বাংলাদেশে সেল গঠনের চেষ্টা করছে আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখা
মেলবোর্ন, ১৪ আগষ্ট- বাংলাদেশে সন্ত্রাসী সংগঠন আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখা বা একিউআইএস নিজেদের কার্যক্রম বিস্তারের জন্য নতুন সেল গঠনের চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা…
মেলবোর্ন, ১৩ আগস্ট: ভারতের ঝাড়খণ্ডে সরকারি চাকরির নিয়োগে অনিয়ম, প্রশ্নপত্র ফাঁস ও দুর্নীতির অভিযোগের প্রতিবাদে রাজপথে নেমেছেন হাজারো তরুণ-তরুণী। দীর্ঘদিন ধরে চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিয়েও নিয়োগ না পাওয়ার হতাশা, বয়স বেড়ে যাওয়া এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তাঁদের আন্দোলনে নামতে বাধ্য করেছে।
গত ২৫ জুলাই থেকে রাঁচির রাজপথে আন্দোলন করছেন চাকরিপ্রার্থীরা। তাঁদের প্রধান দাবি, সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত করা।
চলতি মাসের ১০ আগস্ট রাঁচিতে বিধানসভা ঘেরাও কর্মসূচিতেও অংশ নেন হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থী। তাঁদের মধ্যে অনেকেই বছরের পর বছর ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশন (জেপিএসসি) ও ঝাড়খণ্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশনের (জেএসএসসি) বিভিন্ন পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন।
‘ঝাড়খণ্ড দিয়েছি, চাকরিও কি কিনে দেব?’
৩৫ বছর বয়সী চাকরিপ্রার্থী কৃষ্ণ দেব তাঁদেরই একজন। তাঁর বাবা ছিলেন ঝাড়খণ্ড রাজ্য গঠনের আন্দোলনের অংশগ্রহণকারী এবং বর্তমানে মাসে সাড়ে তিন হাজার রুপি পেনশন পান।
ছেলেকে একাধিকবার সরকারি চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিতে দেখে একসময় কৃষ্ণ দেবের বাবা তাঁকে বলেছিলেন, ‘আমরা তোমাদের ঝাড়খণ্ড দিয়েছি, তোমার জন্য কি এবার চাকরিও কিনে দেব? যাও, আমরা যেভাবে লড়াই করেছি, তোমাদের অধিকারের জন্য লড়াই করো।’
২০০০ সালে বিহার ভেঙে ঝাড়খণ্ড রাজ্য গঠিত হয়। কয়েক দশকের আন্দোলনের মাধ্যমে পৃথক রাজ্যের দাবি আদায় করেছিলেন আদিবাসী ও অন্যান্য আন্দোলনকারীরা।
কৃষ্ণ দেব গত ১০ বছর ধরে সরকারি চাকরির আশায় জেপিএসসির বিভিন্ন পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। কিন্তু এখনো চাকরি পাননি।
আন্দোলনে অংশ নিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, ঝাড়খণ্ডে সরকারি চাকরির প্রায় প্রতিটি পরীক্ষাকে ঘিরেই কোনো না কোনো অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস, উত্তরপত্রে অসংগতি থেকে শুরু করে চাকরি বিক্রির অভিযোগও রয়েছে বলে দাবি তাঁর।
তাঁর আরও অভিযোগ, পরীক্ষার ফল প্রকাশের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা নেই। শুধু রোল নম্বরের তালিকা প্রকাশ করা হয়। কাটঅফ নম্বর কত ছিল, কারা চাকরি পেলেন এবং তাঁরা যোগ্য কি না, এসব তথ্য প্রার্থীদের জানানো হয় না।
‘চাকরি না পেয়ে কি বাবার মতো কৃষিকাজেই ফিরব?’
আন্দোলনে অংশ নেওয়া আরেক চাকরিপ্রার্থী অশোক কুমারের পরিবার আর্থিকভাবে অসচ্ছল। এখনো তাঁদের মাটির বাড়িতে বসবাস করতে হয়।বছরের পর বছর চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার পরও চাকরি না পেয়ে অশোকের প্রশ্ন, শেষ পর্যন্ত কি তাঁকে বাবার মতো কৃষিকাজেই ফিরে যেতে হবে?
অশোকের অভিযোগ, অন্য রাজ্য থেকে আসা প্রার্থীরা ঝাড়খণ্ডের সরকারি চাকরিতে সুযোগ পাচ্ছেন। এমনকি স্থানীয় বিষয়ভিত্তিক পরীক্ষাতেও বাইরের রাজ্যের প্রার্থীরা ঝাড়খণ্ডের ছেলেমেয়েদের চেয়ে বেশি নম্বর পাচ্ছেন বলে তিনি দাবি করেন।
তাঁর প্রশ্ন, ঝাড়খণ্ডের প্রশাসনের বড় একটি অংশকে গ্রামীণ সমস্যা মোকাবিলা করতে হয়। সে ক্ষেত্রে বাইরের রাজ্যের প্রার্থীরা স্থানীয় গ্রাম ও মানুষের সমস্যা কতটা বুঝবেন?

দুর্বল হয়ে পড়েছেন অনশনকারীরা।ছবি: সংগৃহীত
লাঠি-জলকামানেও থামেনি আন্দোলন
সরকারি চাকরি ঝাড়খণ্ডের তরুণদের কাছে শুধু একটি কর্মসংস্থানের সুযোগ নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তারও প্রধান মাধ্যম। প্রতিবছর লাখ লাখ প্রার্থী জেপিএসসি ও জেএসএসসির বিভিন্ন পরীক্ষায় অংশ নেন।
এই দুই নিয়োগ সংস্থার বিরুদ্ধেই দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।
তবে আন্দোলনের পরিবেশ সব সময় উত্তেজনাপূর্ণ ছিল না। পুলিশের ব্যারিকেড সরিয়ে মাথায় তুলে নেওয়া, জলকামানের পানি ছোড়া হলে সেই পানিতে নাচা কিংবা পুলিশকে নিয়ে রসিকতা করার ঘটনাও দেখা গেছে।
প্রতিবাদকারীদের কয়েকজনকে পুলিশ সদস্যদের বলতে শোনা যায়, গরমের মধ্যে তাঁদের আরও বেশি পানি দেওয়া উচিত ছিল।
কর্তব্যরত কয়েকজন নারী পুলিশ সদস্যও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে রসিকতায় হাসি চাপতে পারেননি। ব্যক্তিগত আলাপে তাঁরা জানান, তাঁদের নিজেদের সন্তানরাও সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং আন্দোলনে অংশ নিচ্ছেন।
চাকরির অপেক্ষায় বাড়ছে বিয়ের চাপও
সরকারি চাকরির পরীক্ষায় দীর্ঘসূত্রতা ও বারবার অনিয়মের কারণে শুধু কর্মজীবন নয়, ব্যক্তিগত জীবনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ আন্দোলনকারীদের।
২৬ বছর বয়সী আয়ুষা আনুষা ও তাঁর বোনও সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আয়ুষার মতে, পরিবারের সমর্থন শুরুতে থাকলেও কয়েক বছর পর মেয়েদের ওপর বিয়ের চাপ বাড়তে থাকে।
তিনি বলেন, চাকরি না পাওয়ার কারণে অনেক নারী চাকরির বয়স পেরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় থাকেন। একইভাবে অনেক পুরুষ চাকরি না পাওয়ায় তাঁদের বিয়েও পিছিয়ে যাচ্ছে।
আয়ুষার ভাষায়, বছরের পর বছর পরীক্ষায় অংশ নিয়ে বারবার অনিয়মের মুখোমুখি হওয়ার কারণে ঝাড়খণ্ডের শিক্ষিত তরুণদের বয়স বাড়ছে, অথচ কর্মজীবনে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না।
অনশনে পাঁচজন, হাসপাতালে তিনজন
আন্দোলনের অংশ হিসেবে রাজনৈতিক কর্মী দেবেন্দ্র নাথ মাহাতোসহ পাঁচজন অনশন শুরু করেছেন। তাঁদের মধ্যে তিনজনকে শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
রাঁচির জয়পাল সিং মুণ্ডা স্টেডিয়ামে আন্দোলনকারীদের দুটি পৃথক শিবির রয়েছে।
একটি শিবিরের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেবেন্দ্র নাথ মাহাতো। তিনি ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে রাঁচি আসনে প্রার্থী ছিলেন। গত ২ আগস্ট থেকে তিনি অনশনে রয়েছেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় বিধানসভা ঘেরাও কর্মসূচির পর তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
অন্য শিবিরটি ‘জেপিএসসি-জেএসএসসি রিফর্মস মঞ্চ’ নামে আন্দোলন করছে। এখানে রাজনৈতিক পতাকা নেই। বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে থাকা চাকরিপ্রার্থীরাই এই শিবিরে অবস্থান করছেন।

অনশনে থেকে এখন হাসপাতালে ভর্তি রাজনৈতিক কর্মী দেবেন্দ্র নাথ মাহাতো।ছবি: সংগৃহীত
আন্দোলনকারীদের খাবার দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ
দীর্ঘ আন্দোলনের কারণে ক্লান্ত চাকরিপ্রার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন স্থানীয় মানুষ ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।
প্রতিদিনই কেউ না কেউ আন্দোলনকারীদের খাবারের ব্যবস্থা করছেন। একদিন একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্যরা ভাত, ডাল, সয়াবিন ও ভাজি নিয়ে আসেন।
১৮ বছর বয়সী দুই তরুণীও নিজেদের ব্যাগ থেকে খাবারের প্যাকেট বের করে আন্দোলনকারীদের মধ্যে বিতরণ করেন। তাঁদের একজন প্রিয়া ভৎস জানান, তাঁর বাবা-মা তাঁদের কিছু টাকা দিয়েছিলেন, যাতে তাঁরা আন্দোলনকারীদের খাবার কিনে দিতে পারেন।
প্রিয়ার ভাষায়, তিনিও ভবিষ্যতে চাকরি খুঁজবেন। তাই আন্দোলনরত তরুণদের দাবি তাঁর নিজের ভবিষ্যতের সঙ্গেও জড়িত।
স্লোগানের সঙ্গে চলছে লোকগান
আন্দোলনস্থলে শুধু স্লোগান নয়, চাকরিপ্রার্থীদের মনোবল বাড়াতে লোকগানও পরিবেশন করা হচ্ছে।
জেপিএসসি-জেএসএসসি রিফর্মস মঞ্চের এক পাশে বসে গান গাইছিল একটি আদিবাসী লোকগানের দল। নাগপুরি ভাষার গান, ঢোল ও বাঁশির মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের উৎসাহ দিচ্ছেন তাঁরা।
লোকশিল্পী রামচন্দ্র রাম বলেন, তাঁরা গান ও বাদ্যযন্ত্রের মাধ্যমে তরুণদের মানসিক শক্তি বাড়াতে চান। তাঁদের পরিবেশনায় দেশাত্মবোধক গান এবং শহীদদের নিয়ে গানও রয়েছে।
‘আমাদের একটিই স্বপ্ন, একটি চাকরি’
আন্দোলনকারীদের একজন উম্মে হাবিবা একজন কৃষকের মেয়ে। তিনিও অনশনে অংশ নিয়েছেন। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগে তিনি বলেন, মন্ত্রীদের সন্তানদের মতো তাঁদের বিদেশে পড়াশোনা করার সুযোগ নেই। তাঁদের একমাত্র স্বপ্ন একটি সরকারি চাকরি পাওয়া, যাতে বাবা-মায়ের মুখ উজ্জ্বল করতে পারেন এবং সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারেন।
তাঁর বাবা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ এবং ভাইয়েরা দিনমজুরের কাজ করেন। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় ভালো ছিলেন বলে পরিবার ও গ্রামের মানুষ তাঁর সাফল্যের অপেক্ষায় ছিলেন।
কিন্তু তাঁর অভিযোগ, একের পর এক পরীক্ষায় দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে তাঁর মতো মেধাবী চাকরিপ্রার্থীরা পিছিয়ে পড়ছেন।
উম্মে হাবিবার মতে, ঝাড়খণ্ডের বর্তমান তরুণ প্রজন্ম রাজ্যটিকে আরও এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখে। যে প্রজন্মের আগের মানুষরা একটি পৃথক রাজ্যের জন্য লড়াই করেছিলেন, সেই রাজ্যে আজ শিক্ষিত তরুণদের চাকরির জন্য রাস্তায় নামতে হচ্ছে, বিষয়টি তাঁদের জন্যও বেদনাদায়ক হতো।
ঝাড়খণ্ডের এই আন্দোলন এখন শুধু সরকারি চাকরির দাবিতে সীমাবদ্ধ নেই। দীর্ঘদিনের বেকারত্ব, নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ, বয়সসীমা পেরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা মিলিয়ে এটি রাজ্যের শিক্ষিত তরুণদের ক্ষোভ ও হতাশার বড় বহিঃপ্রকাশ হয়ে উঠেছে।
সূত্র-বিবিসি নিউজ
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au