বাংলাদেশের ‘মক্কা চুক্তির’ নেপথ্যে জটিল ভূরাজনৈতিক হিসাব
ইতিহাস কখনো হুবহু পুনরাবৃত্তি হয়ে ফিরে আসে না; কখনো তা ফিরে আসে গভীর বিদ্রূপের রূপ নিয়ে। প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ভারতের…
কারণ সব জমিদার হিন্দু ছিলেন না এবং সব মুসলমান দরিদ্র প্রজা ছিলেন না। মুসলমান জমিদার, নবাব, তালুকদার ও মহাজনেরাও কৃষককে শোষণ করেছেন। আবার নিম্নবর্ণের হিন্দু, বিশেষ করে নমশূদ্র, দলিত, ভাগচাষি ও ভূমিহীন কৃষকেরাও একই জমিদারি ব্যবস্থায় নিপীড়িত হয়েছেন। একজন দরিদ্র হিন্দু কৃষক ও একজন দরিদ্র মুসলমান কৃষকের অর্থনৈতিক স্বার্থ অনেক ক্ষেত্রে পরস্পরের কাছাকাছি ছিল; যেমন একজন হিন্দু ও একজন মুসলমান জমিদারের শ্রেনীস্বার্থও পরস্পরের কাছাকাছি হতে পারত।
অতএব প্রকৃত বিভাজনটি সব সময় হিন্দু বনাম মুসলমান ছিল না। বহু ক্ষেত্রে সেটি ছিল জমিদার বনাম প্রজা, মহাজন বনাম ঋণগ্রস্ত কৃষক এবং ক্ষমতাবান অভিজাত বনাম বঞ্চিত সাধারণ মানুষ। কিন্তু এই শ্রেনীগত বিরোধকে ধর্মের ভাষায় প্রকাশ করা হলে শোষকের শ্রেনী পরিচয় আড়ালে চলে যায় এবং তার ধর্মীয় পরিচয় সামনে আসে।
এখানেই কার্ল মার্ক্সের ধারণা থেকে আসা “ভ্রান্ত চেতনা” বা false consciousness প্রাসঙ্গিক। ভ্রান্ত চেতনা বলতে সাধারণভাবে এমন অবস্থাকে বোঝায়, যখন শোষিত মানুষ নিজের বঞ্চনার প্রকৃত কাঠামোগত কারণ শনাক্ত করতে পারে না এবং এমন একটি ব্যাখ্যা গ্রহণ করে, যা শেষ পর্যন্ত শাসক বা অভিজাত শ্রেনী র স্বার্থ রক্ষা করে।
পূর্ববাংলার দরিদ্র মুসলমান কৃষকের বাস্তব সমস্যা ছিল জমির মালিকানা, অতিরিক্ত খাজনা, ঋণ, শিক্ষা থেকে বঞ্চনা এবং প্রশাসনিক ক্ষমতায় প্রবেশের অভাব। কিন্তু তাকে যদি বোঝানো হয় যে তার সব সমস্যার কারণ “হিন্দু জাতি” এবং পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলেই তার মুক্তি ঘটবে, তাহলে শ্রেনী শোষণের প্রশ্নটি ধর্মীয় পরিচয়ের প্রশ্নে রূপান্তরিত হয়। একইভাবে দরিদ্র হিন্দু কৃষককে মুসলমান কৃষকের বিরুদ্ধে দাঁড় করালে দুজনের অভিন্ন অর্থনৈতিক স্বার্থ আড়ালে চলে যায়।
এর অর্থ এই নয় যে ধর্মীয় বৈষম্য, সাম্প্রদায়িক ভীতি কিংবা মুসলমানদের প্রতিনিধিত্বের সমস্যা কাল্পনিক ছিল। সেগুলো বাস্তব ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক অভিজাতেরা সেই বাস্তব ক্ষোভকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন, যাতে জমিদারি ও শ্রেনী কাঠামোর পরিবর্তে অন্য ধর্মের সাধারণ মানুষ প্রতিপক্ষ হিসেবে চিহ্নিত হয়। শ্রেনী গত বঞ্চনার এ ধরনের ধর্মীয় পুনর্ব্যাখ্যাকেই বলা যায় “শ্রেনী সংগ্রামের সাম্প্রদায়িকীকরণ।”
এই প্রক্রিয়ায় মুসলিম লীগের নেতৃত্বের শ্রেনী চরিত্রও গুরুত্বপূর্ণ। দলটির শীর্ষ নেতৃত্বে ছিলেন আইনজীবী, নবাব, জমিদার, ব্যবসায়ী এবং ঔপনিবেশিক ব্যবস্থায় সুবিধাপ্রাপ্ত শিক্ষিত অভিজাতেরা। জিন্নাহ নিজেও দরিদ্র কৃষক বা শ্রমিক শ্রেনী থেকে উঠে আসা নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন সফল ব্যারিস্টার এবং বোম্বের উচ্চবিত্ত রাজনৈতিক সমাজের সদস্য। বাংলায় মুসলিম লীগের গণভিত্তি তৈরি হয়েছিল দরিদ্র মুসলমান কৃষকের ভোট ও আকাঙ্ক্ষার ওপর, কিন্তু নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ প্রধানত অভিজাতদের হাতে ছিল।
এই ব্যবধানটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সাধারণ কৃষক পাকিস্তানকে কল্পনা করেছিলেন জমিদারী নিপীড়ন, ঋণ, সামাজিক অপমান ও অর্থনৈতিক বঞ্চনা থেকে মুক্তির সম্ভাবনা হিসেবে। কিন্তু মুসলিম লীগের অভিজাত নেতৃত্বের প্রধান লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রক্ষমতায় মুসলমান অভিজাতদের অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা। একই “পাকিস্তান” শব্দের মধ্যে তাই দরিদ্র কৃষক ও অভিজাত নেতার প্রত্যাশা এক ছিল না।
ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক সুবিধা এখানেই। শ্রেনী র ভাষায় রাজনীতি হলে দরিদ্র মুসলমান কৃষককে মুসলমান জমিদারের বিরুদ্ধেও দাঁড়াতে হতো। দরিদ্র হিন্দু ও মুসলমান কৃষকের মধ্যে ঐক্য তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও থাকত। কিন্তু ধর্মের ভাষায় রাজনীতি করলে মুসলমান জমিদার ও মুসলমান প্রজা একই “মুসলিম জাতি”র সদস্য হয়ে যায়; অন্যদিকে একই দুর্দশায় থাকা হিন্দু কৃষককে বাইরের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখানো সম্ভব হয়। ফলে ধর্মীয় সংহতি শ্রেনী বিরোধকে ঢেকে দেয় এবং অভিজাত নেতৃত্ব নিজেদের ক্ষমতার দাবিকে পুরো সম্প্রদায়ের মুক্তির দাবি হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে।
তবে এখানেও একটি সতর্কতা প্রয়োজন। পাকিস্তান আন্দোলনকে কেবল অভিজাতদের ষড়যন্ত্র বলা ঠিক হবে না। পূর্ববাংলার মুসলমান কৃষকের বঞ্চনা সত্য ছিল, হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেনী র সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক আধিপত্যও বাস্তব ছিল এবং মুসলিম লীগের প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থনও নিছক প্রতারণার ফল ছিল না। মানুষ পাকিস্তানের মধ্যে মর্যাদা, শিক্ষা, জমির অধিকার ও সামাজিক উন্নতির আশা দেখেছিল। কিন্তু সেই ন্যায়সংগত আকাঙ্ক্ষাকে ধর্মীয় জাতিরাষ্ট্রের প্রকল্পে রূপান্তরিত করা হয়েছিল, যেখানে শ্রেনী মুক্তির সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা ছিল না।
শ্রেনী সংগ্রাম বনাম ধর্মীয় সংগ্রামঃ একটি দরকারি প্রমান
১৯৪৭ সালের পরে ওপরের বক্তব্যটির প্রমাণ পাওয়া যায়। পাকিস্তান সৃষ্টি হলেও পূর্ববাংলার দরিদ্র কৃষক ও শ্রমিকের কাঠামোগত বঞ্চনা শেষ হয়নি। হিন্দু জমিদারদের বড় অংশ চলে গেলেও তাদের জায়গায় মুসলমান অভিজাত, আমলা, ব্যবসায়ী এবং পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রিক শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে। শোষকের ধর্মীয় পরিচয় বদলাল, কিন্তু শোষণের সম্পর্ক বিলুপ্ত হলো না। পূর্ববাংলা আবারও অর্থনৈতিক বৈষম্য, সম্পদ পাচার এবং রাজনৈতিক অধীনতার শিকার হলো।
এটি দেখায়, সমস্যার মূল যদি হয় জমি, সম্পদ ও ক্ষমতার অসম বণ্টন, তাহলে শুধু শাসকের ধর্ম পরিবর্তন করে মুক্তি আসে না। একজন হিন্দু জমিদারের পরিবর্তে মুসলমান জমিদার এলেই কৃষকের শ্রেনী গত অবস্থান বদলায় না। একইভাবে হিন্দুপ্রধান কেন্দ্রের আশঙ্কা থেকে তৈরি মুসলিম রাষ্ট্রে যদি পশ্চিম পাকিস্তানি মুসলমান অভিজাতেরা পূর্ববাংলার মুসলমানদের শোষণ করে, তাহলে ধর্মীয় ঐক্যের দাবি অর্থহীন হয়ে পড়ে।
এই দৃষ্টিতে ১৯৭১ ছিল শুধু বাঙালি বনাম পাকিস্তানির সংঘাত নয়; সেটি কেন্দ্র বনাম প্রান্ত, শাসক বনাম শোষিত এবং সম্পদ নিয়ন্ত্রণকারী অভিজাতের বিরুদ্ধে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সংগ্রামও ছিল। ভাষা ও সংস্কৃতি সেই সংগ্রামের পরিচয় দিয়েছে, কিন্তু তার গভীরে ছিল রাজনৈতিক ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের দাবি।
অতএব, আমি মনে করি,সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত হতে পারে, ঔপনিবেশিক বাংলার সংঘাত কেবল ধর্মীয় ছিল না; তার গভীরে ছিল জমি, সম্পদ, শিক্ষা ও ক্ষমতার অসম বণ্টন। যেহেতু বহু এলাকায় হিন্দু জমিদার ও মুসলমান প্রজার শ্রেনী অবস্থান ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে মিলে গিয়েছিল, তাই শ্রেনী সংঘাতকে সহজেই হিন্দু-মুসলমান বিরোধ হিসেবে উপস্থাপন করা সম্ভব হয়েছিল। মুসলিম লীগের অভিজাত নেতৃত্ব সেই বঞ্চনাকে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ভাষায় সংগঠিত করে পাকিস্তানের পক্ষে গণসমর্থন তৈরি করেছিল। এতে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বাস্তব ছিল, কিন্তু তার রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ছিল এমন, যা শ্রেনী শোষণের পরিবর্তে ধর্মীয় বিভাজনকে সামনে এনেছিল।
আরও সংক্ষেপে বলা যায়, পাকিস্তান আন্দোলনে ধর্ম ছিল দৃশ্যমান পতাকা, কিন্তু সেই পতাকার নিচে জমি, শিক্ষা, চাকরি, মর্যাদা ও ক্ষমতার গভীর শ্রেনী গত প্রশ্ন কাজ করছিল। ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ সেই প্রশ্নগুলোর সমাধান না করে শোষকের শ্রেনী পরিচয় আড়াল করে তাকে সাম্প্রদায়িক পরিচয়ে অনুবাদ করেছিল।
শিক্ষাগত অসমতা ও হিন্দু মধ্যবিত্তের উত্থানঃ পার্থক্যটি কি ধর্মীয়?
ঔপনিবেশিক বাংলায় হিন্দু ও মুসলমানের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবধান বোঝার জন্য আধুনিক শিক্ষার অসম বিস্তারের ইতিহাসও বিবেচনায় নিতে হবে। ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ইংরেজি শিক্ষা যখন সরকারি চাকরি, আইন, চিকিৎসা, ব্যবসা ও নতুন পেশায় প্রবেশের প্রধান পথ হয়ে উঠল, তখন উচ্চবর্ণের হিন্দু সমাজের একটি অংশ তুলনামূলকভাবে দ্রুত সেই সুযোগ গ্রহণ করেছিল। কলকাতাকেন্দ্রিক নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মুদ্রণসংস্কৃতি এবং প্রশাসনিক সুযোগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাদের মধ্য থেকে একটি ইংরেজি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বা “ভদ্রলোক” শ্রেনী গড়ে ওঠে।
এই শ্রেনী সরকারি দপ্তর, আদালত, শিক্ষা, সাংবাদিকতা, আইন ও অন্যান্য আধুনিক পেশায় প্রাধান্য অর্জন করে। শিক্ষা থেকে চাকরি, চাকরি থেকে আয়, আয় থেকে সামাজিক মর্যাদা এবং সেই মর্যাদা থেকে আবার পরবর্তী প্রজন্মের শিক্ষা—এভাবে একটি ক্রমবর্ধমান সুবিধার চক্র তৈরি হয়। ফলে ঊনবিংশ শতকের বড় একটি সময়জুড়ে বাংলার আধুনিক মধ্যবিত্ত শ্রেনী তে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের দৃশ্যমান প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
অন্যদিকে বাংলার মুসলমানদের বড় অংশ, বিশেষ করে পূর্ববাংলায়, গ্রামে বসবাসকারী দরিদ্র কৃষক, প্রজা, কারিগর ও শ্রমজীবী ছিল। কলকাতাকেন্দ্রিক ইংরেজি বিদ্যালয় ও কলেজে সন্তান পাঠানোর অর্থনৈতিক সামর্থ্য এবং ভৌগোলিক সুযোগ তাদের ছিল সীমিত। ফলে শিক্ষাগত পিছিয়ে থাকার বিষয়টি শুধু ধর্মীয় অনীহা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না; এর সঙ্গে দারিদ্র্য, গ্রামীণ অবস্থান এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অসম প্রবেশাধিকারের সম্পর্ক ছিল।
এর পাশাপাশি একটি বড় প্রশাসনিক পরিবর্তন মুসলমানদের আরও অসুবিধায় ফেলে। মোগল ও প্রাথমিক ঔপনিবেশিক আমলে ফারসি ছিল আদালত ও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ভাষা। মুসলমান শিক্ষিত শ্রেনী র একটি অংশ ফারসি ও আরবি শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত ছিল। ১৮৩৭ সালে প্রশাসন ও আদালতে ফারসির পরিবর্তে ইংরেজির গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের পুরোনো শিক্ষাগত পুঁজি দ্রুত মূল্য হারায়। বিপরীতে যে হিন্দু পরিবারগুলো আগে থেকেই ইংরেজি শিক্ষায় প্রবেশ করেছিল, তারা নতুন ব্যবস্থায় সুবিধাজনক অবস্থান লাভ করে।
তবে মুসলমান সমাজের অভ্যন্তরীণ দায়ও অস্বীকার করা যাবে না। মুসলমান অভিজাত ও ধর্মীয় নেতৃত্বের একটি অংশ ইংরেজি শিক্ষাকে ব্রিটিশ শাসন, খ্রিষ্টান মিশনারি কার্যক্রম কিংবা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিচ্যুতির বাহন হিসেবে সন্দেহের চোখে দেখেছিল। অনেক পরিবার সন্তানদের মাদ্রাসা, মক্তব, আরবি ও ফারসি শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চেয়েছিল। আধুনিক বিজ্ঞান, ইংরেজি, আইন ও প্রশাসনিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বুঝতে মুসলমান সমাজের একটি অংশের সময় লেগেছিল। এই বিলম্ব তাদের সরকারি চাকরি ও নতুন পেশায় প্রবেশের সুযোগ আরও কমিয়ে দেয়।
কিন্তু “মুসলমানরা নিজেরাই ইংরেজি শিক্ষা নেয়নি, তাই তাদের পিছিয়ে পড়ার সম্পূর্ণ দায় তাদেরই”, এমন সিদ্ধান্তও ইতিহাসসম্মত নয়। শিক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্ত শূন্যে নেওয়া হয় না। দরিদ্র কৃষক পরিবারের জন্য বিদ্যালয়ের দূরত্ব, পড়াশোনার খরচ, সন্তানের শ্রম হারানো এবং শিক্ষা শেষে চাকরি পাওয়ার অনিশ্চয়তা বড় বাধা ছিল। যে মুসলমান জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ গ্রামে বাস করত, তাদের সামনে কলকাতার হিন্দু উচ্চ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সমান সুযোগ ছিল না।
আবার সব হিন্দুও ইংরেজি শিক্ষার সুবিধা পায়নি। ইংরেজি শিক্ষায় এগিয়ে যাওয়া “হিন্দু সমাজ” বলতে প্রধানত উচ্চবর্ণের শহুরে ও সম্পদশালী হিন্দুদের বোঝানো হয়। নিম্নবর্ণের হিন্দু, নমশূদ্র, দলিত, ভূমিহীন কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের বড় অংশ একইভাবে শিক্ষা ও চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল। অতএব বিভাজনটি শুধু হিন্দু বনাম মুসলমান ছিল না; এর মধ্যে শ্রেনী , বর্ণ, ভূগোল এবং সম্পদের অসমতাও কাজ করেছিল।
ঊনবিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে নবাব আবদুল লতিফ, সৈয়দ আমীর আলীসহ মুসলমান সংস্কারকেরা ইংরেজি ও আধুনিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা প্রচার করতে শুরু করেন। তাঁরা বুঝেছিলেন, শুধু ধর্মীয় শিক্ষা দিয়ে নতুন প্রশাসন, আইন, বিজ্ঞান ও অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতা করা সম্ভব নয়। তাঁদের প্রচেষ্টায় ধীরে ধীরে মুসলমানদের মধ্যেও শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেনী গড়ে ওঠে। কিন্তু তত দিনে হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেনী শিক্ষা, চাকরি ও পেশায় কয়েক প্রজন্মের অগ্রগতি অর্জন করে ফেলেছিল।
এই ঐতিহাসিক ব্যবধান পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ক্ষোভে রূপ নেয়। মুসলমানরা যখন আদালত, প্রশাসন, স্কুল, কলেজ ও পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানে হিন্দুদের দৃশ্যমান প্রাধান্য দেখল, তখন অনেকের কাছে এটি শুধু শিক্ষাগত ও শ্রেনী গত ব্যবধান বলে মনে হয়নি; মনে হয়েছে, একটি ধর্মীয় সম্প্রদায় অন্যটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে বঞ্চিত করছে। বাস্তবে হিন্দু মধ্যবিত্তের প্রাধান্য ছিল সত্য, কিন্তু তার কারণ “হিন্দুদের ষড়যন্ত্র” ছিল না। সেটি তৈরি হয়েছিল ইংরেজি শিক্ষায় আগে প্রবেশ, কলকাতাকেন্দ্রিক সুযোগ, শ্রেনী গত সুবিধা, মুসলমান সমাজের প্রাথমিক অনীহা এবং ঔপনিবেশিক নীতির সম্মিলিত প্রভাবে। এটির পেছনে মূল ষড়যন্ত্রকারী ইস্যুটি ছিলো বৃটিশদের “ডিভাইড এন্ড রুল” পলিসি।
এই ব্যবধানকে মুসলিম লীগের রাজনীতি কার্যকরভাবে ধর্মীয় বঞ্চনার বয়ানে রূপান্তরিত করে। সাধারণ মুসলমানকে বলা সহজ হয়ে যায় যে, হিন্দু আধিপত্য থেকে মুক্তির জন্য পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র প্রয়োজন। অথচ যে উচ্চবর্ণের হিন্দু মধ্যবিত্ত শিক্ষা ও চাকরিতে এগিয়ে ছিল, তার সঙ্গে দরিদ্র হিন্দু কৃষক বা নমশূদ্রের অবস্থান এক ছিল না। একইভাবে দরিদ্র মুসলমান কৃষক ও মুসলমান নবাব বা জমিদারের শ্রেনী গত স্বার্থও এক ছিল না।
এখানেই শিক্ষাগত অসমতা শ্রেনী ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সংযোগস্থল হয়ে ওঠে। একটি বাস্তব বৈষম্যকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হয় যেন প্রত্যেক হিন্দু সুবিধাভোগী এবং প্রত্যেক মুসলমান একইভাবে বঞ্চিত। এতে শ্রেনী ও বর্ণের পার্থক্য আড়ালে চলে যায়, আর ধর্মীয় পরিচয় প্রধান রাজনৈতিক বিভাজনে পরিণত হয়।
অতএব আমার মতে, ঔপনিবেশিক বাংলায় উচ্চবর্ণের হিন্দুদের একটি অংশ ইংরেজি শিক্ষা আগে গ্রহণ করে নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেনী , সরকারি চাকরি ও আধুনিক পেশায় প্রাধান্য অর্জন করেছিল। মুসলমানদের পিছিয়ে থাকার পেছনে ধর্মীয় রক্ষণশীলতা ও আধুনিক শিক্ষা গ্রহণে বিলম্বের দায় ছিল, কিন্তু সেটিই একমাত্র কারণ নয়। গ্রামীণ দারিদ্র্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অসম বিস্তার, ফারসি ভাষার প্রশাসনিক মর্যাদা বিলোপ এবং ঔপনিবেশিক কাঠামোও সমানভাবে দায়ী ছিল। পরবর্তী সময়ে এই বাস্তব শিক্ষাগত ও শ্রেনী গত ব্যবধানকে হিন্দু-মুসলমানের স্বাভাবিক শত্রুতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যা ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের পক্ষে শক্তিশালী রাজনৈতিক উপকরণ হয়ে ওঠে।
একই শ্রেণির দুই অংশ: হিন্দু ও মুসলিম মধ্যবিত্তের উপদলীয় সংঘাত
ঔপনিবেশিক বাংলার রাজনীতিতে শুধু শাসক ও শোষিতের উল্লম্ব শ্রেণিসংঘাত ছিল না; একই সামাজিক স্তরে অবস্থানকারী দুটি মধ্যবিত্ত গোষ্ঠীর মধ্যে একটি আনুভূমিক প্রতিযোগিতাও ছিল। একদিকে ছিল আগে গড়ে ওঠা, ইংরেজি শিক্ষিত এবং প্রশাসন ও আধুনিক পেশায় প্রতিষ্ঠিত হিন্দু ভদ্রলোক মধ্যবিত্ত। অন্যদিকে ছিল তুলনামূলকভাবে পরে গড়ে ওঠা, সুযোগ ও প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে অসন্তুষ্ট এবং দ্রুত রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হতে থাকা মুসলিম মধ্যবিত্ত। সমাজতাত্ত্বিক অর্থে এটিকে একই বিস্তৃত শ্রেণির ভেতরের “উপদলীয় সংঘাত” বা factional conflict হিসেবে দেখা যায়।
এই দ্বন্দ্ব শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের পার্থক্য নিয়ে ছিল না। এর কেন্দ্রে ছিল সরকারি চাকরি, শিক্ষা, আইন পেশা, স্থানীয় প্রশাসন, নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা, সামাজিক মর্যাদা এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ভাগাভাগি। হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেণি ইংরেজি শিক্ষা আগে গ্রহণ করায় এসব ক্ষেত্রে তুলনামূলক অগ্রগতি অর্জন করেছিল। পরে শিক্ষিত মুসলিম মধ্যবিত্তের বিস্তার ঘটলে তারা দেখতে পায় যে নতুন প্রশাসনিক ও পেশাগত ক্ষেত্রের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে হিন্দু মধ্যবিত্তের নিয়ন্ত্রণে বা প্রভাবে রয়েছে।
ফলে মুসলিম মধ্যবিত্তের মধ্যে আপেক্ষিক বঞ্চনার অনুভূতি তৈরি হয়। আপেক্ষিক বঞ্চনা মানে শুধু দরিদ্র হওয়া নয়; বরং অন্য একটি তুলনীয় গোষ্ঠীকে বেশি সুযোগ, মর্যাদা ও ক্ষমতা ভোগ করতে দেখে নিজেকে বঞ্চিত মনে করা। একজন মুসলমান আইনজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিক বা নিম্নপর্যায়ের সরকারি কর্মচারী দরিদ্র কৃষকের মতো নিঃস্ব ছিলেন না। কিন্তু একই যোগ্যতার একজন হিন্দু পেশাজীবীর তুলনায় সুযোগ কম মনে হলে তাঁর মধ্যে রাজনৈতিক অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারত।
এই অসন্তোষের একটি অংশ ছিল বাস্তব বৈষম্যের ফল। আবার একটি অংশ ছিল দ্রুত উত্থানশীল মুসলিম মধ্যবিত্তের জন্য আরও চাকরি, পদ, নির্বাচনী আসন ও প্রশাসনিক কর্তৃত্ব অর্জনের আকাঙ্ক্ষা। অর্থাৎ এখানে কেবল দরিদ্রের মুক্তির সংগ্রাম নয়, দুটি মধ্যবিত্ত উপদলের মধ্যে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও ক্ষমতার ভাগ নিয়ে প্রতিযোগিতাও কাজ করেছে।
হিন্দু মধ্যবিত্তের একটি অংশ বিদ্যমান সুবিধা ও প্রতিষ্ঠানগত প্রাধান্য রক্ষা করতে চাইছিল। মুসলিম মধ্যবিত্তের একটি অংশ সেই কাঠামোয় নিজেদের জন্য বৃহত্তর অংশ দাবি করছিল। পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী, চাকরিতে প্রতিনিধিত্ব, শিক্ষাবৃত্তি, সরকারি নিয়োগ এবং প্রাদেশিক ক্ষমতা নিয়ে সংঘাত এই প্রতিযোগিতাকে ক্রমে সাম্প্রদায়িক রূপ দেয়। ফলে “কে কত চাকরি পাবে” প্রশ্নটি হয়ে ওঠে “হিন্দু না মুসলমান, কার হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা থাকবে” প্রশ্ন।
এই মধ্যবিত্ত প্রতিযোগিতা বোঝা ছাড়া পাকিস্তান আন্দোলনের সাফল্য সম্পূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। মুসলিম লীগের শীর্ষ নেতৃত্বে নবাব, জমিদার, আইনজীবী ও সম্পদশালী অভিজাতেরা থাকলেও আন্দোলনের দৈনন্দিন সংগঠন, প্রচার এবং রাজনৈতিক ভাষা নির্মাণে মুসলিম মধ্যবিত্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিক্ষক, ছাত্র, আইনজীবী, সাংবাদিক, সরকারি চাকরিপ্রার্থী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং নতুন পেশাজীবীরা পাকিস্তানের দাবিকে গ্রাম ও শহরের সাধারণ মুসলমানের কাছে পৌঁছে দেয়।
এই শ্রেণির জন্য পাকিস্তান ছিল শুধু ধর্মীয় আবেগের রাষ্ট্র নয়; এটি ছিল সামাজিক উন্নয়ন ও শ্রেণিগত গতিশীলতার একটি সম্ভাব্য ক্ষেত্র। তারা এমন একটি রাষ্ট্র কল্পনা করেছিল, যেখানে হিন্দু ভদ্রলোকের সঙ্গে প্রতিযোগিতা ছাড়াই সরকারি চাকরি, প্রশাসনিক নেতৃত্ব, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং পেশাগত মর্যাদায় দ্রুত অগ্রসর হওয়া যাবে। অর্থাৎ পাকিস্তান তাদের কাছে একই সঙ্গে ধর্মীয় স্বদেশ এবং নতুন সুযোগের বাজার ছিল।
এখানেই মুসলিম মধ্যবিত্তের স্বার্থ এবং দরিদ্র মুসলমান কৃষকের আকাঙ্ক্ষা সাময়িকভাবে একত্রিত হয়। কৃষক পাকিস্তানের মধ্যে খাজনা, ঋণ, জমিদারি নিপীড়ন ও সামাজিক অপমান থেকে মুক্তির আশা দেখেছিল। মুসলিম মধ্যবিত্ত দেখেছিল চাকরি, মর্যাদা ও রাষ্ট্রক্ষমতার বিস্তৃত সুযোগ। মুসলিম অভিজাত দেখেছিল প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় ক্ষমতা লাভের সম্ভাবনা। প্রত্যেক গোষ্ঠী একই “পাকিস্তান” শব্দ ব্যবহার করলেও তাদের প্রত্যাশা এক ছিল না।
মুসলিম লীগের রাজনৈতিক সাফল্য ছিল এই ভিন্ন স্বার্থকে একটি ধর্মীয় পরিচয়ের নিচে একত্রিত করতে পারা। মুসলমান জমিদার, মধ্যবিত্ত পেশাজীবী এবং দরিদ্র কৃষকের শ্রেণিগত স্বার্থ পরস্পরবিরোধী হলেও তাদের “মুসলিম জাতি” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এর ফলে মুসলমান সমাজের অভ্যন্তরীণ শ্রেণিবিভাজন আড়ালে চলে যায় এবং প্রতিষ্ঠিত হিন্দু মধ্যবিত্তকে একটি অভিন্ন প্রতিপক্ষ হিসেবে তুলে ধরা সহজ হয়।
একইভাবে সব হিন্দুকেও একটি সুবিধাভোগী শ্রেণি হিসেবে দেখানো হয়েছিল। কিন্তু দরিদ্র নমশূদ্র কৃষক, দলিত শ্রমিক কিংবা ভূমিহীন হিন্দুর অবস্থান কলকাতার উচ্চবর্ণের ইংরেজি শিক্ষিত ভদ্রলোকের মতো ছিল না। ধর্মীয় বিভাজন এই পার্থক্যটিও আড়াল করে দেয়।
বাংলার সংঘাত দুটি আন্তঃসম্পর্কিত স্তর
প্রথম স্তরে ছিল উল্লম্ব শ্রেণিসংঘাত: জমিদার বনাম প্রজা, মহাজন বনাম ঋণগ্রস্ত কৃষক এবং অভিজাত বনাম শ্রমজীবী মানুষ।
দ্বিতীয় স্তরে ছিল আনুভূমিক উপদলীয় সংঘাত: প্রতিষ্ঠিত হিন্দু মধ্যবিত্ত বনাম উত্থানশীল মুসলিম মধ্যবিত্ত, যারা একই সরকারি চাকরি, শিক্ষা, পেশা, প্রতিনিধিত্ব এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার জন্য প্রতিযোগিতা করছিল।
উপরের আনুভূমিক সংঘাত নিচের উল্লম্ব শ্রেণিসংগ্রামকে ধর্মীয় ভাষায় পুনর্গঠন করে। মুসলিম মধ্যবিত্ত তার নিজের সুযোগ ও ক্ষমতা বৃদ্ধির দাবিকে সমগ্র মুসলমান জনগোষ্ঠীর মুক্তির দাবি হিসেবে উপস্থাপন করে। আর দরিদ্র মুসলমান কৃষকের বাস্তব বঞ্চনা সেই দাবিকে ব্যাপক গণভিত্তি দেয়। এভাবেই একটি মধ্যবিত্ত উপদলের ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা গণমানুষের ধর্মীয় জাতীয়তাবাদে রূপান্তরিত হয়।
এ প্রক্রিয়াকে “ভ্রান্ত চেতনা” বললে তার অর্থ এই নয় যে সাধারণ মুসলমানের বঞ্চনা মিথ্যা ছিল। তাদের দারিদ্র্য, শিক্ষাগত পশ্চাৎপদতা ও সামাজিক অসম্মান বাস্তব ছিল। ভ্রান্ত চেতনার বিষয়টি ছিল বঞ্চনার কারণ ও সমাধান সম্পর্কে। যদি জমি, শিক্ষা, চাকরি ও ক্ষমতার অসমতাকে শুধু “হিন্দু-মুসলমান সমস্যা” হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, তাহলে মুসলমান জমিদার ও অভিজাতের শ্রেণিগত ভূমিকা আড়ালে থেকে যায়। একইভাবে দরিদ্র হিন্দু ও মুসলমানের অভিন্ন স্বার্থও অদৃশ্য হয়ে যায়।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরে এই দ্বন্দ্ব আরও পরিষ্কার হয়। পূর্ববাংলায় হিন্দু মধ্যবিত্তের প্রাধান্য কমলেও বাঙালি মুসলমানের সার্বিক মুক্তি আসেনি। বরং পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রিক আমলা, সামরিক কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবী অভিজাতেরা নতুন প্রতিযোগী ও শাসক শ্রেণি হিসেবে আবির্ভূত হয়। পূর্ববাংলার মুসলিম মধ্যবিত্ত তখন বুঝতে শুরু করে, হিন্দু মধ্যবিত্তকে সরিয়ে দিলেই ক্ষমতায় তার সমান অংশ নিশ্চিত হয় না। এই নতুন আপেক্ষিক বঞ্চনা ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসনের দাবি এবং শেষ পর্যন্ত বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ইতিহাসের পরিহাস এখানেই। যে মুসলিম মধ্যবিত্ত হিন্দু মধ্যবিত্তের প্রাধান্য থেকে মুক্তির আশায় পাকিস্তান আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিল, সেই শ্রেণির একটি বড় অংশই পরে পশ্চিম পাকিস্তানি অভিজাতের আধিপত্যের বিরুদ্ধে বাংলা ভাষা, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীন বাংলাদেশের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়।
অতএব সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ও শক্তিশালী সিদ্ধান্ত হতে পারে:
পাকিস্তান আন্দোলনের পেছনে শুধু হিন্দু-মুসলমানের ধর্মীয় বিভাজন ছিল না। সেখানে প্রতিষ্ঠিত হিন্দু ভদ্রলোক মধ্যবিত্ত এবং উত্থানশীল মুসলিম মধ্যবিত্তের মধ্যে চাকরি, শিক্ষা, মর্যাদা, প্রতিনিধিত্ব ও রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ে একটি উপদলীয় সংঘাতও কাজ করেছিল। মুসলিম মধ্যবিত্ত দরিদ্র মুসলমান কৃষকের বাস্তব বঞ্চনাকে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ভাষায় সংগঠিত করে পাকিস্তান আন্দোলনকে গণভিত্তি দিয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর দেখা গেল, একটি মধ্যবিত্ত উপদলের ক্ষমতা বৃদ্ধি সমগ্র দরিদ্র জনগোষ্ঠীর শ্রেণিমুক্তি নিশ্চিত করে না।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au