ট্রাম্পের আমলে ১ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি ভিসা বাতিল, বাদ পড়লেন যারা।ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১১ আগষ্ট: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বিদেশি নাগরিকদের ১ লাখ ৭৫ হাজারেরও বেশি ভিসা বাতিল করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ভিসার শর্ত লঙ্ঘন, বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকা, প্রতারণা, অভিবাসন ব্যবস্থার অপব্যবহার, মার্কিন নাগরিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতার আহ্বান এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগে এসব ভিসা বাতিল করা হয়েছে।
সোমবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ভিসা বাতিলের এই সর্বশেষ পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। দপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভিসা বাতিলের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ ও আচরণ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার পর ভিসা বাতিলের ঘটনা সবচেয়ে বেশি।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনায় হামলা, মাদক বা অ্যালকোহলের প্রভাবে গাড়ি চালানো, চুরি এবং মাদকসংক্রান্ত অপরাধ ভিসা বাতিলের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত অভিযোগ উঠলে তাদের ভিসার বৈধতা পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে।
পররাষ্ট্র দপ্তর কয়েকটি গুরুতর অপরাধের ঘটনাও তুলে ধরেছে। এর মধ্যে একজন বিদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। আরেকজনের বিরুদ্ধে অপহরণ ও মানবপাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে।
অন্য একজন বিদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে শিশুদের যৌন নিপীড়নের ছবি, ভিডিও এবং এ ধরনের অন্যান্য উপকরণ রাখার এক ডজনের বেশি অভিযোগ রয়েছে বলেও জানিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।
এ ছাড়া উত্তর আফ্রিকার একটি মার্কিন দূতাবাস ১০০টিরও বেশি ভিসা বাতিল করেছে এমন কিছু অভিভাবকের, যারা মূলত যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দেওয়ার উদ্দেশ্যে দেশটিতে গিয়েছিলেন বলে অভিযোগ। মার্কিন কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের উদ্দেশ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দিয়ে শিশুটিকে মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ তৈরি করা।
ভিসা বাতিলের বর্তমান প্রক্রিয়ায় শুধু অপরাধ বা অভিবাসনসংক্রান্ত অনিয়ম নয়, বিদেশি নাগরিকদের রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডও নজরে এসেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, রক্ষণশীল অধিকারকর্মী চার্লি কার্কের হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রকাশ্যে উল্লাস প্রকাশ করা কয়েকজন বিদেশি নাগরিকের ভিসাও বাতিল করা হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেছিলেন যে, চার্লি কার্ক ‘অনেক দেরিতে মারা গেছেন’।
মার্কিন সরকারের এই অবস্থান থেকে বোঝা যাচ্ছে, বিদেশি নাগরিকদের ভিসা সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে তাদের প্রকাশ্য বক্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কর্মকাণ্ডও গুরুত্ব পাচ্ছে।
এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছিল, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের অধীনে ১ লাখের বেশি ভিসা বাতিল করা হয়েছে। তখন এই সংখ্যাকে রেকর্ডসংখ্যক ভিসা বাতিলের ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। নতুন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সেই সংখ্যা এখন ১ লাখ ৭৫ হাজার ছাড়িয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বার হোয়াইট হাউসে ফেরার পর যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনবিরোধী অভিযান আরও জোরদার করেছে তার প্রশাসন। এর অংশ হিসেবে বিপুলসংখ্যক অভিবাসীকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে বৈধ ভিসা থাকা ব্যক্তিরাও ছিলেন।
একই সঙ্গে নতুন ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রশাসন কঠোর অবস্থান নিয়েছে। বিদেশি নাগরিকদের ভিসা আবেদনের সময় তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রম আরও বিস্তারিতভাবে যাচাই করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত তথ্য নিয়েও অতিরিক্ত যাচাই-বাছাই বাড়ানো হয়েছে।
মার্কিন কর্তৃপক্ষের যুক্তি হলো, ভিসা প্রদান ও যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানের অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে জাতীয় নিরাপত্তা, জননিরাপত্তা এবং অভিবাসন আইন মেনে চলার বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ কারণেই আবেদনকারী বা ভিসাধারীদের আচরণ ও কর্মকাণ্ডের ওপর বাড়তি নজর রাখা হচ্ছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের এই কঠোর ভিসা নীতি নিয়ে অধিকারকর্মী ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা সমালোচনা করেছেন। তাদের অভিযোগ, বিদেশি নাগরিকদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি এবং সেই কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে ভিসা বাতিলের সিদ্ধান্ত মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সমালোচকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ব্যক্তির বক্তব্য বা রাজনৈতিক মতামতকে ভিসা বাতিলের কারণ হিসেবে ব্যবহার করা হলে তা বিদেশি নাগরিকদের ওপর অতিরিক্ত নজরদারির পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে এর ফলে অভিবাসীদের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা সামাজিক মতাদর্শের কারণে আলাদাভাবে লক্ষ্যবস্তু করার আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে।
তবে ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ বা অবস্থানের অনুমতি কোনো ব্যক্তির স্বয়ংক্রিয় অধিকার নয়। ভিসাধারীদের আইন মেনে চলা এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য কোনো ঝুঁকি তৈরি না করার বিষয়টি নিশ্চিত করতেই কঠোর যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
এদিকে ১ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি ভিসা বাতিলের সর্বশেষ পরিসংখ্যান সামনে আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অভিবাসন ও ভিসা নীতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোচনা আরও জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে আগামী দিনে বিদেশি নাগরিকদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অপরাধের ইতিহাস এবং ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ড কতটা কঠোরভাবে যাচাই করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।