অস্ট্রেলিয়াকে গুঁড়িয়ে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়।ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৬ আগষ্ট:ডারউইনে অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে টেস্ট ক্রিকেটে নতুন ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ। ব্যাটে-বলে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়ে মাত্র চার দিনেই স্বাগতিকদের বিপক্ষে এই অবিস্মরণীয় জয় তুলে নিয়েছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় টেস্ট জয় এবং ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়া সফরে এসে এমন সাফল্য পেল বাংলাদেশ।
নাজমুল হোসেন শান্ত চেয়েছিলেন ডারউইনে তার দলের খেলোয়াড়েরা পাঁচ দিন ভালো ক্রিকেট খেলবেন। তার সেই প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ। মাত্র ১১তম সেশনেই ম্যাচের ফল নিজেদের পক্ষে নিয়ে এসেছে তারা। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ব্যাটিং ও বোলিংয়ে দাপট দেখিয়ে শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়াকে তাদের নিজেদের মাটিতেই উড়িয়ে দিয়েছে সফরকারীরা।
এই জয়ে দুই টেস্টের সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল বাংলাদেশ। একই সঙ্গে সিরিজ হার এড়ানোর নিশ্চয়তাও পেয়েছে তারা। টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ে নবম স্থানে থাকা বাংলাদেশের বিপক্ষে শীর্ষস্থানীয় অস্ট্রেলিয়ার এমন পরাজয় নিঃসন্দেহে বড় অঘটন। বাংলাদেশের জন্য অবশ্য এই জয় টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় অর্জন হয়ে থাকবে।
২৩ বছর আগে অস্ট্রেলিয়া সফরে ডারউইন ও কেয়ার্নসে অসহায়ভাবে হেরেছিল বাংলাদেশ। দুই দশকেরও বেশি সময় পর আবার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে নেমে শুরু থেকেই নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিতে থাকে দলটি।
১৩ আগস্ট ম্যাচের প্রথম দিনেই বাংলাদেশের পেসাররা অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপে ধস নামান। দুইশ রানের আগেই অলআউট হয়ে যায় স্বাগতিকরা। অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপকে এভাবে আটকে দেওয়ার পর অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, মিচেল স্টার্ক, প্যাট কামিন্স ও জশ হ্যাজলউডের নেতৃত্বাধীন অস্ট্রেলিয়ার বোলিং আক্রমণও বাংলাদেশের ব্যাটারদের ওপর একই রকম চাপ তৈরি করবে।
কিন্তু সেই আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে ব্যাট হাতেও দুর্দান্ত খেলেছে বাংলাদেশ। তানজিদ হাসান তামিম করেন ঐতিহাসিক সেঞ্চুরি। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ও মেহেদী হাসান মিরাজও গুরুত্বপূর্ণ অর্ধশতক তুলে নেন। তাদের ব্যাটিংয়ের সঙ্গে টেলএন্ডারদের কার্যকর অবদানে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে ৪২৬ রান সংগ্রহ করে।
অস্ট্রেলিয়ার ১৯৮ রানের জবাবে ২২৮ রানের বিশাল লিড নেয় বাংলাদেশ। বিদেশের মাটিতে প্রথম ইনিংসে এর আগে এত বড় লিড কখনো নিতে পারেনি দলটি। ফলে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমেই অস্ট্রেলিয়া বড় চাপের মধ্যে পড়ে যায়।
দ্বিতীয় ইনিংসেও বাংলাদেশের বোলারদের দাপট অব্যাহত থাকে। হাসান মাহমুদ শুরুতেই গুরুত্বপূর্ণ আঘাত করে অস্ট্রেলিয়াকে চাপে রাখেন। প্রথম ইনিংসে স্টিভ স্মিথ এবং দ্বিতীয় ইনিংসে ক্যামেরন গ্রিন কিছুটা প্রতিরোধ গড়তে সক্ষম হন।
ক্যামেরন গ্রিন নিজের দেশের মাটিতে দুর্দান্ত একটি সেঞ্চুরি করে অস্ট্রেলিয়াকে ম্যাচে ফেরানোর চেষ্টা করেন। তবে মেহেদী হাসান মিরাজের ঘূর্ণি জাদুর সামনে শেষ পর্যন্ত বড় লিড নিতে পারেনি স্বাগতিকরা। মিরাজ দ্বিতীয় ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপ গুঁড়িয়ে দেন।
দুই ইনিংস মিলিয়ে দুর্দান্ত বোলিং করা হাসান মাহমুদই হয়েছেন ম্যাচসেরা। তিনি একাই মোট ৯টি উইকেট শিকার করেন। তার সঙ্গে মেহেদী হাসান মিরাজের কার্যকর স্পিন বোলিং বাংলাদেশকে ঐতিহাসিক জয়ের দারুণ সুযোগ এনে দেয়।
অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় ইনিংসে ২৮৪ রানে অলআউট হলে বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান। সেই লক্ষ্যও খুব বেশি সময় নেয়নি বাংলাদেশ। প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি করা তানজিদ হাসান তামিম অবশ্য দ্বিতীয় ইনিংসে শূন্য রানে আউট হন।
এরপর সাদমান ইসলাম ও মুমিনুল হক মিলে দলের জয়ের বাকি কাজ সম্পন্ন করেন। ১৫তম ওভারের দ্বিতীয় বলে বেউ ওয়েবস্টারকে চার মেরে বাংলাদেশের জয় নিশ্চিত করেন মুমিনুল হক। তার আগে সাদমান ইসলামের সঙ্গে ৫৩ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি গড়ে ম্যাচ শেষ করেন তিনি।
মুমিনুল হক ৩০ রানে অপরাজিত থাকেন। সাদমান ইসলাম অপরাজিত ছিলেন ২৫ রানে। শেষ পর্যন্ত ১৫ ওভারে ১ উইকেট হারিয়ে ৫৭ রান তুলে ৯ উইকেটের ঐতিহাসিক জয় নিশ্চিত করে বাংলাদেশ।
প্রস্তুতি ম্যাচে মাত্র ৫৪ রানে বাংলাদেশকে অলআউট করার পর অস্ট্রেলিয়া যে আত্মবিশ্বাস পেয়েছিল, মূল টেস্টে তার কোনো প্রতিফলন দেখা গেল না। বরং চার দিনেই অস্ট্রেলিয়াকে তাদের নিজেদের মাটিতে হারিয়ে ইতিহাসের পাতায় নতুন অধ্যায় লিখল বাংলাদেশ।