১৯৩৭ সালে চীনের পার্পল মাউন্টেন অবজারভেটরির একটি দৃশ্য।
ছবি: এপি
মেলবোর্ন, ১৪ আগস্ট- চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট একটি পর্যবেক্ষণ সংস্থা নিউজিল্যান্ডে স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং অবকাঠামো স্থাপনের চেষ্টা করেছিল। তবে সেই উদ্যোগ ঠেকিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে নিউজিল্যান্ডের নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (NZSIS)। দেশটির ক্রমবর্ধমান ও জটিল গুপ্তচরবৃত্তির ঝুঁকি নিয়ে প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে ঘটনাটিকে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে।
নিউজিল্যান্ডের নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা জানায়, চীনের ‘পার্পল মাউন্টেন অবজারভেটরি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান দেশটির একটি স্থানীয় কোম্পানির মাধ্যমে ভূমিভিত্তিক মহাকাশ অবকাঠামো স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে ওই স্থানীয় কোম্পানিটি সম্ভবত জানত না, প্রস্তাবিত সরঞ্জাম থেকে সামরিক গুরুত্বসম্পন্ন গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হতে পারে।
তবে কোন নিউজিল্যান্ডের কোম্পানি এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিল কিংবা কীভাবে পরিকল্পনাটি ঠেকানো হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি NZSIS।
চীনের গুপ্তচরবৃত্তি নিয়ে সতর্কতা
NZSIS-এর প্রকাশিত ‘সিকিউরিটি থ্রেট এনভায়রনমেন্ট ২০২৬’ শীর্ষক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, নিউজিল্যান্ডে বড় পরিসরে গুপ্তচরবৃত্তি পরিচালনা করছে বলে শনাক্ত হওয়া একমাত্র দেশ চীন।
NZSIS-এর মহাপরিচালক অ্যান্ড্রু হ্যাম্পটন বলেন, তাঁদের আগের প্রতিবেদনে নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিও অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং বিদেশি গোয়েন্দা তৎপরতার ধরন ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।
চীনা দূতাবাসের কাছে এ বিষয়ে মন্তব্য চাওয়া হলেও তারা কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। পার্পল মাউন্টেন অবজারভেটরির কাছেও ই-মেইলে মন্তব্য চাওয়া হয়েছিল, তবে তারাও সাড়া দেয়নি।
চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পরামর্শ নয়
NZSIS বলেছে, চীনের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোই বর্তমানে তাদের সবচেয়ে সক্রিয় গুপ্তচরবৃত্তির হুমকি। তবে এর অর্থ এই নয় যে নিউজিল্যান্ডের প্রতিষ্ঠানগুলোকে চীনা সংস্থার সঙ্গে বাণিজ্য বা সহযোগিতা বন্ধ করতে হবে।
বরং বিদেশি ব্যবসায়িক ও গবেষণাভিত্তিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘চোখ খোলা রেখে’ এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
NZSIS-এর মতে, চীনের জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক আইন দেশটির নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে গোয়েন্দা সংস্থার অনুরোধ মেনে চলতে বাধ্য করতে পারে। এর আওতায় তথ্য, মেধাস্বত্ব কিংবা কোনো সিস্টেমে প্রবেশাধিকার হস্তান্তরের মতো বিষয়ও থাকতে পারে।
পার্পল মাউন্টেন অবজারভেটরির ঘটনাটি মূল্যায়ন করে NZSIS মনে করেছে, সেখান থেকে কোনো তথ্য সংগ্রহ করা হলে তা চীনা সরকারের কাছে স্বেচ্ছায় সরবরাহ করা হতো।
স্যাটেলাইট নজরদারিতে নিউজিল্যান্ড কেন গুরুত্বপূর্ণ
NZSIS বলছে, দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিউজিল্যান্ডের ভৌগোলিক অবস্থান দেশটিকে স্যাটেলাইট, মহাকাশের আবর্জনা ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক তথ্য পর্যবেক্ষণের জন্য ভূমিভিত্তিক অবকাঠামো স্থাপনে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
এ ছাড়া নিউজিল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে গঠিত গোয়েন্দা সহযোগিতা জোট ফাইভ আইসের সদস্য।
ফলে দেশটির ভূখণ্ডে স্থাপিত কোনো স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং বা মহাকাশ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা শুধু বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্রেই নয়, সামরিক ও কৌশলগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
সরকার, ব্যবসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ও নজরদারির লক্ষ্য
NZSIS জানিয়েছে, বিদেশি রাষ্ট্রগুলো নিউজিল্যান্ডের সরকারি সংস্থা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষকদের কাছ থেকে গোপন বা অপ্রকাশ্য তথ্য, উদ্ভাবনী প্রযুক্তি এবং মেধাস্বত্ব সংগ্রহের চেষ্টা করছে।
এ ধরনের তৎপরতায় সাইবার হামলা, প্রতিষ্ঠানের ভেতরের ব্যক্তিদের নিয়োগ, একাডেমিক অংশীদারত্ব, ভুয়া বা আড়াল করা কোম্পানি এবং বাণিজ্যিক মধ্যস্থতাকারীদের ব্যবহার করা হচ্ছে।
গোয়েন্দা সংস্থাটি আরও বলেছে, ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রযুক্তি ও সরবরাহব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতা, প্রবাসী জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে বিদেশি হস্তক্ষেপ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর বা বিভাজনমূলক কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা নিরাপত্তা ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে।
সূত্র: রয়টার্স