তুরস্ক ছাড়ার সময় লুকোচুরির নাটকীয়তা শেষে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে মেরিল্যান্ডের জয়েন্ট অ্যান্ড্রুস বিমানঘাঁটিতে পৌঁছায় তাঁর নতুন এয়ারফোর্স ওয়ান। ৯ জুলাই ২০২৬, মেরিল্যান্ড। ছবি: রয়টার্স
মেলবোর্ন, ১৩ আগষ্ট- মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তুরস্ক সফর ঘিরে গত ৮ জুলাই ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সফরের শেষ মুহূর্তে হঠাৎ উড়োজাহাজ পরিবর্তন, সাংবাদিকদের জানালার পর্দা নামিয়ে রাখার নির্দেশ এবং প্রেসিডেন্টের গোপনে অন্য উড়োজাহাজে ওঠার ঘটনা তখন অনেকটাই রহস্যে ঢাকা ছিল।
রয়টার্সের সাংবাদিক গ্রাম স্ল্যাটারি, যিনি ট্রাম্পের সঙ্গে ওই সফরে ছিলেন, সাম্প্রতিক এক বর্ণনায় সেই সময়ের ঘটনাগুলো তুলে ধরেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সফরের শেষ দিকে একের পর এক অস্বাভাবিক সিদ্ধান্তে সাংবাদিকদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
হঠাৎ বদলে গেল ট্রাম্পের ফেরার পরিকল্পনা
গত জুলাইয়ে তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দেন ট্রাম্প। সফরের শুরুতে তিনি কাতারের রাজপরিবারের উপহার দেওয়া নতুন উড়োজাহাজে করে তুরস্কে যান। প্রয়োজনীয় সংস্কার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা যুক্ত করার পর সেটিকেই নতুন ‘এয়ারফোর্স ওয়ান’ হিসেবে ব্যবহার করছিলেন তিনি।
কিন্তু ৮ জুলাই সম্মেলনের শেষ দিনে হঠাৎ ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প জানান, তিনি ওই উড়োজাহাজে করে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরবেন না।
ট্রাম্প জানান, উড়োজাহাজটি আগেই যুক্তরাজ্যের মিলডেনহল বিমানঘাঁটিতে পাঠানো হয়েছে, যাতে সেখানে থাকা মার্কিন সামরিক সদস্যরা সেটি দেখতে পারেন। তিনি পুরোনো একটি এয়ারফোর্স ওয়ানে করে মিলডেনহল যাবেন বলেও জানান। তবে এরপর কীভাবে ওয়াশিংটনে ফিরবেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলেননি।
স্ল্যাটারির মতে, সফরসূচির এই পরিবর্তন ছিল অস্বাভাবিক এবং ট্রাম্পের ব্যাখ্যাও সাংবাদিকদের কাছে পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। এরই মধ্যে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন, ইরান কি ট্রাম্পকে হত্যার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করেছে?
সাংবাদিকদের জানালার পর্দা নামিয়ে রাখতে বলা হয়
ট্রাম্পকে বহন করছে বলে সাংবাদিকেরা যে উড়োজাহাজটিকে মনে করছিলেন, তাতে ওঠার সময় হোয়াইট হাউসের কর্মীরা তাদের জানালার পর্দা নামিয়ে রাখতে বলেন। কারণ জানতে চাইলে সাংবাদিকদের জানানো হয়, এটি সিক্রেট সার্ভিসের নির্দেশ।

তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলন শেষে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে ট্রাম্পের উড়োজাহাজে ওঠার আগে পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানের পাশে একটি ক্যাটারিং ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে। ৮ জুলাই ২০২৬, আঙ্কারা।ছবি: রয়টার্স
স্ল্যাটারি বলেন, প্রেসিডেন্টের উড়োজাহাজে ভ্রমণের পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানতেন, এমন নির্দেশনা স্বাভাবিক নয়। তখন তিনি ভাবতে শুরু করেন, এর পেছনে কোনো গোপন নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা সামরিক প্রযুক্তি লুকানোর বিষয় রয়েছে কি না।
তখনো সাংবাদিকেরা জানতেন না, আসলে প্রেসিডেন্টকে নিয়ে একটি গোপন নিরাপত্তা অভিযান চলছে।
মিলডেনহলে গিয়ে আরও রহস্য
আঙ্কারা থেকে যুক্তরাজ্যের মিলডেনহল পর্যন্ত যাত্রা নির্বিঘ্নেই শেষ হয়। তবে সাংবাদিকদের মধ্যে অস্বস্তি থেকেই যায়। ট্রাম্প কেন তাদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলাপে আসছেন না, সেটিও তাদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়।
মিলডেনহলে পৌঁছে পরিস্থিতি আরও নাটকীয় হয়ে ওঠে।
উড়োজাহাজ থেকে নামার সময় সাংবাদিকেরা দেখতে পান, ট্রাম্প একই উড়োজাহাজের অন্য একটি অংশ থেকে বেরিয়ে আসছেন। এরপর হোয়াইট হাউসের কর্মীরা সাংবাদিকদের তাকে অনুসরণ করতে বলেন।
ট্রাম্প হেঁটে এগিয়ে যান কাতারের রাজপরিবারের দেওয়া নতুন এয়ারফোর্স ওয়ানের দিকে। সেটি কয়েক শ গজ দূরে পার্ক করা ছিল।
তার দুই পাশে ছিল সিক্রেট সার্ভিসের সদস্যরা। পাশে ধীরগতিতে চলছিল একটি কালো সরকারি এসইউভি। স্ল্যাটারির কাছে পুরো দৃশ্যটি ছিল আগে দেখা যেকোনো হোয়াইট হাউসের নিরাপত্তা ব্যবস্থার চেয়ে আলাদা এবং অনেকটা সিনেমার দৃশ্যের মতো।
আসলে কী হয়েছিল, পরে জানা যায়
নতুন উড়োজাহাজে ওঠার পর হোয়াইট হাউসের এক সহকারী সাংবাদিকদের ট্রাম্পের ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া একটি পোস্টের কপি দেন। সেখানে মিলডেনহল বিমানঘাঁটিতে কাতারের দেওয়া উড়োজাহাজের সামনে জড়ো হওয়া সামরিক সদস্য ও তাদের পরিবারের একটি ছবি ছিল।
ট্রাম্প দাবি করেন, বিমানঘাঁটির পুরো কর্মীবাহিনী উড়োজাহাজটি দেখতে চেয়েছিল। এ কারণে আঙ্কারা থেকে ওয়াশিংটনের স্বাভাবিক রুটে মিলডেনহলে যাত্রাবিরতি করতে প্রায় কোনো পরিবর্তনই করতে হয়নি বলেও জানান তিনি।
পরে ট্রাম্প সাংবাদিকদের কেবিনে এসে প্রশ্নের মুখোমুখি হন। সাংবাদিকেরা জানতে চান, যুক্তরাজ্যে যাওয়ার জন্য কাতারের দেওয়া নতুন উড়োজাহাজটি কেন ব্যবহার করা হয়নি এবং এর প্রকৃত কারণ কী।
তবে ঘটনার পুরো চিত্র আরও কয়েক সপ্তাহ পর সামনে আসে।
স্ল্যাটারির ভাষ্য অনুযায়ী, তখন জানা যায়, ট্রাম্প আসলে মিলডেনহলের পথে সাংবাদিকদের সঙ্গে একই উড়োজাহাজে ছিলেন না। পুরো ঘটনায় তৃতীয় একটি উড়োজাহাজও ব্যবহার করা হয়েছিল।
অর্থাৎ, সাংবাদিকদের অজান্তেই প্রেসিডেন্টকে নিরাপদে অন্য একটি উড়োজাহাজে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে যা বলেছিলেন ট্রাম্প
ওয়াশিংটনে ফেরার পথে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প প্রথমে এই উড়োজাহাজ পরিবর্তনের পেছনে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেন।
কিন্তু স্ল্যাটারি যখন জানতে চান, সাংবাদিকদের কেন জানালার পর্দা নামিয়ে রাখতে বলা হয়েছিল, তখন ট্রাম্প ইরানের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে থাকা হত্যার হুমকির কথা স্বীকার করেন।
সাংবাদিকদের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন,
“কিন্তু যদি আমি মারা যাই, আপনারাও যাবেন। তাই তো? হয়তো কোনো এক দিন আপনারাও পেশা বদলাতে চাইবেন।”
স্ল্যাটারির বর্ণনা অনুযায়ী, ওই মুহূর্তে সাংবাদিকেরা বুঝতে পারেন, ৮ জুলাইয়ের পুরো যাত্রাপথজুড়ে যে অস্বাভাবিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তার পেছনে প্রেসিডেন্টকে সম্ভাব্য হামলা থেকে রক্ষা করার একটি গোপন পরিকল্পনা কাজ করছিল।
ঘটনার কয়েক সপ্তাহ পর বিষয়টি পরিষ্কার হলেও, আঙ্কারা থেকে মিলডেনহল পর্যন্ত যাত্রার সময় সাংবাদিকদের কাছে পুরো ঘটনাটিই ছিল রহস্যে ঢাকা।
সূত্র-রয়টার্স