নেপালের জলবিদ্যুৎ টানেলে ৯৩৩ জন আটকা, উদ্ধারে মরিয়া চেষ্টা
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর দেশটির ছয়টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেল ও ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় ৯৩৩ জন আটকা পড়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাঁদের উদ্ধারে টানেলের…
নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনায় কয়েক দিন নিখোঁজ থাকার পর নিরাপদে উদ্ধার হয়েছেন অস্ট্রেলীয় তরুণী কারা সেভেরিনো। মেয়েকে জীবিত ফিরে পাওয়াকে ‘অলৌকিক ঘটনা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন তাঁর বাবা-মা ডেবি ও ফ্র্যাঙ্ক।
তবে এ ঘটনায় এখনও নিখোঁজ রয়েছেন ৪২ জন অস্ট্রেলীয় নাগরিক। নেপাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৮১ জনে। নিখোঁজ রয়েছেন আড়াই হাজারের বেশি মানুষ।
কারা সেভেরিনোর বাবা-মা এক বিবৃতিতে তাঁকে খুঁজে বের করে নিরাপদে ফিরিয়ে আনার জন্য অস্ট্রেলিয়ার কনস্যুলার কর্মীদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন। একই সঙ্গে এই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হাজারো মানুষের জন্য প্রার্থনা করার কথা জানিয়েছেন তাঁরা।
তাঁরা বলেন, ‘আমাদের মেসেজ ব্যাংকে কারার নাম ভেসে ওঠা, তাঁর কণ্ঠ শোনা, এরপর তাঁর ছবি দেখা এবং তাঁর সঙ্গে কথা বলতে পারা ছিল সবচেয়ে অলৌকিক উপহার।’
কারাকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনা এবং তাঁর যত্ন নেওয়ার পাশাপাশি অন্য নিখোঁজদের খুঁজে বের করতে অস্ট্রেলীয় কনস্যুলার টিম যে কাজ করছে, তার জন্যও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তাঁরা।

২৮ আগস্ট আকস্মিক বন্যার পর নেপালের দেবঘাট গ্রাম ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে হাজারো মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। ছবি: রিতেশ শুক্লা/গেটি ইমেজেস
কারার নেপালি সহযাত্রীদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান তাঁর বাবা-মা। তাঁদের ভাষ্য, দুর্গম ও কঠিন পাহাড়ি এলাকায় কয়েক দিন ধরে ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে কারার সঙ্গীরা তাঁকে নিরাপদে থাকার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
তাঁরা বলেন, ‘এই বিপর্যয়ের ব্যাপ্তি অকল্পনীয়। ব্যক্তিগত আনন্দের মধ্যেও আমরা অস্ট্রেলিয়া, নেপাল এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সেই পরিবারগুলোর পাশে আছি, যারা স্বজন হারিয়েছে কিংবা এখনও প্রিয়জনের খবরের অপেক্ষায় রয়েছে। আমরা জানি, এই অপেক্ষা কতটা ভয়াবহ।’ন
নেপালের জাতীয় উদ্যানে অবস্থানকালে ভয়াবহ দুর্যোগের কবলে পড়েছিলেন কারা সেভেরিনো। কয়েক দিন তাঁর কোনো খোঁজ না পাওয়ার পর শনিবার তিনি অস্ট্রেলীয় দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন।
উদ্ধারের পর কারা বলেন, তিনি যাঁদের সঙ্গে ছিলেন, সেই ‘অসাধারণ মানুষদের’ কারণেই নিরাপদে বেরিয়ে আসতে পেরেছেন।

নেপালে প্রাণঘাতী আকস্মিক বন্যা থেকে বেঁচে ফেরার পর কারা সেভেরিনো (বাঁ থেকে তৃতীয়)। ছবি: ডিএফএটি
তবে দুর্যোগের ভয়াবহতার কথাও তুলে ধরেছেন তিনি। স্থানীয় অনেক মানুষকে স্বজন হারাতে দেখেছেন বলে জানান কারা।
তিনি বলেন, ‘আমরা থুলু সাফরুর দিকে ওঠার সময় এক ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করি। তাঁর পুরো পরিবার মারা গেছে, কারণ তাঁদের পুরো শহর ধ্বংস হয়ে গেছে। বিষয়টি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক এবং অন্যায্য।’
নিখোঁজদের পরিবারের কষ্ট তিনি বুঝতে পারছেন উল্লেখ করে কারা বলেন, ‘আমি জানি, আমার পরিবার ও বন্ধুরা এই কয়েক দিনে কী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে।’
অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক হওয়ায় এবং দেশটির সরকার ও দূতাবাসের কাছ থেকে এতটা সহায়তা পাওয়ায় নিজেকে ভাগ্যবান বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

নেপালের বন্যায় নিখোঁজের আশঙ্কা তৈরি হওয়ার পর বাবা-মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন সেভেরিনো। ছবি: ইনস্টাগ্রাম
কারা সেভেরিনো নিরাপদে আছেন, শনিবার বিকেলে এ তথ্য নিশ্চিত করেন অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওয়ং।
তিনি বলেন, ‘এমন এক বিপর্যয়ের মধ্যে, যেখানে ব্যাপক প্রাণহানি ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, এটি বিরল একটি ইতিবাচক খবর।’
অস্ট্রেলীয় কর্মকর্তারা কারাকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাচ্ছেন এবং তাঁর শারীরিক অবস্থার ওপর নজর রাখছেন বলে জানান তিনি।
সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যাট থিসলথওয়েটও কারাকে উদ্ধারের ঘটনায় স্বস্তি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ভয়াবহ এই বিপর্যয়ের মধ্যে এটি ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে হাতে গোনা কয়েকটি সুখবরের একটি’।
তবে একই সময়ে তিনি জানান, নেপালে নিখোঁজ অস্ট্রেলীয় নাগরিকের সংখ্যা বেড়ে ৪২ জনে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা আশা ছাড়িনি। নিখোঁজ অস্ট্রেলীয়দের খুঁজে বের করতে আমাদের কর্মকর্তারা দিন-রাত কাজ করছেন। আমরা আশা করছি, তাঁদের নিরাপদে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে পারব।’
নেপালে চলমান উদ্ধার অভিযানে এখন পর্যন্ত ৬ হাজার ৬৩৩ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ২৬১ জন বিদেশি নাগরিক।
থিসলথওয়েট বলেন, উদ্ধার তৎপরতার পরিসর ‘অসাধারণ’। প্রতিদিন উদ্ধার হওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়ছে বলেও জানান তিনি।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগের দিন পর্যন্ত ১২১ জন বিদেশিকে উদ্ধার করা হয়েছিল। মাত্র ২৪ ঘণ্টায় এ সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।
কাঠমান্ডুতে এখন অস্ট্রেলিয়ার ১২ সদস্যের একটি জরুরি প্রতিক্রিয়া দল কাজ করছে। এতে সংকট মোকাবিলা কর্মী, কনস্যুলার কর্মকর্তা এবং অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশের সদস্যরা রয়েছেন। এর বাইরে আগে থেকেই মাঠপর্যায়ে থাকা অস্ট্রেলীয় কর্মকর্তারাও কাজ করছেন।
অস্ট্রেলীয় সরকার জানিয়েছে, দুর্যোগের ব্যাপকতা, দুর্গম এলাকা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বন্যার পরও বিভিন্ন এলাকায় নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও সেতুর কারণে জরুরি সহায়তা পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।
নেপাল সরকার জরুরি সহায়তা হিসেবে হাইজিন কিট ও সৌরবিদ্যুৎচালিত আলোর সরঞ্জাম চেয়েছে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে অস্ট্রেলিয়া আরও ৩০ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলার মানবিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। এর মধ্যে ২০ লাখ ডলারের সরঞ্জাম ও অন্যান্য মানবিক সহায়তা অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা বাহিনীর মাধ্যমে পাঠানো হবে।
রয়্যাল অস্ট্রেলিয়ান এয়ার ফোর্স আগামী কয়েক দিনের মধ্যে কুইন্সল্যান্ড থেকে প্রথম চালানের সরঞ্জাম নেপালে নিয়ে যাবে।
এর আগে নেপালের বন্যা ও উদ্ধার কার্যক্রমে অস্ট্রেলিয়ার মোট মানবিক সহায়তার পরিমাণ ছিল ৫০ লাখ ডলার। নতুন সহায়তা মিলিয়ে মোট সহায়তা দাঁড়িয়েছে ৮০ লাখ ডলারে।
এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়ার Emergency Action Alliance-এর তহবিলে সাধারণ মানুষের অনুদান ইতোমধ্যে ১৪ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। এর সঙ্গে সরকার আরও ১০ লাখ ডলার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ফলে এ তহবিলে সরকারের মোট অবদান দাঁড়াবে ২০ লাখ ডলার।
এই অর্থ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পুনর্বাসন ও পুনরুদ্ধারে কাজ করা অস্ট্রেলীয় বেসরকারি সংস্থাগুলোর স্থানীয় অংশীদারদের সহায়তায় ব্যয় করা হবে।

এখনও নিখোঁজ রয়েছেন কয়েক ডজন অস্ট্রেলীয়। ছবি: নেপাল পুলিশ
রোববার কুইন্সল্যান্ড স্টেট লেবার পার্টির সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে নেপালের বিপর্যয় নিয়ে শোক প্রকাশ করেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ।
তিনি বলেন, ‘নেপালের এই ভয়াবহ বিপর্যয় এবং প্রাণহানিতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। এর মধ্যে অনেক অস্ট্রেলীয়ও রয়েছেন।’
নিখোঁজদের জীবিত উদ্ধারের আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের চিন্তা ও প্রার্থনা তাঁদের পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে রয়েছে। একই সঙ্গে নেপালের জনগণ এবং এই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত বিশ্বের প্রতিটি দেশের মানুষের প্রতিও আমাদের সমবেদনা রয়েছে।’

উদ্ধার ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রম শুরুর পর নিখোঁজ অস্ট্রেলীয়দের সন্ধানে সহায়তা করতে কর্মকর্তাদের পাঠিয়েছে ডিএফএটি। ছবি: ডিএফএটি
আলবানিজ বলেন, ‘তীর্থযাত্রা ও ছুটির মৌসুমে বিশ্বের এমন একটি অসাধারণ ও অনুপ্রেরণাদায়ী অঞ্চলে এত ভয়াবহ ঘটনা ঘটায় বিষয়টি আরও হৃদয়বিদারক হয়ে উঠেছে।’
তিনি জানান, উদ্ধার, কনস্যুলার সহায়তা ও মানবিক ত্রাণে অস্ট্রেলিয়া বড় ধরনের সহযোগিতা দিচ্ছে।

ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার কয়েক দিন পরও ২ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। ছবি: নিউজওয়্যার হ্যান্ডআউট/ওয়ার্ল্ড ভিশন
নেপালের বিপর্যয়ের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে হিমবাহ থেকে বরফ ধসে পড়ার বিষয়টি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবাহ বিশেষজ্ঞ পল ক্রিস্টোফারসেন বলেন, এ ধরনের ‘আইস অ্যাভালাঞ্চ’ বা বরফধসের ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। এমনকি যেসব পাহাড়ি অঞ্চল সারা বছর ঠান্ডা থাকার কথা, সেখানেও গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা বাড়ছে।
তিনি বলেন, বরফ ধসে পড়ার সময় তা প্রচণ্ড চাপের কারণে গুঁড়িয়ে গিয়ে বরফ, মাটি ও পাথরের টুকরোয় পরিণত হয়। এরপর সেগুলো উপত্যকার দিকে নেমে গিয়ে ভয়াবহ ধ্বংসাত্মক কাদার স্রোত তৈরি করতে পারে।
তাঁর মতে, হিমবাহের নিচে ভূমিধস অথবা দীর্ঘ সময় ধরে বরফের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে এমন ঘটনা ঘটতে পারে। অতিরিক্ত খাড়া পাহাড়ি এলাকায় উষ্ণ হয়ে যাওয়া বরফ তার অবস্থান ধরে রাখতে না পারলেও ধস নামতে পারে।

অধ্যাপক ক্রিস্টোফারসেন বলেন, ভবিষ্যতে পাহাড়ি ও উপত্যকা অঞ্চলের বাসিন্দাদের এ ধরনের দুর্যোগ আরও ঘন ঘন মোকাবিলা করতে হবে। ছবি: নিউজওয়্যার হ্যান্ডআউট/ওয়ার্ল্ড ভিশন
ক্রিস্টোফারসেন বলেন, নেপালই একমাত্র অঞ্চল নয় যেখানে হিমবাহ থেকে বরফধস এখন নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে।
তিনি বলেন, পাহাড়ি এলাকাগুলোতে বরফধস, পাথরধস এবং পাহাড়ের ঢাল অস্থিতিশীল হয়ে পড়া নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
ফ্রান্সের শামোনি এলাকার হিমবাহ নিয়ে তাঁর গবেষণার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, পর্যটকদের জন্য একসময় উন্মুক্ত থাকা কয়েকটি হিমবাহ এলাকা এখন অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বোঝাতে নেপালের এই ঘটনাকে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
ক্রিস্টোফারসেন বলেন, শিল্প-পূর্ব সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক তাপমাত্রা প্রায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়ার কথা শুনলে বিষয়টি অনেকের কাছে বিমূর্ত মনে হতে পারে। কিন্তু এ ধরনের বিপর্যয় সেই পরিবর্তনের বাস্তব প্রভাব কী হতে পারে, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
সূত্র-নিউজ.কম.এইউ
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au