এসএসসিতে ৭ লাখ ফেল, ইংরেজি-গণিতে বড় ধাক্কা। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১২ আগস্ট: গত ১৯ বছরের মধ্যে এবার এসএসসি পরীক্ষায় সবচেয়ে কম পাসের হার দেখা গেছে। প্রতি তিনজন পরীক্ষার্থীর একজনের বেশি এবার উত্তীর্ণ হতে পারেনি। ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইংরেজি ও গণিত-এই দুই বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ফলাফল সবচেয়ে বেশি খারাপ হয়েছে। পাশাপাশি মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বিপর্যয় তুলনামূলক বেশি।
এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে পাস করেছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। গত বছর পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশীয় পয়েন্ট। এবার প্রায় ৭ লাখ শিক্ষার্থী ফেল করেছে। জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যাও কমেছে। এবার ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ২২ হাজার ৩৫৬ জন কম। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৭ সালের পর এবারই এসএসসিতে পাসের হার সবচেয়ে কম। প্রশ্ন উঠেছে, হঠাৎ করে ফলাফলে এত বড় পতনের কারণ কী?
ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা এবার সবচেয়ে স্পষ্ট হয়েছে। ময়মনসিংহ বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ছিল ৬৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ। সিলেট ও বরিশাল বোর্ডেও ইংরেজিতে পাসের হার ছিল প্রায় ৬৯ শতাংশ। কারিগরি ও মাদ্রাসা বোর্ডেও গণিতে দুর্বল ফল দেখা গেছে।
বিভাগভেদেও ফলাফলে বড় পার্থক্য রয়েছে। বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার ৮০ দশমিক ৬৪ শতাংশ হলেও মানবিক বিভাগে তা মাত্র ৪৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ। অর্থাৎ মানবিক বিভাগের অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
শিক্ষাবিদদের মতে, বিশেষ করে গ্রামীণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইংরেজি ও গণিতের দক্ষ শিক্ষকের সংকট দীর্ঘদিনের। অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীদের মৌলিক দক্ষতাও তৈরি হচ্ছে না।
এবারের পরীক্ষার্থীদের ‘দুর্ভাগা ব্যাচ’ হিসেবেও দেখছেন অনেকে। তাদের মাধ্যমিক পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় কেটেছে করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে। দীর্ঘদিনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় তাদের মধ্যে বড় ধরনের শিখন ঘাটতি তৈরি হয়। এরপর শিক্ষাক্রম নিয়েও পরিবর্তনের মুখে পড়তে হয়েছে তাদের। ২০২৪ সালে নবম শ্রেণিতে ওঠার পর নতুন শিক্ষাক্রমের বই দেওয়া হলেও সরকার পরিবর্তনের পর আবার ২০১২ সালের পুরোনো শিক্ষাক্রমে ফিরে যাওয়া হয়। ফলে শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে ধারাবাহিকভাবে ভিন্ন পদ্ধতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়েছে।
তবে ফল বিপর্যয়ের আরেকটি কারণ হিসেবে খাতা মূল্যায়নে এবার কঠোরতা ও স্বচ্ছতার কথা বলছেন বোর্ড কর্মকর্তা ও শিক্ষকরা। তাদের দাবি, এবার ‘ওভারমার্কিং’ করা হয়নি। খাতা দেখার জন্য শিক্ষকদের তুলনামূলক কম খাতা দেওয়া হয়েছে এবং মূল্যায়নের জন্যও বেশি সময় দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষাকেন্দ্রে কড়াকড়ি ও সিসিটিভি ব্যবহারের কারণে নকলের সুযোগও কম ছিল।
শিক্ষাবিদ রাশেদা কে. চৌধূরীর মতে, ফলাফলের বড় একটি কারণ শহর ও গ্রামের শিক্ষার মান এবং সুযোগের বৈষম্য। শহরের প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে ফলাফল তুলনামূলক ভালো হলেও গ্রামাঞ্চলের প্রতিষ্ঠান গুলোতে পরিস্থিতি বেশি খারাপ। এবার ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। এর মধ্যে ২২৬টি মাদ্রাসা। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান, শিক্ষক সংকট এবং ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলাদা করে বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাসের হার বাড়ানোর জন্য কৃত্রিমভাবে নম্বর বাড়ানো সমস্যার সমাধান নয়। বরং শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিখন ঘাটতি চিহ্নিত করে তা পূরণ করাই এখন সবচেয়ে জরুরি। এ জন্য দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য রেমিডিয়াল বা অতিরিক্ত ক্লাস চালু, গ্রামীণ এলাকায় ইংরেজি ও গণিতের দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ এবং শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠান গুলো নিয়ে নিবিড় গবেষণার পরামর্শ দিয়েছেন শিক্ষাবিদরা।
কারণ এবারের ফলাফলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা শুধু প্রায় ৭ লাখ শিক্ষার্থীর ফেল নয়; বরং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার কোথায় দীর্ঘদিন ধরে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা।