মার্কিন বিমানবাহী রণতরী।ছবিঃ বিবিসি বাংলা
মেলবোর্ন, ১৪ আগষ্ট: ইরানের কাছে মোতায়েন থাকা মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনে টানা ২৫০ দিনের বেশি সময় ধরে অবস্থান করছেন প্রায় পাঁচ হাজার মার্কিন সামরিক সদস্য। দীর্ঘ এই মোতায়েনের মধ্যে জাহাজটিতে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংকট, পানি নিষ্কাশন ও প্লাম্বিংয়ের সমস্যা এবং চরম মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তির অভিযোগ উঠেছে। পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মার্কিন আইনপ্রণেতারা প্রতিরক্ষা দপ্তরের কাছে জবাব চেয়েছেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন সমুদ্রে অবস্থানের কারণে রণতরীতে থাকা কয়েকজন নাবিকের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছে। এমনকি কয়েকজন নাবিক জাহাজ থেকে সাগরে লাফ দেওয়ার কথা বিবেচনা করেছিলেন বলেও পরিবারের সদস্যদের বরাতে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সম্প্রতি এক নাবিক সমুদ্রের পানিতে পড়ে গেলে একটি হেলিকপ্টার তাকে উদ্ধার করে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য জাহাজ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত চলছে।
কানেকটিকাটের ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেন্টাল মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে পাঠানো এক চিঠিতে রণতরীটির পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, জাহাজটিতে মৌলিক সরবরাহের ঘাটতি, পানির মান নিয়ে সমস্যা, প্লাম্বিংয়ের ত্রুটি, মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি, ডেকের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং ডাক বা মেইল সরবরাহে দীর্ঘসূত্রতার মতো সমস্যা দেখা দিয়েছে।
ব্লুমেন্টালের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় অনেক সামগ্রী জাহাজে পৌঁছানোর পথে মাসের পর মাস আটকে থাকছে। তার মতে, এসব অভিযোগ দ্রুত তদন্তের দাবি রাখে। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে বিমানবাহী রণতরীগুলোকে এমন উচ্চমাত্রার অপারেশনাল চাপের মধ্যে রাখার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন গত বছরের নভেম্বর মাসে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে দক্ষিণ চীন সাগরের উদ্দেশে যাত্রা করে। পরে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানকে সামনে রেখে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে এটিকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠানো হয়। মে মাসে জাহাজটির দেশে ফেরার কথা থাকলেও কয়েক দফা মোতায়াদের মেয়াদ বাড়ানো হয়। এখন পর্যন্ত ফেরার নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করা হয়নি।
তবে চলতি সপ্তাহে কয়েকটি মার্কিন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, পূর্বনির্ধারিত রোটেশন বা পালাবদল পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের পরিবর্তে ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
জাহাজে থাকা সামরিক সদস্যদের পরিবারের সদস্যদের বরাতে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘ সময় সমুদ্রে অবস্থান এবং বন্দরে যাওয়ার সুযোগ কম থাকায় নাবিকদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। কারও কারও কয়েক সপ্তাহ ধরে কাপড় ধোয়ার সুযোগ হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। তাজা খাবারের সরবরাহও সীমিত হয়ে পড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এক নাবিকের এক আত্মীয়ের দাবি, মোতায়াদ শুরু হওয়ার পর ওই নাবিকের প্রায় ৬৫ পাউন্ড বা ২৯ কেজি ওজন কমেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই স্বজন আরও জানান, দীর্ঘ সময় জাহাজে থাকার কারণে ওই নাবিক মানসিক ও শারীরিকভাবে প্রচণ্ড ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।
ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান মাইকেল লেভিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জাহাজটির বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। তার অভিযোগের মধ্যে রয়েছে ছত্রাকযুক্ত গোসলখানা, নষ্ট টয়লেট, সপ্তাহের পর সপ্তাহ লন্ড্রি ব্যবস্থা বন্ধ থাকা, দীর্ঘ সময় গরম পানি না থাকা এবং সাবান, ডিওডোরেন্ট ও টুথপেস্টের মতো প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ঘাটতি।
তবে মার্কিন নৌবাহিনী এসব অভিযোগের বেশ কিছু অংশের সঙ্গে ভিন্নমত জানিয়েছে। নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তা বলেছেন, জাহাজে আত্মহত্যার চিন্তা বা আত্মহত্যার চেষ্টা বেড়ে যাওয়ার কোনো তথ্য তারা পায়নি। যুদ্ধকালীন কার্যক্রমের কারণে প্রচলিত সরবরাহব্যবস্থা কিছুটা ব্যাহত হলেও মিশন-সংক্রান্ত ও অত্যন্ত জরুরি সামগ্রী সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
ওই কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে জাহাজে খাবার, বিশুদ্ধ পানি, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসামগ্রীর সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রথমে খাবার, এরপর স্বাস্থ্য সুরক্ষার সামগ্রী এবং তারপর মেইল বা চিঠি পৌঁছে দেওয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও রণতরীর নাবিকদের পাশে থাকার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনের সময় নাবিকদের কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয় এবং দেশের জন্য তারা যে দায়িত্ব পালন করছেন, তার প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে।
অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট সিনেটর রুবেন গ্যালেগো রণতরীর পরিস্থিতি সরেজমিনে তদন্তের জন্য মার্কিন প্রতিনিধিদলকে সেখানে যাওয়ার অনুমতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, পরিস্থিতি নিয়ে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে আইনপ্রণেতাদের জাহাজে প্রবেশের সুযোগ থাকা উচিত।
মার্কিন নৌবাহিনীতে দীর্ঘ সময়ের মোতায়েনের কারণে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর চাপ নতুন বিষয় নয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ৯৫৬ জন নাবিকের ওপর পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, অন্যান্য মার্কিন সামরিক শাখার তুলনায় নৌবাহিনীর জাহাজে থাকা সদস্যদের মধ্যে তীব্র মানসিক সংকটের হার বেশি। অনুপযুক্ত আবাসনব্যবস্থা, অতিরিক্ত শব্দ, দীর্ঘ সময় কাজ এবং পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের অভাবকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে মার্কিন সামরিক বাহিনীতে আত্মহত্যা এখনও মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ বলে বিভিন্ন সামরিক ও সরকারি তথ্য-উপাত্তে উঠে এসেছে। ফলে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনে দীর্ঘদিন ধরে অবস্থানরত নাবিকদের শারীরিক ও মানসিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রণতরীটির বদলি হিসেবে ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন মোতায়েনের প্রস্তুতি শুরু হওয়ায় দীর্ঘ এই মোতায়েনের অবসানের সম্ভাবনা তৈরি হলেও, কবে নাগাদ নাবিকরা দেশে ফিরতে পারবেন তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সুত্রঃ বিবিসি বাংলা