বাংলাদেশ

কাউন্টডাউন শুরু

ডিসেম্বরের আগে সরকারকে অচল করতে চায় আ.লীগ, তারপর প্রত্যাবর্তন

  • 4:53 am - September 21, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৩৭৮ বার
গুলশানে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে আওয়ামী লীগের বিশাল মিছিল। ছবিঃ সংগৃহীত

আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা আগেই জানিয়েছেন। তার দেশে ফেরাকে সামনে রেখে দলটি সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় হওয়ার পাশাপাশি ধারাবাহিক রাজনৈতিক কর্মসূচি নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ১৮ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির ভার্চুয়াল বৈঠকেও দলের সাংগঠনিক পরিস্থিতি, দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা এবং আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

তবে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পরিকল্পনা নতুন নয়। চলতি বছরের জুলাইয়ে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, তিনি এবং আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হওয়ার পরিকল্পনা করছেন। আগস্টেও এক অনুষ্ঠানে তিনি ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।

আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক কেন্দ্রীয় বৈঠকের প্রকাশিত বিবৃতিতে অবশ্য শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের প্রত্যাবর্তনের আগে সরকারকে ‘অচল’ বা ‘অথর্ব’ করে দেওয়ার কোনো সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করা হয়নি। দলটির প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন খাতের পরিস্থিতি, রাজনৈতিক পরিবেশ, আইনশৃঙ্খলা, তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বৈঠকে শেখ হাসিনা বলেন, দেশের প্রকৃত পরিস্থিতি এবং জনগণের অবস্থা জানতে তিনি আওয়ামী লীগের ৮৩টি জেলা শাখা ও ১৬০টি নির্বাচনী এলাকার নেতাকর্মীদের সঙ্গে পর্যায়ক্রমে মতবিনিময় করেছেন। এসব মতবিনিময় থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি দাবি করেন, দেশের বিভিন্ন খাত ক্রমাগত অবনতির দিকে যাচ্ছে এবং পরিস্থিতি থেকে দেশকে রক্ষা করতে আওয়ামী লীগকে সাংগঠনিকভাবে প্রস্তুত হতে হবে।

দলের সাংগঠনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, যেখানে সাংগঠনিক শূন্যতা রয়েছে, সেখানে নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার নেতাকর্মীদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। আওয়ামী লীগের শক্তি জনগণ ও তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

গত প্রায় দুই বছরে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে যারা নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, তাদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে জনগণের সামনে তুলে ধরার নির্দেশ দেন শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে এসব ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের পরিচয় ও কর্মকাণ্ড প্রকাশ করার কথাও বলেন তিনি।

বৈঠকে শেখ হাসিনা আরও দাবি করেন, অনেক সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাকে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মুক্তির দাবিও জানান তিনি।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সহিংসতার প্রসঙ্গ তুলে শেখ হাসিনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলা, পুলিশ সদস্য নিহত হওয়া এবং থানায় হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলোর বিচার দাবি করেন। এসব ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করার কথাও বলেন তিনি।

দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে শেখ হাসিনা হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, চাঁদাবাজি ও মামলা দেওয়ার মতো বিভিন্ন অভিযোগ তোলেন। তার অভিযোগ, সরকার এসব কর্মকাণ্ড ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই বা প্রমাণ তিনি বৈঠকের বক্তব্যে উপস্থাপন করেছেন কি না, দলটির প্রকাশিত বিবৃতিতে তা উল্লেখ করা হয়নি।

শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের কাউন্টডাউন শুরু। ছবিঃ সংগৃহীত

এরপরই দেশে ফেরার প্রসঙ্গ তুলে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি দেশে ফিরতে আগ্রহী, কিন্তু সরকার তার ফেরার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করছে। এর আগে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও তিনি জানিয়েছিলেন, দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা রয়েছে।

আওয়ামী লীগ সভাপতি দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, তাদের ওপর যতই নির্যাতন হোক কিংবা তাদের বিরুদ্ধে যত মৃত্যুদণ্ডের সাজাই দেওয়া হোক, তাদের জনগণের পাশে থাকতে হবে। জনগণের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কথাও বলেন তিনি।

দলের কেন্দ্রীয় বৈঠকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে একাধিক দাবি ও প্রস্তাবও গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানো, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সারের সরবরাহ নিশ্চিত করা, চাকরি হারানো শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা এবং বন্ধ শিল্প ও কারখানা পুনরায় চালু করা।

এ ছাড়া রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দায়ের করা দলীয় ভাষায় ‘মিথ্যা মামলা’ প্রত্যাহার, দলটির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং গ্রেপ্তার সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের মুক্তির দাবিও জানানো হয়েছে। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের অন্য নেতাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় এবং ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম নিয়েও দলটি আপত্তি জানিয়েছে। এগুলো আওয়ামী লীগের নিজস্ব দাবি ও অবস্থান হিসেবে দলটির প্রকাশিত বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা চলছে। তবে তার দেশে ফেরার নির্দিষ্ট তারিখ এখনো ঘোষণা করা হয়নি। জুলাইয়ে তার মুখপাত্র জানিয়েছিলেন, তিনি বছরের শেষ নাগাদ, অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ফিরতে চান, কিন্তু নির্দিষ্ট দিন তখনও ঠিক হয়নি।

এদিকে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়ে সরকারের অবস্থানও স্পষ্ট। ২০ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, শেখ হাসিনা ডিসেম্বর না ফেব্রুয়ারিতে ফিরবেন, তা নিয়ে সরকার উদ্বিগ্ন নয়। একই সঙ্গে তিনি আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন এবং দলটির ঘোষিত ‘লকডাউন’ কর্মসূচির প্রভাব নিয়েও মন্তব্য করেন।

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: সংগৃহীত

রোববার আওয়ামী লীগের ঘোষিত লকডাউন কর্মসূচিকে ঘিরে ঢাকায় নিরাপত্তা জোরদারের খবরও এসেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ ও যানবাহনে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে এবং এসব ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করতে সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করা হচ্ছে। সরকার দাবি করেছে, এসব ঘটনায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বড় ধরনেরভাবে ব্যাহত হয়নি।

আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক কর্মসূচি এবং শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাকে ঘিরে এখন মূল প্রশ্ন হচ্ছে, ডিসেম্বরের আগে দলটি কতটা সংগঠিতভাবে রাজনৈতিক মাঠে ফিরতে পারে এবং সরকারের ওপর কতটা রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে। দলটির প্রকাশিত বৈঠকের সিদ্ধান্তগুলোতে আন্দোলন জোরদারের পাশাপাশি সাংগঠনিক ভিত্তি পুনর্গঠনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সরকার বলছে, আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে তারা উদ্বিগ্ন নয় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

ফলে শেখ হাসিনার ঘোষিত ডিসেম্বরের প্রত্যাবর্তন এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য ঘটনা হিসেবে সামনে এসেছে। তবে তার প্রত্যাবর্তনের আগে আওয়ামী লীগের আন্দোলনের ধরন, সরকারের প্রতিক্রিয়া এবং দলটির মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক সক্ষমতা আগামী কয়েক মাসের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

সূত্রঃ দ্য ওয়াল

এই শাখার আরও খবর

শরীয়তপুরের কলেজের কনসার্টে শেখ হাসিনা ও ‘জয় বাংলা’ স্লোগান

শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার সরকারি শামসুর রহমান কলেজে নবীনবরণ উপলক্ষে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও কনসার্টে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে এবং ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার…

বিএনপির কর্মসূচিতে বেজে উঠল শেখ হাসিনাকে নিয়ে লেখা গান

চট্টগ্রাম নগর বিএনপির ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত প্রচারণা কর্মসূচিতে মাইকে বেজে উঠেছে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে লেখা গান ‘বঙ্গবন্ধুর কন্যা…

শেখ মুজিবকে ‘জাতির পিতা’ সম্বোধন, বিপ্লব ও সংহতি দিবসের সভায় দুই দফা হট্টগোল

জয়পুরহাটে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে জেলা প্রশাসনের আয়োজিত আলোচনা সভায় ব্যানারে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ছবি না থাকাকে কেন্দ্র করে হট্টগোল হয়েছে। পরে…

বাংলাদেশ-পাকিস্তান থেকে যাওয়া সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্ব দিতে তোড়জোড় পশ্চিমবঙ্গে

বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ভারতে যাওয়া নির্দিষ্ট ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার ঘোষণা দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন…

শেখ হাসিনার নিরাপত্তার উদ্যোগ নিতে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ৬ এমপির চিঠি

বাংলাদেশে বিচারব্যবস্থার রাজনীতিকরণ বন্ধ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরার আগে তাঁর আইনি ও শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে যুক্তরাজ্যের…

৮ বছরের শিশুকে ধর্ষণ হুজুরের, গ্রেপ্তারের পর কারাগারে

ওটিএন বাংলা ডেস্ক :  নরসিংদীর মনোহরদীতে মক্তবে আরবি পড়তে গিয়ে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে আট বছর বয়সী এক শিশুশিক্ষার্থী। শিশুটিকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে মক্তবের শিক্ষক…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au