অস্ট্রেলিয়াকে অলআউট করল বাংলাদেশ
মেলবোর্ন, ১৩ আগষ্ট- ডারউইনে বাংলাদেশের পেসারদের দুর্দান্ত বোলিংয়ে প্রথম ইনিংসে ২০০ রানও করতে পারল না অস্ট্রেলিয়া। স্বাগতিকদের ১৯৮ রানে অলআউট করে প্রথম টেস্টের প্রথম দিনেই ম্যাচে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে বাংলাদেশ। ক্যারিয়ারসেরা বোলিং করে হাসান মাহমুদ একাই নিয়েছেন ৬ উইকেট। তাঁর সঙ্গে তাসকিন আহমেদ ও এবাদত হোসেনের কার্যকর বোলিংয়ে অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপ একের পর এক ধসে পড়ে।
ডারউইনের বাউন্সি উইকেটে টস জিতে বাংলাদেশকে বোলিংয়ে পাঠায় অস্ট্রেলিয়া। শুরু থেকেই নতুন বলের বাড়তি সুবিধা কাজে লাগান তাসকিন আহমেদ ও হাসান মাহমুদ। দুই দিকেই সুইংয়ের পাশাপাশি উইকেট থেকে বাড়তি বাউন্স আদায় করে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের চাপে রাখেন বাংলাদেশের পেসাররা।
হাসান নিজের দ্বিতীয় ওভারেই ট্রাভিস হেডকে প্রায় ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর করা শর্ট বল সামলাতে গিয়ে হেড ক্যাচ তুলে দিলেও বল নিরাপদ জায়গায় পড়ে যাওয়ায় বেঁচে যান অস্ট্রেলিয়ার এই ওপেনার।
তবে বেশিক্ষণ টিকতে পারেনি অস্ট্রেলিয়ার ওপেনিং জুটি। ইনিংসের ১২তম ওভারে হাসানের বলে উইকেটকিপার লিটন দাসের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন জেক ওয়েদারাল্ড। ২৩ রান করে তাঁর বিদায়ে ৪৫ রানের উদ্বোধনী জুটি ভাঙে।
নিজের পরের ওভারেই আবার আঘাত হানেন হাসান। এবার তাঁর শিকার ট্রাভিস হেড। গুড লেংথ থেকে ভেতরের দিকে ঢুকে আসা বল ব্যাটের ভেতরের কানায় লেগে স্টাম্পে আঘাত হানে। ২২ রান করে ফেরেন হেড। অস্ট্রেলিয়া তখন ২ উইকেটে ৫৬ রান।
এরপর স্টিভেন স্মিথকে একবার জীবন দেন বাংলাদেশ। এবাদত হোসেনের বলে স্লিপে সহজ ক্যাচ দিয়েছিলেন স্মিথ। তৃতীয় স্লিপে থাকা তানজিদ হাসান ক্যাচটি নিতে পারেননি। তবে পরের ওভারেই এবাদত ফিরিয়ে দেন মার্নাস ল্যাবুশেনকে।
অফ স্টাম্পের সামান্য বাইরে গুড লেংথের বলে ব্যাট চালাতে গিয়ে দ্বিতীয় স্লিপে নাজমুল হোসেন শান্তর হাতে ক্যাচ দেন ল্যাবুশেন। মাত্র ২০ বল খেলে ১ রান করেন তিনি।
দ্রুত তিন উইকেট হারিয়ে চাপে পড়া অস্ট্রেলিয়াকে পাল্টা আক্রমণে উদ্ধারের চেষ্টা করেন ক্যামেরন গ্রিন। তাসকিন আহমেদের করা ২২তম ওভারের প্রথম বলেই ডিপ স্কয়ার লেগ দিয়ে ছক্কা হাঁকান তিনি। কিন্তু পরের বলগুলোতে বাংলাদেশের পরিকল্পিত বোলিংয়ের সামনে বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি গ্রিন।
ওভারের শেষ বলে অন সাইডে খেলতে গিয়ে শর্ট মিডউইকেটে মুশফিকুর রহিমের হাতে ক্যাচ দেন গ্রিন। ১৩ বলে ১৩ রান করে ফেরেন তিনি। ফলে লাঞ্চের সময় ৪ উইকেটে ৭৪ রান নিয়ে মাঠ ছাড়ে অস্ট্রেলিয়া।
লাঞ্চের পর স্টিভেন স্মিথ ও অ্যালেক্স ক্যারি কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। বাংলাদেশের পেসারদের তুলনামূলক সাবলীলভাবে মোকাবিলা করে দ্রুত রান তুলতে থাকেন দুই অভিজ্ঞ ব্যাটার। পঞ্চম উইকেটে তাঁরা ৫৫ রানের জুটি গড়ে অস্ট্রেলিয়াকে আবারও ম্যাচে ফেরানোর চেষ্টা করেন।
তবে সেই জুটিও ভেঙে দেন এবাদত। ৩৭তম ওভারে অফ স্টাম্পের বাইরে পড়ে ভেতরে ঢুকে আসা বলে পাঞ্চ করতে গিয়ে ব্যাটের ভেতরের কানায় বল লাগিয়ে স্টাম্পে আঘাত করেন ক্যারি। ১৯ রান করে ফেরেন তিনি।
এরপর অস্ট্রেলিয়ার লোয়ার অর্ডারকে দ্রুত গুটিয়ে দিতে শুরু করে বাংলাদেশ। তাসকিন আহমেদের বলে বোল্ড হন বো ওয়েবস্টার। ১০ বলে ১২ রান করেন তিনি। এরপর প্যাট কামিন্স ও মিচেল স্টার্কও দুই অঙ্কে পৌঁছানোর আগেই ফিরে যান। ফলে ১৮৩ রানে ৮ উইকেট হারিয়ে চা বিরতিতে যায় অস্ট্রেলিয়া।
চা বিরতির পর অস্ট্রেলিয়ার শেষ প্রতিরোধও ভেঙে দেন হাসান মাহমুদ। একপ্রান্ত আগলে রাখা স্টিভেন স্মিথ ৭১ রান করে দলের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হন। হাসানের খাটো লেংথের বল এগিয়ে এসে পুল করতে গিয়ে টপ এজ করেন স্মিথ। বল আকাশে উঠে গেলে সহজ ক্যাচে পরিণত হয় সেটি। স্মিথকে ফেরানোর সঙ্গে সঙ্গে টেস্টে নিজের প্রথম পাঁচ উইকেটের কীর্তি গড়েন হাসান।
এরপর নাথান লায়নকেও ফিরিয়ে ইনিংসে নিজের ষষ্ঠ উইকেট পূর্ণ করেন বাংলাদেশের এই পেসার। শেষ পর্যন্ত ১৭ ওভার বল করে ৩ মেডেনসহ মাত্র ৫৫ রান দিয়ে ৬ উইকেট নেন হাসান মাহমুদ। এটি তাঁর টেস্ট ক্যারিয়ারের সেরা বোলিং এবং অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের কোনো পেসারের প্রথম ছয় উইকেটের কীর্তি।
বাংলাদেশের হয়ে হাসান মাহমুদ ৬ উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি তাসকিন আহমেদ ও এবাদত হোসেনও গুরুত্বপূর্ণ উইকেট শিকার করেন। তাঁদের সম্মিলিত পেস আক্রমণের সামনে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপ ৫৩ ওভারে ১৯৮ রানে গুটিয়ে যায়। এটি টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার সর্বনিম্ন দলীয় সংগ্রহ।
অস্ট্রেলিয়ার হয়ে স্মিথের ৭১ রান ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো ইনিংস দেখা যায়নি। তাঁর সঙ্গে কিছুটা প্রতিরোধ গড়েছিলেন অ্যালেক্স ক্যারি। কিন্তু বাংলাদেশের পেসাররা নিয়মিত চাপ তৈরি করে রাখায় বড় জুটি গড়তে পারেনি স্বাগতিকরা।
অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ রানে অলআউট করার পর বাংলাদেশের ব্যাটাররাও দিনের শেষ ভাগে ব্যাটিংয়ে নামে। দিনের খেলা শেষ হওয়ার সময় বাংলাদেশ ২ ওভার ব্যাট করে কোনো উইকেট না হারিয়ে ৮ রান সংগ্রহ করেছে। ফলে অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে ১৯০ রানে পিছিয়ে থেকে প্রথম দিন শেষ করেছে বাংলাদেশ।
ডারউইনের এই টেস্টটি বাংলাদেশের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ১৮ বছর পর টেস্ট খেলতে নেমেছে বাংলাদেশ। দুই ম্যাচের এই সিরিজটি ২০২৫-২৭ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ। প্রথম দিনেই দুর্দান্ত বোলিংয়ে অস্ট্রেলিয়াকে ২০০ রানের নিচে আটকে দিয়ে বাংলাদেশ যে লড়াইয়ের বার্তা দিয়েছে, সেটিই এখন দ্বিতীয় দিনে ব্যাট হাতে কতটা কাজে লাগাতে পারে, সেটাই দেখার বিষয়।