তোফাজ্জল হত্যার দুই বছর আজ, দুই বছরেও শুরু হয়নি বিচার। ছবিঃ সংগৃহীত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ফজলুল হক মুসলিম হলে মানসিক ভারসাম্যহীন যুবক তোফাজ্জল হোসেনকে চোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যার দুই বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ। ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে সংঘটিত আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অধিকতর তদন্ত শেষে ২৮ জনের বিরুদ্ধে সম্পূরক অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২৮ আসামির মধ্যে নয়জন জামিনে রয়েছেন, দুজন কারাগারে এবং ১৭ জন পলাতক। পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করেছেন আদালত। এ অবস্থায় দ্রুত বিচার শেষ করে প্রকৃত দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করার প্রত্যাশা জানিয়েছেন মামলার বাদী।
মামলার বাদী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট অফিসের সুপারভাইজার মোহাম্মদ আমানুল্লাহ বলেন, এমন নির্মম হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার চান তারা। তোফাজ্জল হত্যার ন্যায়বিচার নিশ্চিত হলে তা বিচার ব্যবস্থায় একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলেও তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, তোফাজ্জলের আপনজন বলতে কেউ ছিলেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশে তিনি মামলায় বাদী হয়েছেন। প্রতিটি হাজিরার দিন আদালতে গিয়ে মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া হয়। দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রকৃত আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান তারা। একই সঙ্গে কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন মামলায় সাজা না পান, সেটিও তাদের প্রত্যাশা।
মামলার নথিপত্র সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাত পৌনে ৮টার দিকে ফজলুল হক মুসলিম হলে তোফাজ্জল হোসেনকে চোর সন্দেহে মারধর শুরু করেন একদল শিক্ষার্থী। পরে তাকে হলের ভেতরে নিয়ে দফায় দফায় মারধর করা হয়। একপর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। রাত ১০টা ৫২ মিনিটে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর শাহবাগ থানায় হত্যা মামলা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট অফিসের সুপারভাইজার মোহাম্মদ আমানুল্লাহ।
মামলাটি তদন্ত করে শাহবাগ থানার পরিদর্শক মো. আসাদুজ্জামান ২০২৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ওই অভিযোগপত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১ শিক্ষার্থীকে আসামি করা হয়।
তবে পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রে তদন্ত সুষ্ঠু হয়নি উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নারাজি আবেদন করা হয়। পরে ২০২৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার তৎকালীন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাইফুজ্জামান মামলাটি পুনরায় তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) নির্দেশ দেন।
পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হান্নানুল ইসলামের নেতৃত্বে অধিকতর তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর আদালতে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। এতে আগের ২১ আসামির সঙ্গে আরও সাতজনকে যুক্ত করে মোট ২৮ জনকে আসামি করা হয়।
ঘটনার রাতে যা হয়েছিল
পিবিআইয়ের দেওয়া সম্পূরক অভিযোগপত্রে ঘটনার সময়ের বিভিন্ন বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, ঘটনার দিন সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিট ১০ সেকেন্ডে তোফাজ্জল হলের মূল গেট দিয়ে প্রবেশ করেন। এর তিন মিনিট ১৮ সেকেন্ড পর তিনি হলের মাঠে যান।
হলের মাঠে খেলা পরিচালনা মঞ্চের পাশে বসার ৫৭ সেকেন্ড পর কয়েকজন শিক্ষার্থী তাকে চোর সন্দেহে মারধর শুরু করেন। পরে তাকে হলের মূল ভবনের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, প্রায় ২৫ মিনিট ধরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ ও মারধর করা হয়। একপর্যায়ে একদল শিক্ষার্থী বুঝতে পারেন, যে মুঠোফোন চুরির অভিযোগে তোফাজ্জলকে আটক করা হয়েছে, তার সঙ্গে ওই চুরির কোনো সম্পর্ক নেই।
এরপর তাকে হলের ক্যান্টিনে খাবার খেতে দেওয়া হয়। খাবার শেষ করার পর আবারও তাকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ সময় কয়েকজন শিক্ষক ঘটনাস্থলে এসে শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে তোফাজ্জলকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তবে প্রথমে তারা তাকে সেখান থেকে নিতে পারেননি। পরে রাত ১০টা ৫২ মিনিটে তোফাজ্জলকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
২৮ আসামির মধ্যে ১৭ জন পলাতক
সম্পূরক অভিযোগপত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলের সাবেক শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের আসামি করা হয়েছে।
আসামিরা হলেন মো. জালাল মিয়া, আহসান উল্লাহ ওরফে বিপুল শেখ, আল হোসাইন সাজ্জাদ, মো. মোত্তাকিন সাকিন শাহ, সুমন মিয়া, ওয়াজিবুল আলম, ফিরোজ কবির, আব্দুস সামাদ, সাকিব রায়হান, ইয়াছিন আলী, ইয়ামুজ্জামান ওরফে ইয়াম, ফজলে রাব্বি, শাহরিয়ার কবির শোভন, মেহেদী হাসান ইমরান, রাতুল হাসান, সুলতান মিয়া, নাসির উদ্দিন, মোবাশ্বের বিল্লাহ, শিশির আহমেদ, মহসিন উদ্দিন ওরফে শাফি, আব্দুল্লাহিল কাফী, শেখ রমজান আলী রকি, রাশেদ কামাল অনিক, মনিরুজ্জামান সোহাগ, আবু রায়হান, রেদোয়ানুর রহমান পারভেজ, রাব্বিকুল রিয়াদ ও আশরাফ আলী মুন্সী।
তাদের মধ্যে রেদোয়ানুর রহমান, রাশেদ কামাল, আবু রায়হান, মনিরুজ্জামান, আহসান উল্লাহ, সাজ্জাদ, মোত্তাকিন সাকিন, ওয়াজিবুল ও রমজান আলী জামিনে রয়েছেন। জালাল মিয়া ও সুমন মিয়া কারাগারে রয়েছেন। বাকি ১৭ আসামি পলাতক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
আদালত সংশ্লিষ্ট প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক শাহ আলম জানান, মামলায় পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য রয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর আদালত পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন।
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, মামলাটি জজকোর্টে বদলি হয়ে এলে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার কার্যক্রম শুরু হবে। ভুক্তভোগী তোফাজ্জল হোসেন যাতে ন্যায়বিচার পান, তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রপক্ষ কাজ করবে।
দুই বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার বিচার এখনো অভিযোগ গঠনের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার, অভিযোগ গঠন এবং পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রমের দিকে এখন নজর রয়েছে মামলার বাদী ও সংশ্লিষ্টদের। দ্রুত বিচার এবং প্রকৃত দোষীদের শাস্তির মধ্য দিয়ে তোফাজ্জল হত্যাকাণ্ডের বিচার শেষ হবে, এমন প্রত্যাশাই করছেন তারা।