অভিবাসন নীতি প্রকাশে লেবার ও কোয়ালিশনের চেয়ে এগিয়ে ওয়ান নেশন
ফেডারেল নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, অভিবাসনের লক্ষ্যমাত্রা সবার আগে ঘোষণা করে বড় রাজনৈতিক সুবিধা আদায় করেছে ওয়ান নেশন। দলটির এই পদক্ষেপের পর অ্যাঙ্গাস টেলর…
জিন্নাহ , ইসলামপন্থা ও “ইসলামিক রিপাবলিক”
জিন্নাহ কে মওদুদীর মতো শরিয়াহভিত্তিক ইসলামপন্থী বলা যাবে না। শিক্ষা, আইনচর্চা, পোশাক ও জীবনযাপনে তিনি পাশ্চাত্যঘেঁষা ছিলেন। নিয়মিত ধর্মাচারের জন্য তিনি পরিচিত ছিলেন না। বিভিন্ন জীবনী ও স্মৃতিকথায় তাঁর মদ্যপান ও ইসলামে নিষিদ্ধ খাদ্য গ্রহণের উল্লেখ রয়েছে। তবে এসব থেকে তাঁকে নাস্তিক বলা ঠিক হবে না। বরং বলা যায়, ব্যক্তিজীবনে তিনি প্রথাগত ধর্মাচারী ছিলেন না, কিন্তু রাজনীতিতে মুসলমানের ধর্মীয় পরিচয়কে রাষ্ট্র নির্মাণের প্রধান ভিত্তি করেছিলেন।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের সরকারি নাম “Islamic Republic of Pakistan” ছিল না। দেশটির নাম ছিল Pakistan বা Dominion of Pakistan। জিন্নাহ মারা যান ১৯৪৮ সালে। তাঁর মৃত্যুর পরে, ১৯৪৯ সালের Objectives Resolution-এ আল্লাহর সার্বভৌমত্ব এবং মুসলমানদের কোরআন ও সুন্নাহ অনুসারে জীবন পরিচালনার নীতি অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৫৬ সালের সংবিধানে প্রথম দেশটির আনুষ্ঠানিক নাম হয় “Islamic Republic of Pakistan” এবং রাষ্ট্রপতির পদ মুসলমানদের জন্য নির্ধারিত হয়।
অর্থাৎ জিন্নাহ নিজে “Islamic Republic” নামের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেননি। কিন্তু তাঁর ধর্মভিত্তিক মুসলিম জাতীয়তাবাদ পরবর্তী ইসলামিকীকরণের রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করেছিল। ধারাবাহিকতাটি ছিল: মুসলমান পৃথক জাতি, মুসলমানের জন্য পৃথক রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের মুসলিম পরিচয়, আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, শেষে ইসলামিক রিপাবলিক। শেষের ধাপগুলো জিন্নাহ সম্পন্ন করেননি, কিন্তু প্রথম দুটি তাঁর নেতৃত্বেই রাষ্ট্রীয় রূপ পেয়েছিল।
এই কাঠামোয় হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও অন্যরা কাগজে নাগরিক অধিকার পেলেও রাষ্ট্রের ঘোষিত ধর্মীয় পরিচয়ের অংশ হতে পারেনি। একজন অমুসলিম নাগরিক রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে যেতে না পারলে তার নাগরিকত্ব আইনত স্বীকৃত হলেও সমমর্যাদার থাকে না।
মওদুদীর চোখে জিন্নাহ র পাকিস্তান
আজ জিন্নাহ , মুসলিম লীগ ও জামায়াতে ইসলামীকে একই আদর্শিক ধারায় রাখা হলেও ইতিহাসে মওদুদী ছিলেন জিন্নাহ’র কঠোর সমালোচক। তিনি মুসলিম লীগকে “জামায়াতে জাহিলিয়াত” বলেছিলেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, জিন্নাহ “ইসলামের শাসন” নয়, “মুসলমানের শাসন” প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন।
মওদুদীর মতে, আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হলে রাষ্ট্র হবে প্রকৃত “পাক-ই-স্তান”; পাশ্চাত্য গণতন্ত্র ও জনপ্রভুত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত হলে তা হবে “না-পাকি-স্তান।” জামায়াত ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের পক্ষে অংশ নেয়নি। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মওদুদী সেখানে গিয়ে রাষ্ট্রটিকে শরিয়াহভিত্তিক ইসলামী রাষ্ট্রে রূপান্তরের আন্দোলন শুরু করেন।
অতএব জিন্নাহ জামায়াতের স্বাভাবিক আদর্শিক নায়ক ছিলেন না। বরং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে জামায়াত তাঁকে যথেষ্ট ইসলামী মনে করেনি; প্রতিষ্ঠার পরে তাঁর রাষ্ট্রকে নিজেদের ধারণা অনুযায়ী ইসলামিকীকরণ করতে চেয়েছে।
নিজের মেয়েও যে পাকিস্তানে স্থায়ী হলেন না
জিন্নাহ র ব্যক্তিজীবনেও দ্বিজাতিতত্ত্বের সীমাবদ্ধতা দেখা যায়। তাঁর স্ত্রী রতনবাই পেটিট ছিলেন পারসি পরিবারের মেয়ে। তাঁদের একমাত্র কন্যা দিনা পরে পারসি ব্যবসায়ী নেভিল ওয়াদিয়াকে বিয়ে করেন। জিন্নাহ এতে আপত্তি করেছিলেন, যদিও তিনি নিজেও একজন পারসি নারীকে বিয়ে করেছিলেন।
১৯৪৭ সালে জিন্নাহ পাকিস্তানে গেলেও দিনা সেখানে স্থায়ী হননি। তিনি বোম্বেতে জীবনযাপন করেন এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। তাঁর সন্তান ও পরবর্তী বংশধরেরাও ভারতীয় পরিচয়ের মধ্যেই জীবন গড়েছেন। তবে জিন্নাহ র কোনো আত্মীয় পাকিস্তানে যাননি বলা ঠিক নয়; তাঁর বোন ফাতিমা জিন্নাহ তাঁর সঙ্গে পাকিস্তানে গিয়েছিলেন।
দিনার সিদ্ধান্ত পাকিস্তানের বৈধতা বাতিল করে না, কিন্তু একটি গভীর মানবিক প্রশ্ন তোলে। রাজনৈতিক তত্ত্ব মানুষকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করতে পারে; কিন্তু ভালোবাসা, পরিবার, ভাষা ও বসবাসের বাস্তব জীবন প্রায়ই সেই সীমানা মানে না।
ইতিহাসে জিন্নাহ থাকবেন, বাংলাদেশের নায়ক হয়ে নয়
জিন্নাহ র ছবি ছিঁড়ে ইতিহাস মুছে ফেলা যাবে না। আবার আর্কাইভের নামে তাঁকে বাংলাদেশের জাতীয় আকাঙ্ক্ষার নায়ক বানানোও ইতিহাসচর্চা নয়। তাঁর ছবি থাকলে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা, শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ, ভাষা আন্দোলনের সূচনা, মওদুদীর বিরোধিতা এবং দ্বিজাতিতত্ত্বের পরিণতিও দেখাতে হবে। প্রসঙ্গহীন ছবি ইতিহাস নয়; তা রাজনৈতিক প্রতীক নির্মাণ।
জিন্নাহ পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা। বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু গভীরভাবে সমস্যাসংকুল একটি অধ্যায়। তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধেই বাঙালি ভাষা আন্দোলন করেছে এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে। ২০২৪ সালের জুলাই যদি বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণের “প্রতিশ্রুতি” হয়, তবে তার প্রতীক খুঁজতে হবে ভাষাশহীদ, মুক্তিযোদ্ধা এবং নাগরিক অধিকারের সংগ্রামের মধ্যে। ১৯৪৮ সালে বাঙালির ভাষার সমমর্যাদা প্রত্যাখ্যান করা নেতার মধ্যে নয়।
প্রশ্নটি তাই শুধু ডাকসু আর্কাইভে জিন্নাহ’র ছবি থাকবে কি থাকবে না, সেটি নয়। আসল প্রশ্ন হলো, আমরা বাংলাদেশকে কোন ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় দেখতে চাই: দ্বিজাতিতত্ত্বের পাকিস্তানে ফিরে যাওয়ার ইতিহাসে, নাকি ভাষা, মুক্তিযুদ্ধ, নাগরিক সাম্য ও বহুত্ববাদের ভিত্তিতে সামনে এগিয়ে যাওয়ার ইতিহাসে? আজকের বাংলাদেশকে যদি সত্যিই নতুন হতে হয়, তাকে পুরোনো পাকিস্তানের ছায়ায় নয়, নিজের ইতিহাসের আলোয় দাঁড়াতে হবে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au