এএসআইও-র মহাপরিচালক মাইক বার্জেস বলেছেন, বন্ডাই হত্যাকাণ্ডের আগেই ইহুদি-বিদ্বেষী আচরণ স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল এবং তিনি প্রশ্ন তুলেছেন যে এ বিষয়ে সতর্কবার্তা দিতে তিনি আরও কিছু করতে পারতেন কি না। ছবি: নিউজওয়্যার / মার্টিন অলম্যান
সিডনি: বন্ডাই সন্ত্রাসী হামলার আগে অস্ট্রেলিয়ায় ক্রমবর্ধমান ইহুদিবিদ্বেষের ভয়াবহতা নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিরা যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারেননি বলে মন্তব্য করেছেন অস্ট্রেলিয়ান সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশনের (এএসআইও) মহাপরিচালক মাইক বার্জেস।
হামলার পর প্রথমবারের মতো দেওয়া এক বিস্তারিত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইহুদিবিদ্বেষ দেশের মানুষের জীবনের জন্য সবচেয়ে গুরুতর নিরাপত্তা হুমকিতে পরিণত হচ্ছে—এ বিষয়ে তিনি বারবার সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা এবং সামাজিক নেতৃত্বের বিভিন্ন পর্যায়ে সেই সতর্কতা প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পায়নি।
‘বন্ডাই টেরর’ নামের একটি বইয়ের জন্য নেওয়া সাক্ষাৎকারে বার্জেস গভীর অনুশোচনা প্রকাশ করে বলেন, অক্টোবরের ৭ তারিখের পর ইহুদিবিদ্বেষের বিস্তার এবং বন্ডাই হামলার ঘটনাপ্রবাহ ফিরে দেখলে তাঁর মনে হয়, বিপদের মাত্রা বোঝাতে তিনি আরও জোরালো ভূমিকা রাখতে পারতেন।
তিনি বলেন, “আমাদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি যে বিপজ্জনক দিকে এগোচ্ছিল, তা নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন ছিলাম এবং প্রকাশ্যেই সেই উদ্বেগ জানিয়েছিলাম। বিষয়টি নিঃসন্দেহে গভীর অনুশোচনার। আমি কি আরও কিছু করতে পারতাম? সম্ভবত আরও জোরালোভাবে সতর্ক করতে পারতাম।”
তবে জাতীয় নিরাপত্তাকে সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অন্যদেরও সেই সতর্কবার্তা গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ, বিস্তারিত জানতে চাওয়া এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব ছিল।
বার্জেসের মতে, সিডনি অপেরা হাউসের সমাবেশ ঘিরে প্রকাশ্যে উঠে আসা ইহুদিবিদ্বেষী আচরণ শুরুতেই যথাযথভাবে মোকাবিলা করা হয়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, রাজনৈতিক নেতা এবং সামাজিক নেতৃত্বের কার্যকর প্রতিক্রিয়ার অভাবে এসব আচরণ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক রূপ পায়।
তিনি বলেন, “এ ধরনের আচরণ স্বাভাবিক হয়ে ওঠায় উত্তেজনার মাত্রা বেড়েছে এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সহিংসতার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। দুঃখজনকভাবে আমরা এর পরিণতি দেখেছি—হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন থেকে শুরু করে ব্যক্তি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয়কে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করা এবং শেষ পর্যন্ত ইহুদি অস্ট্রেলীয়দের হত্যার ঘটনা পর্যন্ত।”
ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকার অধ্যায় থেকে অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন উল্লেখ করে এএসআইও প্রধান বলেন, সাধারণভাবে অধিকাংশ মানুষ ভালো এবং খুব কম মানুষই অন্যকে হত্যা করতে চায়। কিন্তু ইতিহাস দেখিয়েছে, ভালো মানুষও কখনো কখনো ভয়াবহ কর্মকাণ্ডের অংশ হয়ে যেতে পারে এবং একসময় সেটিকেই স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে পারে।
এ প্রসঙ্গে তিনি ১৯৩০-এর দশকের নাৎসি জার্মানির উদাহরণ টেনে বলেন, “জার্মানির দিকে তাকান। অনেক ভালো মানুষও সেই স্রোতে যোগ দিয়েছিল—তার পরিণতি কী হয়েছিল, আমরা জানি।”
অক্টোবরের ৭ তারিখের পর অস্ট্রেলিয়ায় বিদ্বেষপূর্ণ বিক্ষোভ, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং ইহুদি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলার ঘটনা বাড়তে থাকে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বার্জেসের সতর্কবার্তা মূলত সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার নেতৃত্বসহ সমাজের সব পর্যায়ের মানুষের উদ্দেশে ছিল।
‘বন্ডাই টেরর’ বইয়ের জন্য পরিচালিত অনুসন্ধানে প্রাপ্ত কথিত গোপন নথির বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০১৯–২০ অর্থবছরে অস্ট্রেলিয়ার গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মোট সম্পদের ২৩ শতাংশ সন্ত্রাস দমন কার্যক্রমে ব্যবহৃত হতো। ২০২৫ সালের মধ্যে তা কমে ১৬ শতাংশের নিচে নেমে আসে।
গোপনীয় সূত্রের দাবি, বন্ডাই হামলার সময় অস্ট্রেলিয়ার গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মোট তহবিলের প্রায় ১৯ শতাংশ সন্ত্রাস দমনে বরাদ্দ ছিল। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এএসআইওর মৌলিক অর্থায়ন বাড়ানো হয়নি এবং সংস্থাটি যে অতিরিক্ত অর্থ পেয়েছিল, তার কোনো অংশ সুনির্দিষ্টভাবে সন্ত্রাস দমন কার্যক্রমের জন্য নির্ধারিত ছিল না বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ওই সূত্রগুলোর মতে, ২০২৪ সালের আগস্টে জাতীয় সন্ত্রাসী হামলার হুমকির মাত্রা বাড়িয়ে ‘প্রবেবল’ বা ‘সম্ভাব্য’ ঘোষণার পর একই বছরের ডিসেম্বরে মধ্যবর্ষীয় অর্থনৈতিক ও আর্থিক পর্যালোচনায় এএসআইও, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রতিরক্ষা বিভাগ, অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশ এবং পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য দপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সন্ত্রাস দমন বাজেট বাড়ানো উচিত ছিল।
‘প্রবেবল’ সতর্কতার অর্থ ছিল, পরবর্তী ১২ মাসের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সন্ত্রাসী হামলা সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কা ৫০ শতাংশের বেশি। সূত্রগুলো মনে করে, ২০২৫ সালের মে মাসের ফেডারেল বাজেটেও এএসআইওর সন্ত্রাস দমন কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন ছিল।
তবে মাইক বার্জেস এসব অর্থায়নের পরিসংখ্যান নিয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। একই সঙ্গে এএসআইওর সন্ত্রাস দমন বাজেট কমেছে—এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সন্ত্রাসী হামলার হুমকির মাত্রা বৃদ্ধি এবং অস্ট্রেলিয়ায় ইরানের কর্মকাণ্ড নিয়ে পরিচালিত তদন্তের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংস্থাটির সংশ্লিষ্ট অর্থায়ন বেড়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সামগ্রিক সন্ত্রাস দমন অর্থায়ন কমার অভিযোগ এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন লিবারেল সিনেটর জেমস প্যাটারসনের প্রশ্নের জবাবে একটি সিনেট কমিটির শুনানিতে বার্জেস ইহুদিবিদ্বেষকে মানুষের জীবনের প্রতি হুমকির ক্ষেত্রে দেশের “এক নম্বর অগ্রাধিকার” হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
অক্টোবরের ৮ তারিখে পশ্চিম সিডনি এবং পরদিন টাউন হল থেকে অপেরা হাউসের দিকে যাওয়া সমাবেশে বিদ্বেষের বিস্তার দেখেই বার্জেস উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর কাছে তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা সেই অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; ইহুদিবিদ্বেষ অস্ট্রেলিয়ার ভেতরেও একটি গুরুতর হুমকি হিসেবে উপস্থিত হয়েছে।
বার্জেস বলেন, “আমরা এই সমস্যার প্রকৃত ব্যাপকতা বুঝতে পারিনি। আর যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা সেটি উপলব্ধি করতে না পারব, ততক্ষণ কার্যকরভাবে কিছু করাও সম্ভব হবে না।”
অক্টোবরের ৭ তারিখের পরপর ইহুদিবিদ্বেষ বাড়তে শুরু করলেও প্রাথমিকভাবে বার্জেস বিশ্বাস করতেন, সম্ভাব্য হুমকি শনাক্ত ও মোকাবিলার সক্ষমতা এএসআইওর রয়েছে। তবে পরবর্তী ১০ মাসে জাতীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ন নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। এর পরই তিনি আলবানিজ সরকারকে দেশের সন্ত্রাসী হামলার হুমকির মাত্রা আনুষ্ঠানিকভাবে বাড়িয়ে ‘প্রবেবল’ করার সুপারিশ করেন।
–নিউজওয়্যার