদেশ ঠিক কী ধরনের ভূমিকা পালন করবে, সে বিষয়ে সরকার এখনো বিস্তারিত জানায়নি। বাংলাদেশ কোনো যুদ্ধজাহাজ, বিমান বা সামরিক সদস্য পাঠাবে কি না, সে বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশের সম্ভাব্য ভূমিকার মধ্যে সামুদ্রিক নজরদারি তথ্য বিনিময়, যোগাযোগ কর্মকর্তা নিয়োগ, প্রশিক্ষণ সহায়তা, যৌথ বৈঠকে অংশগ্রহণ কিংবা আর্থিক সহযোগিতার মতো বিষয় থাকতে পারে। তবে এসবের কোনটি বাংলাদেশ করবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
গত ২ আগস্ট এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, সৌদি নেতৃত্বাধীন এই জোটে বাংলাদেশের যোগদানকে ইরানবিরোধী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা উচিত নয়। বাংলাদেশ ইরানের সঙ্গেও আলোচনা করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই উদ্যোগকে ইরানকে বাদ দেওয়া বা ইরানের ক্ষতি করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখার কারণ নেই। তাঁর মতে, জোটটির মূল উদ্দেশ্য হুতি আন্দোলনের সৃষ্ট হুমকি মোকাবিলা করা।
বাংলাদেশের জন্য এ ধরনের জোটে সীমিত পরিসরে অংশগ্রহণের নজিরও রয়েছে। ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন ইসলামিক সামরিক সন্ত্রাসবিরোধী জোটে বাংলাদেশ যোগ দিয়েছিল। তবে তখন বাংলাদেশ বড় ধরনের সামরিক বা পরিচালনাগত ভূমিকা নেয়নি। নতুন জোটেও একই ধরনের সীমিত অংশগ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে।
ইরানের সঙ্গে সম্পর্কও বিবেচনায় থাকবে
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আগের চেয়ে বেশি সংবেদনশীল। কারণ হুতি আন্দোলনের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরব ইরানের অন্যতম প্রধান আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী।
সৌদি আরব নতুন জোটকে প্রতিরক্ষামূলক উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করছে এবং কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে এটি গঠন করা হয়নি বলে জানাচ্ছে। তবে জোটটি বাস্তবে কী ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবে, তার ওপর এই অবস্থানের গ্রহণযোগ্যতা অনেকটাই নির্ভর করবে।
বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপত্তা দেওয়া, নজরদারি, উদ্ধার তৎপরতা এবং প্রতিরক্ষামূলক নৌ টহলকে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল সুরক্ষার অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে। কিন্তু ইয়েমেনের ভূখণ্ডে হামলা, সামরিক অভিযানে সহায়তা, ইরানি জাহাজ আটক কিংবা কোনো অবরোধে অংশ নেওয়ার মতো পদক্ষেপ বাংলাদেশকে সরাসরি আঞ্চলিক সংঘাতের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে।
ইরানের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি কোনো বিরোধ নেই। তেহরানের সঙ্গে ঢাকার সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কও রয়েছে। তবে অর্থনৈতিক ও শ্রমবাজারের দিক থেকে ইরানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক সৌদি আরবের তুলনায় অনেক সীমিত। ইরান বাংলাদেশের জন্য সৌদি আরবের মতো বড় শ্রমবাজার, প্রবাসী আয় বা উন্নয়ন অর্থায়নের উৎস নয়।
ফলে ভবিষ্যতে সৌদি আরব ও ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে কোনো ধরনের দ্বন্দ্ব তৈরি হলে বাংলাদেশকে কূটনৈতিকভাবে কঠিন ভারসাম্য বজায় রাখতে হতে পারে।
নৌপথ নিরাপদ হলে লাভবান হতে পারে বাংলাদেশ
বাব আল-মান্দাবসহ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিরাপত্তা বাড়লে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল আরও স্বাভাবিক হতে পারে। এতে পণ্য পরিবহন, বীমা ও জ্বালানি ব্যয়ের হঠাৎ বড় ধরনের বৃদ্ধির ঝুঁকি কমতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকেরা পণ্য পরিবহনে বিলম্বের ঝুঁকি থেকে কিছুটা সুরক্ষা পেতে পারেন।
তবে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটে বাংলাদেশের সদস্য হওয়ার কারণে সরাসরি দেশের জ্বালানি তেলের দাম বা পরিবহন ভাড়া কমবে, এমনটা বলা যায় না। এসব দাম নির্ভর করে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও পণ্যের মূল্য, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, কর এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি নীতির ওপরও।
একইভাবে, এই জোটে যোগদানের ফলে সৌদি আরবে বাংলাদেশিদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে, এমন কোনো ইঙ্গিতও এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
তবে সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করতে পারে। শ্রম অভিবাসন, প্রবাসী আয়, জ্বালানি অর্থায়ন ও উন্নয়ন সহযোগিতার ওপর এরই মধ্যে বাংলাদেশ-সৌদি সম্পর্কের বড় একটি অংশ নির্ভরশীল।
শেষ পর্যন্ত জোটে বাংলাদেশ কতটা এবং কী ধরনের ভূমিকা পালন করবে, তার ওপরই সিদ্ধান্তটির গুরুত্ব অনেকটা নির্ভর করবে। বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তায় সহযোগিতা করা এক বিষয়, আর বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
জোটটির কার্যপরিধি, কমান্ড কাঠামো, সামরিক কর্মকাণ্ডের নিয়ম এবং বাংলাদেশের নির্দিষ্ট দায়িত্ব এখনো প্রকাশ করা হয়নি। এসব বিষয় পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত সৌদি নেতৃত্বাধীন এই জোটে বাংলাদেশের যোগদানের কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাগত প্রভাব কতটা বিস্তৃত হবে, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন।