বিশ্ব

২৩ বছর পর ইরাক থেকে সেনা প্রত্যাহার করছে যুক্তরাষ্ট্র

  • 3:50 pm - August 13, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১২৫ বার
২৩ বছর পর ইরাক থেকে সেনা প্রত্যাহার করছে যুক্তরাষ্ট্র। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ১৩ আগষ্ট- ইরাক থেকে অবশিষ্ট সব সেনা আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রত্যাহার করে নিতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্য দিয়ে ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের মাধ্যমে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের দুই দশকেরও বেশি সময়ের সামরিক উপস্থিতির অবসান ঘটতে যাচ্ছে। মার্কিন ও ইরাকি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন করার প্রস্তুতি চলছে।

বুধবার ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের বৈঠকের পর ৩০ সেপ্টেম্বরকে ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোটের সামরিক মিশন শেষ করার চূড়ান্ত তারিখ হিসেবে পুনরায় নিশ্চিত করা হয়। একজন মার্কিন কর্মকর্তাও সেনা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা নিশ্চিত করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরাক ২০২৪ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের ইরাক মিশন গুটিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছিল। এরপর ধাপে ধাপে দেশটির বিভিন্ন এলাকা থেকে মার্কিন সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়া হয়। তবে উত্তর ইরাকের আধা-স্বায়ত্তশাসিত কুর্দিস্তান অঞ্চলে, বিশেষ করে এরবিল এলাকায়, কিছু মার্কিন সেনা ও সামরিক সক্ষমতা বজায় ছিল। এখন সেখান থেকেও প্রত্যাহার চলছে।

কুর্দি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, প্রায় তিন সপ্তাহ আগে থেকেই এরবিলের মার্কিন ঘাঁটি থেকে কর্মী ও সামরিক সরঞ্জাম সরানোর কাজ শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন সরঞ্জাম ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

২০০৩ থেকে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ সামরিক উপস্থিতি

২০০৩ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রশাসনের নেতৃত্বে ইরাকে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। তৎকালীন মার্কিন সরকার ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের সরকারের বিরুদ্ধে গণবিধ্বংসী অস্ত্র রাখার অভিযোগ তুলেছিল। পরে সেই দাবির পক্ষে প্রয়োজনীয় প্রমাণ না পাওয়ায় ইরাক যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়।

ইরাক যুদ্ধের সময় মার্কিন সেনা মোতায়েনের মাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়। ২০০৭ সালে বিদ্রোহ দমন ও নিরাপত্তা অভিযানের চূড়ান্ত পর্যায়ে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা সংখ্যা ১ লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি হয়েছিল। পরে ধাপে ধাপে সেনা কমানো হয় এবং ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্র তার যুদ্ধরত বাহিনীর প্রায় পুরোপুরি প্রত্যাহার সম্পন্ন করে।

তবে এই প্রত্যাহার দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ২০১৪ সালে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট বা আইএসআইএস ইরাক ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে তথাকথিত খেলাফত প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিলে পরিস্থিতি আবার বদলে যায়। ইরাক সরকারের আমন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক জোট আইএসবিরোধী সামরিক অভিযানে যুক্ত হয়।

ইরাকে আইএসআইএসের নিয়ন্ত্রণাধীন ভূখণ্ড ২০১৭ সালের মধ্যে কার্যত পুনরুদ্ধার করা হলেও জঙ্গিগোষ্ঠীটির বিচ্ছিন্ন তৎপরতা ও গোপন সেল পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। ২০২১ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ অভিযান আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করা হয়। এরপর অবশিষ্ট মার্কিন সেনারা মূলত ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রশিক্ষণ, পরামর্শ এবং সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা দেওয়ার দায়িত্বে ছিল।

২০২৪ সালে ওয়াশিংটন ও বাগদাদ সেই মিশনও পর্যায়ক্রমে শেষ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এখন ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শেষ সেনা প্রত্যাহারের মাধ্যমে সেই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হতে যাচ্ছে।

মার্কিন সেনা চলে গেলে অস্ত্র জমা দিতে হবে মিলিশিয়াদের

মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পাশাপাশি ইরাক সরকার দেশের ভেতরে সক্রিয় বিভিন্ন সশস্ত্র অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীকে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ নিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র ত্যাগ বা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অধীনে আসার জন্য ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় দিয়েছেন। সরকারের যুক্তি হলো, বিদেশি সেনা প্রত্যাহারের পর দেশের ভেতরে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর আলাদা অস্ত্রভাণ্ডার রাখার যৌক্তিকতা নেই।

তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে। ইরাকে প্রভাবশালী বেশ কয়েকটি ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী অস্ত্র ত্যাগের আহ্বানে আপত্তি জানিয়েছে। বিশেষ করে শক্তিশালী কিছু মিলিশিয়া দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন বাহিনীর উপস্থিতিকে নিজেদের অস্ত্রধারণের অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরে আসছে।

ফলে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং একই সময়ের মধ্যে মিলিশিয়াদের অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে আনার সরকারি পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

মার্কিন সেনামুক্ত ইরাকে নতুন নিরাপত্তা সমীকরণ

যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহার ইরাকের জন্য একদিকে দীর্ঘদিনের বিদেশি সামরিক উপস্থিতির অবসান, অন্যদিকে নতুন নিরাপত্তা বাস্তবতার সূচনা। ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনী এখন দেশটির নিরাপত্তার প্রধান দায়িত্ব বহন করবে। একই সঙ্গে কুর্দি অঞ্চল, ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া এবং অবশিষ্ট আইএসআইএস নেটওয়ার্কের মতো একাধিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে বাগদাদকে।

বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, মার্কিন বাহিনী চলে যাওয়ার পর ইরাকের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামো কতটা কার্যকরভাবে দেশের সব সশস্ত্র শক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। কারণ ইরানের ঘনিষ্ঠ বিভিন্ন মিলিশিয়ার নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব রয়েছে। এসব গোষ্ঠী যদি সরকারের নির্দেশ অমান্য করে অস্ত্র ধরে রাখে, তাহলে বিদেশি সেনামুক্ত ইরাকে নতুন করে অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা তৈরি হতে পারে।

এ ছাড়া আইএসআইএসের গোপন সেলগুলোও পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনীকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি সীমান্ত নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সহযোগিতার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

ফলে ৩০ সেপ্টেম্বর শুধু ইরাক থেকে শেষ মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের তারিখ নয়, দেশটির নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে যাচ্ছে। দুই দশকের বেশি সময় পর ইরাক যখন বিদেশি সামরিক উপস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার পথে, তখন রাষ্ট্রের হাতে অস্ত্রের একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই বাগদাদ সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই শাখার আরও খবর

শ্রমিক আন্দোলনের নেপথ্যে আওয়ামী লীগ, চাপে সরকার?

ওটিএন বাংলা রিপোর্ট :  পোশাকশ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন চতুর্থ দিনেও থামেনি। রাজধানীর মিরপুর, সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ, সড়ক…

ভেনেজুয়েলায় কলম্বীয় বিদ্রোহীদের ঘাঁটিতে সেনাবাহিনীর হামলা, নিহত ১৯

ভেনেজুয়েলার পশ্চিমাঞ্চলে কলম্বিয়ার একটি সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ঘাঁটি লক্ষ্য করে সেনাবাহিনীর চালানো হামলায় অন্তত ১৯ জন নিহত হয়েছেন। শুক্রবার ভোরে দেশটির আপুরে রাজ্যে এ অভিযান…

যশোরে ‘শেখ হাসিনা আসছে’ বলে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে আগুন, দুই পুলিশ সদস্য ক্লোজড

ওটিএন বাংলা রিপোর্ট : যশোরে ‘শেখ হাসিনা আসছে’ স্লোগান দিয়ে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনার ৩৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে…

বাংলাদেশের বিপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার টেস্ট স্কোয়াড ঘোষণা, ফিরলেন ডি জর্জি-হামজা

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানে ওয়ানডে সিরিজ জয়ের পর এবার বাংলাদেশের বিপক্ষে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজের প্রস্তুতি নিচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকা। আসন্ন এই সিরিজের জন্য ১৫ সদস্যের…

ডেঙ্গুতে আরও ৬ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১ হাজার ৯৭০

দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এডিস মশাবাহিত রোগটিতে আক্রান্ত হয়ে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১…

যুদ্ধ এড়াতে চায় আমিরাত, তবে প্রস্তুতি রাখছে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে কোনো সংঘাত চায় না সংযুক্ত আরব আমিরাত। তবে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে আবারও যুদ্ধ শুরু হলে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au