বাংলাদেশ

চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা করার দাবি

  • 12:45 pm - September 11, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৮২ বার
চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা করার দাবি করেছে।ছবি: সংগৃহীত

দেশের বিভিন্ন চা বাগানে দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা করাসহ চার দফা দাবিতে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে আন্দোলন করছেন চা শ্রমিকরা। তাদের অন্য দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ২০২৩ সালের বার্ষিক ৫ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধির গেজেট বাতিল, চা জনগোষ্ঠীর ভূমির অধিকার নিশ্চিত করা এবং বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের (বিটিডব্লিউইউ) দ্রুত নির্বাচন আয়োজন।

চা শ্রমিকদের আন্দোলন ও মজুরি নিয়ে দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত এক মতামতধর্মী লেখায় এসব তথ্য তুলে ধরেছেন কল্লোল মোস্তফা। লেখায় বলা হয়েছে, বর্তমানে একজন চা শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ১৯৬ টাকা। ২০২৩ সালের গেজেট অনুযায়ী ৫ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধির পর ১৮৭ টাকা থেকে তা ১৯৬ টাকায় উন্নীত হয়। অর্থাৎ শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি বেড়েছে মাত্র ৯ টাকা।

শ্রমিকদের দাবি, পাঁচ সদস্যের একটি পরিবারের শুধু খাবারের জন্য প্রতিদিন প্রায় ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা প্রয়োজন হয়। এর বাইরে সন্তানদের শিক্ষা, চিকিৎসা, পোশাক ও বাসস্থানের খরচ রয়েছে। ফলে দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরির দাবি কোনো বিলাসিতা নয়, বরং পরিবারের ন্যূনতম খাবারের চাহিদা পূরণের প্রয়োজনীয় অর্থ।

এর আগে চা শ্রমিকদের মজুরি সাধারণত দুই বছর পরপর সমষ্টিগত দর-কষাকষির মাধ্যমে নির্ধারণ করা হতো। ২০২২ সালের আন্দোলনের পর দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৭০ টাকা করা হয়েছিল। তবে ২০২৩ সালের গেজেটের মাধ্যমে সমষ্টিগত দর-কষাকষির পরিবর্তে বছরে ৫ শতাংশ করে মজুরি বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা হয়। এতে প্রতিবছর মজুরি বাড়ছে মাত্র ৮ থেকে ৯ টাকার মতো। এ কারণেই শ্রমিকরা গেজেট বাতিলের পাশাপাশি দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরির দাবি জানাচ্ছেন।

চা শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের বর্তমান মেয়াদ গত মাসে শেষ হয়েছে। এর আগে জুলাই মাসে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছিলেন, শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে আগস্টে মজুরি কাঠামো পর্যালোচনা ও সংশোধন করা হবে।

চা শ্রমিকদের অন্যতম দাবি বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচনও। সর্বশেষ ২০১৮ সালে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়ায় ইউনিয়নের নেতৃত্ব নিয়েও শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। এর মধ্যে ৫০০ টাকা দৈনিক মজুরির আন্দোলনের নেত্রী গীতা রানি কানুকে একটি মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনায় আন্দোলন দুর্বল করতে ইউনিয়নের কিছু নেতা, চা বাগান মালিক ও সরকারের মধ্যে সমন্বয়ের অভিযোগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অন্যদিকে চা বাগান মালিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, দৈনিক মজুরির পাশাপাশি শ্রমিকরা বিভিন্ন ধরনের সুবিধা পেয়ে থাকেন। এর মধ্যে রয়েছে রেশন, আবাসন, চিকিৎসা, পেনশন, শ্রমিকদের সন্তানদের শিক্ষা, পানি সরবরাহ, মশা নিয়ন্ত্রণ, স্যানিটেশন, তোয়ালে, শ্রমিক বসতির আশপাশে উৎপাদিত ফলমূল ও শাকসবজির সুবিধা, অতিরিক্ত পাতা তোলার বোনাস এবং প্রভিডেন্ট ফান্ডে মালিকদের দেওয়া অর্থ।

তবে লেখাটিতে বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ২(৪৫) ধারার উল্লেখ করে বলা হয়েছে, রেশন ছাড়া এসব সুবিধার অধিকাংশই শ্রমিকের মজুরির অংশ হিসেবে গণ্য করা যায় না। আবাসন, পানি, চিকিৎসা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা এবং মালিকের পক্ষ থেকে অবসর বা প্রভিডেন্ট ফান্ডে দেওয়া অর্থ মজুরির সংজ্ঞার বাইরে রাখা হয়েছে।

চা বাগানের শ্রমিকদের আবাসন দেওয়ার বিষয়টিও শ্রম আইনের বাধ্যবাধকতার মধ্যে পড়ে। শ্রম আইনের ৯৬ ধারায় চা বাগানের মালিকদের আবাসিক শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে। ফলে এ ধরনের সুবিধাকে শ্রমিকের মজুরির অংশ হিসেবে দেখানোর যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

চা শ্রমিকদের ভূমির অধিকার নিয়েও দীর্ঘদিনের সমস্যা রয়েছে। লেখাটিতে বলা হয়েছে, অনেক চা শ্রমিক পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই জায়গায় বসবাস করলেও তাদের আনুষ্ঠানিক ভূমির অধিকার নেই। ঐতিহাসিক জরিপে এসব বসতি খাস জমি হিসেবে নথিভুক্ত হওয়ায় শ্রমিকদের নিজস্ব বসতভিটার মালিকানা তৈরি হয়নি।

এ কারণে চা বাগানের কম মজুরির কাজ ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়াও অনেক পরিবারের জন্য কঠিন। কাজ ছেড়ে দিলে পূর্বপুরুষের বসতবাড়ি হারানোর আশঙ্কা থাকে। ফলে অনেক পরিবারকে নিজেদের বসতভিটা ধরে রাখার জন্য অন্তত একজন সদস্যকে চা বাগানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে হয়।

চা শ্রমিকদের জীবনযাত্রার নিম্নমানের বিষয়টিও লেখাটিতে তুলে ধরা হয়েছে। রেশন, আবাসন ও সীমিত চিকিৎসাসেবা যুক্ত করেও তাদের মোট আয় দেশের অন্যান্য খাতের ন্যূনতম মজুরির তুলনায় কম বলে দাবি করা হয়েছে। নিরাপদ পানি ও পর্যাপ্ত স্যানিটেশনের অভাবে চা শ্রমিকদের মধ্যে যক্ষ্মা, কুষ্ঠ, ম্যালেরিয়া ও জরায়ুমুখের ক্যানসারের মতো রোগের ঝুঁকি বেশি বলেও বিভিন্ন গবেষণার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

শ্রমিক পরিবারের শিশুদের অপুষ্টির চিত্রও উদ্বেগজনক। লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, চা শ্রমিক পরিবারের শিশুদের মধ্যে ৪৫ শতাংশ খর্বকায়, ২৭ শতাংশ অতিরিক্ত ক্ষীণ এবং ৪৭ দশমিক ৫ শতাংশ কম ওজনের।

চা বাগানে শ্রমিকদের কাজও অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। প্রতিদিনের কাজের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পাতা তোলা শ্রমিকদের ২৩ কেজি পাতা সংগ্রহ করতে হয়। গাছ ছাঁটাইয়ের শ্রমিকদের কমপক্ষে ২৫০টি গাছ পরিষ্কার করতে হয়। আর কীটনাশক প্রয়োগকারীদের এক একর জমিতে কাজ করতে হয়। প্রচণ্ড রোদ, ভারী বৃষ্টি, ঘন ঝোপের আঁচড় এবং সাপ-বিছার কামড়ের ঝুঁকি নিয়েই অনেক শ্রমিককে কাজ করতে হয়।

বাংলাদেশের চা শ্রমিকদের মজুরির সঙ্গে অন্যান্য দেশের তুলনাও তুলে ধরা হয়েছে লেখায়। শ্রীলঙ্কার চা বাগানের শ্রমিকরা দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৭৫০ রুপি বা প্রায় ৬৫০ টাকা এবং ভারতের কেরালায় শ্রমিকরা প্রায় ৫৪৬ রুপি বা প্রায় ৭১০ টাকা মজুরি পান বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশে চা শ্রমিকদের মজুরি এত কম থাকার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

লেখাটিতে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা, আয়বৈষম্য কমাতে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ এবং চা জনগোষ্ঠীর ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিএনপির প্রার্থীরাও নির্বাচনের আগে চা শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোসহ বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির চা শ্রমিকদের জন্য বিএনপি অন্য যেকোনো দলের তুলনায় বেশি সহযোগিতা করবে বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন। শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরও ন্যায্য মজুরি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।

লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে, নির্বাচনে চা শ্রমিকদের বড় একটি অংশ বিএনপির প্রার্থীদের ভোট দিয়েছেন এবং কয়েকটি আসনে তাদের ভোট নির্বাচনী ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

এ অবস্থায় চা শ্রমিকদের চার দফা দাবি দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরি নির্ধারণ, ২০২৩ সালের গেজেট বাতিল, ভূমির অধিকার নিশ্চিত করা এবং বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন আয়োজন। পাশাপাশি আন্দোলনের নেত্রী গীতা রানি কানুর মুক্তির দাবিও জানানো হয়েছে।

লেখাটিতে বলা হয়েছে, দেশের কোটি মানুষের প্রতিদিনের চায়ের পেছনে যারা কঠোর পরিশ্রম করছেন, তাদের জীবন যেন দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে ন্যায্য মজুরি ও শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠা জরুরি।

এই শাখার আরও খবর

​সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী: পঁচাত্তর-পরবর্তী দুঃসময়ে আওয়ামী লীগের হাল ধরা এক সাহসী নেত্রী

​বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু মানুষ থাকেন, যাঁদের মূল্যায়ন শুধু তাঁদের কোনো একটি পদ বা দায়িত্ব দিয়ে করা যায় না। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথপরিক্রমায় তাঁদের ভূমিকা ছড়িয়ে…

ব্রিকস সম্মেলনে না গিয়ে বড় কূটনৈতিক সুযোগ হারাল বাংলাদেশ?

ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশ না নেওয়াকে ‘হারানো সুযোগ’ হিসেবে দেখছেন ভারতের বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশনের সহযোগী ফেলো প্রবেশ কুমার গুপ্ত। তার মতে,…

ইরান সরকার পতনের দ্বারপ্রান্তে, দাবি নেতানিয়াহুর

ইরানের বর্তমান ইসলামি প্রজাতন্ত্রী সরকার পতনের একেবারে দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে বলে দাবি করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তার দাবি, ইরানে ইসরায়েলের চলমান অভিযানের বেশ কয়েকটি…

রাম বিগ্রহ নির্মাণের উদ্যোক্তা হরিদাস দুই দিনের রিমান্ডে

গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে রাম বিগ্রহ নির্মাণের উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিত হরিদাস চন্দ্র তরণী দাসকে ফ্ল্যাট প্রতারণার একটি মামলায় দুই দিনের রিমান্ডে নিয়েছে আদালত। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ঢাকার…

চট্টগ্রামে অনলাইন স্ক্যামিংয়ের সন্দেহে চীন-পাকিস্তানিসহ ৬২ বিদেশি আটক

চট্টগ্রাম নগরের খুলশী এলাকায় অনলাইন স্ক্যামিং চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে চীন, পাকিস্তান ও লাওসসহ বিভিন্ন দেশের ৬২ জন বিদেশি নাগরিককে আটক করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার…

অস্ট্রেলিয়ায় স্টুডেন্ট ভিসায় বিদেশিদের কাজের সময় নির্ধারণ

অস্ট্রেলিয়ায় স্টুডেন্ট ভিসায় থাকা বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাজের সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে দেশটির সরকার। অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্র দপ্তরের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সাবক্লাস ৫০০ শিক্ষার্থী ভিসাধারীরা তাদের কোর্স…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au