বাংলাদেশ

১০১ দ্বিপক্ষীয় চুক্তি পর্যালোচনা করছে বাংলাদেশ, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি ভারতের

  • 6:33 am - September 19, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৩০ বার
বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনীতিতে ভারতের সামনে নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ।ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলাদেশের সঙ্গে আগের সরকারের সময়ে করা ১০১টি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনার খবরের মধ্যে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় ‘সব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ’ নেওয়ার কথা জানিয়েছে ভারত।

শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এসব চুক্তি পর্যালোচনার বিষয়ে ভারতকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। তবে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো ভারত দেখেছে।

তিনি বলেন, ‘আমরাও এ বিষয়ে কিছু গণমাধ্যম প্রতিবেদন দেখেছি। তবে এ বিষয়ে আমাদের আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। অবশ্যই ভারত নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় সব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।’

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আগের সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে করা চুক্তি ও সমঝোতাগুলো জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত এসব চুক্তি একযোগে বাতিল করার কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্ট চুক্তি ও প্রকল্প আলাদাভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের বিষয়ও পর্যালোচনায়

পর্যালোচনার আওতায় থাকা ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে পণ্য পরিবহনের জন্য বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের বিষয়টি রয়েছে।

আগের সরকারের সময়ে করা বিভিন্ন ব্যবস্থার আওতায় ভারতীয় পণ্য বাংলাদেশের ভূখণ্ড ও বন্দর ব্যবহার করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পরিবহনের সুযোগ পায়। বর্তমানে এসব ব্যবস্থার বিভিন্ন শর্ত, বিশেষ করে ট্রানজিট ফি ও রুট ব্যবহারের বিষয় পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এসব ব্যবস্থা দেশের স্বার্থের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানানো হয়েছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চুক্তিতেও নজর

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র বিদ্যুৎ ও জ্বালানি। বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করে। এর মধ্যে ভারতের আদানি পাওয়ারের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহও রয়েছে।

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং বিদ্যুৎ আমদানির অর্থ পরিশোধ নিয়ে তৈরি হওয়া বিভিন্ন সমস্যার প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির কিছু বিষয় পুনর্বিবেচনা বা পুনর্গঠনের আলোচনা রয়েছে বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

তবে এসব চুক্তি সরাসরি বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়েছে এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বরং সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাগুলো কীভাবে পুনর্গঠন বা সংশোধন করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা ও পর্যালোচনার বিষয়টি সামনে এসেছে।

ভারতের দেওয়া ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ

বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে ভারত গত কয়েক বছরে বিভিন্ন ‘লাইন অব ক্রেডিট’-এর মাধ্যমে ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বা ঋণ সহায়তা দিয়েছে।

এসব অর্থের আওতায় রেল, সড়ক ও বন্দরসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এসব প্রকল্পের কিছু অংশের বাস্তবায়ন, শর্ত ও অর্থায়নের বিষয়ও পর্যালোচনার আওতায় রয়েছে বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।

এর মধ্যে আশুগঞ্জ-আখাউড়া সড়ক সম্প্রসারণসহ ভারতীয় অর্থায়নে নেওয়া কিছু প্রকল্পের কার্যকারিতা ও বাস্তবায়নসংক্রান্ত বিষয় পরীক্ষা করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সীমান্ত নিরাপত্তা সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ

দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি ক্ষেত্র সীমান্ত নিরাপত্তা। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ভারত দীর্ঘদিন ধরে বলে এসেছে যে বাংলাদেশ তার ভূখণ্ডে ভারতবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা ঠেকাতে সহযোগিতা করেছে।

বর্তমানে সরকার পরিবর্তনের পর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, চোরাচালান, অবৈধ চলাচল এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয়গুলোও ভারত পর্যবেক্ষণ করছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

তবে ১০১টি চুক্তি পর্যালোচনার সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা সহযোগিতা বাতিলের কোনো সিদ্ধান্তের কথা বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি।

ঢাকার পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত

চুক্তিগুলো পর্যালোচনার বিষয়টি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয়ে নতুন করে আলোচনা চলছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার পররাষ্ট্রনীতিতে ভারতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার পরিবর্তে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, আসিয়ানসহ অন্যান্য আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

তবে এটি বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত কোনো ‘ভারতবিরোধী’ নীতি নয়। বরং পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে সম্পর্কের ভারসাম্য ও জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার আলোচনা হিসেবে বিষয়টি উপস্থাপিত হয়েছে।

১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে

এদিকে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে পানি বণ্টন নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছে। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির ৩০ বছরের মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা।

শুক্রবারের ব্রিফিংয়ে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে রণধীর জয়সওয়াল বলেন, দুই দেশের মধ্যে পানি সংক্রান্ত বিষয় আলোচনার জন্য বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে।

তিনি জানান, গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির আওতায় থাকা বিষয়গুলো নিয়ে যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে আলোচনা চলছে এবং পানি সংক্রান্ত কারিগরি পর্যায়ের বৈঠকও অব্যাহত রয়েছে।

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ৫৪টি অভিন্ন নদী

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। এসব নদীর পানি সংক্রান্ত বিষয় যৌথ নদী কমিশন এবং দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান কাঠামোবদ্ধ আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হয়।

এর মধ্যে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা। অন্যদিকে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত রয়েছে।

তিস্তা চুক্তি এখনো অমীমাংসিত

২০১১ সালে তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে একটি চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার পানির একটি অংশ ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতার কারণে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়নি বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তিস্তা ও অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানি সংক্রান্ত বিষয় দুই দেশের যৌথ নদী কমিশন এবং বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় কাঠামোর মধ্যেই আলোচনা করা হবে।

আনুষ্ঠানিক বার্তা পায়নি দিল্লি

১০১টি চুক্তি পর্যালোচনার বিষয়ে ভারতের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, দিল্লি এখনো ঢাকার কাছ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বার্তা পায়নি।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়টি এখন পর্যন্ত গণমাধ্যমের প্রতিবেদন ও বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আলোচনায় এসেছে। তাই এসব চুক্তির কোনটি সংশোধন, পুনর্বিবেচনা, পুনর্গঠন কিংবা বাতিল করা হবে, সে বিষয়ে বাংলাদেশের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো প্রকাশিত হয়নি।

তবে ভারত স্পষ্ট করে জানিয়েছে, বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত যাই হোক না কেন, নিজেদের জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

চুক্তিগুলো পর্যালোচনার ফলাফল প্রকাশের পরই দুই দেশের বাণিজ্য, ট্রানজিট, জ্বালানি, অবকাঠামো, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও পানি বণ্টনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর বাস্তব প্রভাব কতটা পড়বে, তা আরও স্পষ্ট হবে।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া

এই শাখার আরও খবর

ঢাকায় দিনভর ককটেল বিস্ফোরণ, রাতে থানার সামনে বাসে আগুন

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় শুক্রবার দিনভর একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। দুপুরে মালিবাগ থেকে শুরু করে সন্ধ্যায় মহাখালী, আগারগাঁও ও যাত্রাবাড়ী এবং রাতে বাবুবাজার,…

ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ।

যাত্রাবাড়ীতে পুলিশ বক্সের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ

রাজধানীর যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা পুলিশ বক্সের সামনে ককটেল বিস্ফোরণে ইবাদুর রহমান (২৬) নামে এক অটোরিকশাচালক আহত হয়েছেন। শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) রাত ৮টার দিকে যাত্রাবাড়ী থানাধীন চৌরাস্তা…

১০ বছরের শিশুকে ধর্ষণ-হত্যার অভিযোগ, আসামির বাড়ি গুঁড়িয়ে দিল বিক্ষুব্ধ জনতা

পাবনা সদর উপজেলার দোগাছী ইউনিয়নের কুলোনিয়া গ্রামে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী কামরুন্নাহার কলি (১০) ধর্ষণ ও হত্যা মামলার আসামি মোস্তফা প্রামাণিকের বহুতল বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর…

পাকিস্তানে বোমা হামলায় নিহত ২১ জনের ১৫ জনই পুলিশ

পাকিস্তানে বোমা হামলায় নিহত ২১ জনের ১৫ জনই পুলিশ

পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের কোহাটে পুলিশ লাইনস কমপ্লেক্সে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২১ জনে দাঁড়িয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১৫ জন পুলিশ সদস্য রয়েছেন।…

সাঁতার জানা দীপাঞ্জনের সুইমিংপুলে মৃত্যু ঘিরে রহস্য

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী দীপাঞ্জন ঘোষ প্রিয়মের (২১) সুইমিংপুলে ডুবে মৃত্যুর ঘটনায় নানা প্রশ্ন উঠেছে। সহপাঠীদের দাবি, দীপাঞ্জন সাঁতার জানতেন।…

তেজগাঁও কলেজের মসজিদে গোপন বৈঠক, জঙ্গি সন্দেহে গ্রেপ্তার ২৩

ঢাকার তেজগাঁও কলেজের মসজিদে গোপন বৈঠক করার সময় জঙ্গি সন্দেহে ২৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেল সোয়া ৪টার দিকে বৈঠক চলাকালে তাদের…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au