মতামত

সম্পাদকীয়

ভারতকে এড়িয়ে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়!

২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পণ্যবাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ ভারতে প্রায় ১ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। বিপরীতে ভারত থেকে আমদানি করেছে প্রায় ৯ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য।

  • 12:23 pm - August 29, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৫৫ বার
‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বাস্তবায়ন করতে হলে ভারতকে এড়িয়ে নয়, বরং পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে একটি ভারসাম্যপূর্ণ, কার্যকর এবং জনগণকেন্দ্রিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ওটিএন বাংলা

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় এবং অপরিবর্তনীয় বাস্তবতা হলো ভূগোল। এই ভূগোল আমরা বদলাতে পারব না, আবার রাজনৈতিক আবেগ বা সাময়িক মতপার্থক্যের কারণে উপেক্ষাও করতে পারব না। বাংলাদেশ তিন দিক থেকে ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত। ফলে সীমান্ত নিরাপত্তা থেকে নদীর পানি, বিদ্যুৎ থেকে যোগাযোগ, বাণিজ্য থেকে খাদ্যপণ্য, চিকিৎসা থেকে সংস্কৃতি—প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

এ বাস্তবতা মেনে নেওয়া ভারতের প্রতি দুর্বলতা প্রকাশ নয়; বরং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ সম্পর্কে সচেতন থাকার পরিচয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই সরকারের নীতিতে স্পষ্ট ভারতবিরোধী প্রবণতা লক্ষ করা গেছে; বর্তমান সরকারকেও সেই একই পথ অনুসরণ করতে দেখা যাচ্ছে। একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য বা প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রতি পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে পরিচালিত হতে পারে না। বরং পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করতে হবে অর্থনীতি, নিরাপত্তা, ভৌগোলিক অবস্থান এবং জনগণের দৈনন্দিন প্রয়োজন বিবেচনায় রেখে।

২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পণ্যবাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ ভারতে প্রায় ১ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। বিপরীতে ভারত থেকে আমদানি করেছে প্রায় ৯ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য।

এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে বলে দেয়, দুই দেশের বাণিজ্য ভারসাম্য বাংলাদেশের অনুকূলে নয়। কিন্তু এই অসমতার সমাধান ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক শীতল করা কিংবা বাণিজ্যিক যোগাযোগ সংকুচিত করা নয় বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত ভারতে রপ্তানি বাড়ানো, অশুল্ক বাধা কমানো এবং দেশটির বিশাল বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য আরও বেশি সুবিধা আদায় করা।

অন্তর্বর্তী সরকার ও ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে ৯ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত প্রস্তাবিত চুক্তিতে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ খাতে মার্কিন বিনিয়োগের সুযোগের পাশাপাশি বাংলাদেশের ওপর বিপুল ক্রয়বাধ্যবাধকতা আরোপের কথা রয়েছে। এর আওতায় ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য, ১৪টি বোয়িং বিমান এবং ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের এলএনজি কেনার শর্ত রয়েছে। এটি মুক্ত বাণিজ্যের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর মুনাফা নিশ্চিত করার চাপিয়ে দেওয়া ব্যবস্থা বলেই বেশি মনে হচ্ছে, যা বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও আর্থিক সক্ষমতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করেছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশের জনগণ কতটা সচেতন, তা নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা বা উচ্চবাচ্য নেই; অথচ ভারতকে ঘিরে আলোচনা ও সমালোচনার যেন কোনো কমতি নেই।

এবার আবার ফিরে আসা যাক বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের প্রসঙ্গে। প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে দূরত্ব বাড়িয়ে নয়, নিয়মিত আলোচনা ও কার্যকর দর-কষাকষির মাধ্যমেই বাংলাদেশের জন্য অনুকূল বাণিজ্যিক পরিবেশ তৈরি সম্ভব। বাণিজ্য ঘাটতিকে রাজনৈতিক স্লোগানের উপাদান না বানিয়ে তা কমানোর বাস্তবসম্মত কৌশল গ্রহণ করাই হবে প্রকৃত জাতীয় স্বার্থের পরিচয়।

জ্বালানি খাতেও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ বর্তমানে বিভিন্ন ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ও আন্তসীমান্ত সঞ্চালনব্যবস্থার মাধ্যমে প্রায় ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৬৫৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করছে। এই সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে আদানি পাওয়ার, এনটিপিসি এনভিভিএন, সেম্বকর্প এবং পিটিসি ইন্ডিয়ার মতো প্রতিষ্ঠান যুক্ত রয়েছে।

২০২৫ সালে শুধু আদানি পাওয়ার বাংলাদেশে প্রায় ৮ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ তথ্য বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় ভারতের গুরুত্ব কতটা, তারই একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে।

দেশ যখন গ্যাস-সংকট, ব্যয়বহুল এলএনজি, বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপ মোকাবিলা করছে, তখন ভারতের সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতার গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। প্রতিবেশী দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নিয়ে অবশ্যই প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। চুক্তির শর্ত, বিদ্যুতের মূল্য এবং জাতীয় স্বার্থের বিষয়েও শক্ত অবস্থান নিতে হবে। তবে এসব সমস্যার সমাধান সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়; বরং স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কার্যকর দর-কষাকষির মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য ন্যায্য সুবিধা নিশ্চিত করা।

‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নিঃসন্দেহে একটি আকর্ষণীয় রাজনৈতিক ঘোষণা। কিন্তু এর প্রকৃত অর্থ যদি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়, তাহলে সেই নীতির মধ্যে ভারতের সঙ্গে বাস্তবসম্মত সম্পর্কেরও যথাযথ স্থান থাকতে হবে।

দুই দেশের সম্পর্কে মতপার্থক্য থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য কিংবা জ্বালানি নিয়ে বিরোধও থাকতে পারে। বাংলাদেশকে প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজের ন্যায্য অধিকার ও স্বার্থের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে হবে। কিন্তু দৃঢ়তা এবং বৈরিতা এক বিষয় নয়। জাতীয় স্বার্থ রক্ষার নামে অযৌক্তিক বিরোধিতা তৈরি হলে তার মূল্য শেষ পর্যন্ত দেশের জনগণকেই দিতে হয়।

পররাষ্ট্রনীতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রধান ভিত্তি হতে হবে বাস্তবতা। ভারতকে পছন্দ করা বা না করার প্রশ্ন এখানে মুখ্য নয়। মুখ্য বিষয় হলো, বাংলাদেশের অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, যোগাযোগ এবং মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কতটা নিবিড়ভাবে যুক্ত।

দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক কোনো দল, সরকার কিংবা নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল হতে পারে না। সরকার পরিবর্তিত হবে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব বদলাবে; কিন্তু দুই দেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং জনগণের পারস্পরিক প্রয়োজন বদলাবে না। ভারতের বিরোধিতা করলেই বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা হয়ে যায় না। প্রকৃত জাতীয় স্বার্থ হলো—যেখানে প্রয়োজন সেখানে সহযোগিতা করা, অন্যায় বা বৈষম্যের ক্ষেত্রে দৃঢ়ভাবে প্রতিবাদ জানানো এবং আলোচনার মাধ্যমে দেশের জন্য সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করা।

ভূগোল, অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার কঠিন বাস্তবতা বিবেচনায় ভারতকে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশের জন্য কার্যকর আঞ্চলিক নীতি তৈরি করা সম্ভব নয়। তাই ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বাস্তবায়ন করতে হলে ভারতকে এড়িয়ে নয়, বরং পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে একটি ভারসাম্যপূর্ণ, কার্যকর এবং জনগণকেন্দ্রিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

সম্পাদক: ড. প্রদীপ রায়, ওটিএন বাংলা, মেলবোর্ন

এই শাখার আরও খবর

ইউক্রেন যুদ্ধে প্রতি মাসে ৬ হাজার সেনার ঘাটতিতে রাশিয়া

ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া প্রতি মাসে যত সেনা হারাচ্ছে, নতুন নিয়োগ দিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করতে পারছে না। পশ্চিমা কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, রুশ বাহিনী মাসে গড়ে…

বিশ্বকাপ খেলা ফুটবলার এবার বাংলাদেশের ক্লাবে

২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে খেলা নাইজেরিয়ান ফরোয়ার্ড মাইকেল বাবাতুন্দে এবার বাংলাদেশের ক্লাব ফুটবলে। ৩৩ বছর বয়সী এই ফুটবলারের সঙ্গে চুক্তি করেছে ঢাকা আবাহনী লিমিটেড।…

পর্যটকের জন্য ৭০ লাখ টাকার অতিথিশালা, ১৪ বছরেও শূন্য অতিথি

অস্কারজয়ী চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের পৈতৃক ভিটায় পর্যটকদের থাকার জন্য ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে অতিথিশালা নির্মাণ করেছিল সরকার; কিন্তু নির্মাণের পর ১৪ বছর কেটে গেলেও এক…

চালুর এক বছরেই অচল নাগরিক সেবাকেন্দ্র, চারটিতে ঝুলছে তালা

‘এক ঠিকানায় সকল নাগরিক সেবা’ দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে চালু করা হয়েছিল নাগরিক সেবাকেন্দ্র। পরিকল্পনা ছিল, এসব কেন্দ্রে বসেই পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন, জিডি ও ভূমিসেবাসহ…

প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও ‘মক্কা জোট’: নভেম্বরে তুরস্ক যাচ্ছেন তারেক রহমান

প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে সহযোগিতা নিয়ে তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি চুক্তি নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য তুরস্ক সফরের সময় সই হতে পারে। চুক্তিতে ড্রোন ও গোলাবারুদ উৎপাদনে…

বাংলাদেশের মক্কা চুক্তিতে যোগদানের ইঙ্গিত, ভারতের প্রতিক্রিয়া

পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের স্বাক্ষরিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশ যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পেলে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au