বাংলাদেশ

মতামত | প্রফেসর ড. শ্যামল দাস

দুর্নীতির বরপুত্র তারেক রহমান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বিএনপি’র যত মিথ্যাচার

সব ব্যারোমিটার ভালো, শুধু মানুষই নিরাপদ নয়ঃ মন্ত্রীর ব্যারোমিটারে শান্তি, পুলিশের হিসাবে অশান্তি

  • 11:27 am - September 22, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৬ বার
দুই নেতার সঙ্গে বিএনপির প্রতীক এবং বিপদসূচক আইনশৃঙ্খলা ব্যারোমিটার। OTN Bangla

আমি প্রায়ই বলি, বিএনপি দলটি দাঁড়িয়ে আছে মিথ্যের ওপর। আসলে দলটির নাম হওয়া উচিত Bangladesh Nontruth Party (BNP)।মোটামুটিভাবে শুরু থেকে আরম্ভ করে এখন পর্যন্ত দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে মিথ্যেকে খুব জোরালো গলায় উপস্থাপন করতে দেখবেন। এরা স্বাধীনতা নিয়ে মিথ‍্যাচার করে, নিজেদের আমল নিয়ে মিথ্যাচার করে, ইতিহাস নিয়ে মিথ্যাচার করে, এবং যা কিছু অন্যের কৃতিত্ত্ব তা নিয়েও ওরা মিথ্যাচার করে; আর চোরের মায়ের মত খুব শক্ত গলায় এসব মিথ্যাকে “সত্যি” বলে্লে “প্রতিষ্ঠিত” করে। একটি উদাহরন দেই। মাত্র ক’দিন আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ২০০১-২০০৬ এ তাঁরা নাকি দেশকে দূর্নীতির প্রকোপ থেকে বের করে এনেছিলেন। এই কথাটি যে সর্বৈব মিথ্যা এটি সারা দেশের মানুষ জানে, এমনকি তারেকও জানেন; তাঁকে সেসময় মিঃ টেন পার্সেন্ট এবং দুর্নীতির বরপুত্র বলা হতো; এই মাত্র ক’দিন আগেও তাঁকে বিদেশী পত্রিকায় “খাম্বা” নামে ডাকা হয়েছে। কিন্তু  এসব জিনিস তাঁদের গায়ে লাগেনা।

মিথ্যেটা Minister’s Minister’sএ দলের নেতাদের মধ‍্যে এমনভাবে গেঁড়ে বসেছে যে, দিনের আলোর মত সত্য কথাও এঁরা অনায়াসে অস্বীকার করতে পারেন। এর একটি বড় কারন এই যে, এঁরা মোটামুটি জানেন যে, এই মিথ্যে বলাটাটাই তাঁদের অস্ত্র; এঁরা মানুষকে বোকা মনে করেন; কিছু মানুষ আওয়ামী বিরোধীতার কারনে তাঁদের কথা বিশ্বাস করে, কিন্তু দিনশেষে মানুষ বুঝতে পারে কোনটা সত্যি এবং কোনটা মিথ্যে।

তো এই কথাগুলো বলার কারন হলো, বর্তমান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর একটি দাবী। তিনি বলেছেন, অপরাধের সকল ব‍্যারোমিটারে নাকি দেখা যাচ্ছে, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের আইন- শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের সময়ের চেয়ে ভালো। তো এই দাবীটি কেমন যেন বেঠিক মনে হলো। মাত্র দু’য়েক দিন আগেই অপ্রতীম নামে শিশুটিকে খুন করা হয়েছে। প্রতিদিন দেশে খুন-জখম- ধর্ষন- শিশু নির্যাতনের খবর পাওয়া যাচ্ছে; আর মন্ত্রী বলছেন পুরোই উল্টো কথা। তো এটি একটু পরীক্ষা করতে মন চাইলো। এই পরীক্ষার ফলাফলটি এখন উপস্থাপন করবো।

“সব ব্যারোমিটারে ভালো”: মন্ত্রীর দাবি পরিসংখ্যানের সাক্ষ্য

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দাবি করেছেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন আগের চেয়ে ভালো, এমনকি “সব ব্যারোমিটারেই” ভালো। একজন মন্ত্রীর এমন আত্মবিশ্বাসী বক্তব্য নাগরিকদের আশ্বস্ত করতে পারত, যদি সরকারি পরিসংখ্যানও একই কথা বলত। কিন্তু পুলিশ সদর দপ্তরের প্রকাশিত অপরাধের হিসাব, আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত সর্বশেষ তথ্য এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণ একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি চিত্র সামনে আসে।

পরিসংখ্যান বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ ছয় মাসের তুলনায় বর্তমান বিএনপি সরকারের সময়ে ডাকাতি, দস্যুতা, অপহরণ এবং চুরির মামলা কিছুটা কমেছে। এটি স্বীকার করতে কোনো দ্বিধা থাকা উচিত নয়। কিন্তু একই সময়ে হত্যা, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং পুলিশের ওপর হামলা বেড়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের একটি স্বাভাবিক ছয় মাসের সঙ্গে তুলনা করলে বর্তমান সরকারের অধীনে আলোচিত প্রায় প্রতিটি অপরাধের মাসিক গড়ই বেশি। অতএব কিছু অপরাধ কমেছে বলা যায়, কিন্তু তাঁরই ব্যারোমিটারে বড় অপরাধের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভালো কোন লক্ষণ এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছেনা।

তুলনার ভিত্তি

একটি ন্যায্য তুলনার জন্য তিনটি সরকারের সমান সময়ের তথ্য নেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য জানুয়ারি থেকে জুন ২০২৪, অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য আগস্ট ২০২৫ থেকে জানুয়ারি ২০২৬ এবং বিএনপি সরকারের জন্য ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই ২০২৬।

আওয়ামী লীগ আমলের ক্ষেত্রে জানুয়ারি থেকে জুন ২০২৪ নির্বাচন করার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। জুলাই এবং আগস্ট ২০২৪ ছিল অভ্যুত্থান, রাষ্ট্রীয় দমন, বিক্ষোভ, গুলিবর্ষণ এবং ব্যাপক প্রাণহানির অস্বাভাবিক সময়। সেই সময়ের হত্যাকাণ্ড এই তুলনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে আওয়ামী লীগ আমলের একটি অপেক্ষাকৃত স্বাভাবিক ছয় মাসের সঙ্গে পরবর্তী দুই সরকারের সমান সময় তুলনা করা হয়েছে।

তিন সরকারের ছয় মাসের অপরাধ পরিস্থিতির তুলনা

হত্যার ব্যারোমিটার কী বলছে

আওয়ামী লীগ আমলের নির্বাচিত ছয় মাসে সারা দেশে ১,৫৩৩টি হত্যা মামলা হয়েছিল। মাসে গড় ছিল প্রায় ২৫৬টি। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ ছয় মাসে হত্যা মামলা বেড়ে ১,৭৮০টিতে পৌঁছায়, মাসে গড় প্রায় ২৯৭টি। বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে হয়েছে ১,৭৮৯টি, মাসে গড় প্রায় ২৯৮টি।

অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকারের তুলনায় বর্তমান সরকারের সময়ে হত্যা মামলা নয়টি বেড়েছে। সংখ্যাটি খুব বড় নয়, কিন্তু এটি অন্তত হ্রাস নয়। আওয়ামী লীগ আমলের স্বাভাবিক ছয় মাসের তুলনায় বর্তমান সময়ে মাসিক হত্যা মামলা প্রায় ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি।

আগস্ট ২০২৬ এর হিসাব যুক্ত করলে বিএনপি সরকারের ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সাত মাসে হত্যা মামলা দাঁড়ায় ২,০৭৫টি। মাসিক গড় প্রায় ২৯৬টি, দৈনিক গড় প্রায় দশটি। আওয়ামী লীগ আমলের নির্বাচিত সময়ের তুলনায় এই মাসিক গড় এখনো প্রায় ১৬ শতাংশ বেশি।

সুতরাং হত্যার ব্যারোমিটার মন্ত্রীর দাবিকে সমর্থন করে না।

নারী শিশু নির্যাতনে আরও উদ্বেগজনক চিত্র

আওয়ামী লীগ আমলের নির্বাচিত ছয় মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের ৯,০০২টি মামলা হয়েছিল। মাসিক গড় ছিল প্রায় ১,৫০০টি। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ ছয় মাসে মামলা বেড়ে ১০,০৯০টিতে পৌঁছায়, মাসিক গড় প্রায় ১,৬৮২টি। বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে মামলা হয়েছে ১১,১৬৫টি, মাসিক গড় প্রায় ১,৮৬১টি।

অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকারের তুলনায় বর্তমান সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা ১০ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। আওয়ামী লীগ আমলের নির্বাচিত ছয় মাসের তুলনায় বৃদ্ধি প্রায় ২৪ শতাংশ।

আগস্টে আরও ২,১৫৬টি নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। ফলে ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সাত মাসে মোট মামলা দাঁড়ায় ১৩,৩২১টি। মাসে গড় প্রায় ১,৯০৩টি। আওয়ামী লীগ আমলের মাসিক গড়ের তুলনায় এটি প্রায় ২৬ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি।

নারী ও শিশুর নিরাপত্তা যদি আইনশৃঙ্খলার অন্যতম প্রধান ব্যারোমিটার হয়, তাহলে এই সূচকে পরিস্থিতিকে আগের চেয়ে ভালো বলার কোনো পরিসংখ্যানগত ভিত্তি নেই।

ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর হত্যা

পুলিশের তিন সময়কালের প্রতিবেদনে প্রাপ্তবয়স্ক নারী ধর্ষণ, শিশু ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর হত্যার সংখ্যা সব সময় একই পদ্ধতিতে আলাদাভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তাই এসব তথ্যকে মূল পুলিশি তুলনার সঙ্গে সরাসরি মেশানো ঠিক হবে না। তবে মানবাধিকার সংস্থার পর্যবেক্ষণ বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে সাহায্য করে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে ৬৪১ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৪০০ জন নারী এবং ২৪১ জন শিশু। অর্থাৎ নথিভুক্ত প্রতি একশটি ধর্ষণের ঘটনায় প্রায় ৩৮ জন ভুক্তভোগী শিশু।

২০২৫ সালের পুরো বছরে ৭৪৯টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল, মাসে গড়ে প্রায় ৬২টি। অথচ ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে ৬৪১টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, মাসে গড়ে প্রায় ৯২টি। মাসিক গড়ের হিসাবে বৃদ্ধি প্রায় ৪৭ শতাংশ।

ধর্ষণের পর হত্যার চিত্র আরও ভয়াবহ। ২০২৫ সালের পুরো বছরে ৫৫ জন ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছিলেন। ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসেই সংখ্যাটি ৫৮তে পৌঁছেছে। মাসিক গড়ের হিসাবে বৃদ্ধি প্রায় ৮১ শতাংশ।

আগস্টে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি ৭৯টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৪৬ জনই শিশু। একই মাসে নারী ও শিশু সহিংসতার শিকার হয়েছেন অন্তত ২৪৯ জন।

এই পরিস্থিতির মধ্যে দাঁড়িয়ে নারী ও শিশু নিরাপত্তার ব্যারোমিটার ভালো আছে বলা বাস্তবতার প্রতি সুবিচার নয়।

অপহরণের চিত্র

আওয়ামী লীগ আমলের নির্বাচিত ছয় মাসে অপহরণ মামলা হয়েছিল ২৮১টি, মাসে গড়ে প্রায় ৪৭টি। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ ছয় মাসে তা বেড়ে ৫৬৩টিতে পৌঁছায়, মাসে প্রায় ৯৪টি। বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে কিছুটা কমে ৫১২টি হয়েছে, মাসে প্রায় ৮৫টি।

বর্তমান সরকার অন্তর্বর্তী সরকারের তুলনায় অপহরণ প্রায় ৯ শতাংশ কমাতে পেরেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ আমলের নির্বাচিত সময়ের তুলনায় বর্তমান সরকারের মাসিক অপহরণ মামলা এখনো প্রায় ৮২ শতাংশ বেশি।

আগস্টে আরও ৯২টি অপহরণ মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সাত মাসে অপহরণ মামলা দাঁড়ায় ৬০৪টি।

অন্তর্বর্তী সরকারের তুলনায় কিছু উন্নতি হয়েছে, কিন্তু আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাওয়া সম্ভব হয়নি। এই বাস্তবতাকে সব ব্যারোমিটারে উন্নতি বলাকেই আমি Bangladesh Nontruth Party’র বৈশিষ্ঠ্য মনে করি; অনেকটাই চোখের পাতাবিহীন মানুষের কথা যেন।

ডাকাতি, দস্যুতা চুরি

অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ ছয় মাসে ডাকাতি মামলা হয়েছিল ৩২৮টি। বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে তা কমে ২৫৬টি হয়েছে। হ্রাস প্রায় ২২ শতাংশ। দস্যুতা ও ছিনতাইয়ের মামলা ৯৬০টি থেকে কমে ৯০৪টিতে এসেছে, হ্রাস প্রায় ৫ দশমিক ৮ শতাংশ।

এটি বর্তমান সরকারের জন্য ইতিবাচক তথ্য। কিন্তু আওয়ামী লীগ আমলের নির্বাচিত ছয় মাসে ডাকাতি মামলা ছিল ১৮৩টি এবং দস্যুতা ছিল ৬৮৮টি। সেই তুলনায় বর্তমান সরকারের প্রথম ছয় মাসে ডাকাতি প্রায় ৪০ শতাংশ এবং দস্যুতা প্রায় ৩১ শতাংশ বেশি।

চুরির ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র দেখা যায়। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ ছয় মাসে সাধারণ চুরির মামলা ছিল ৫,১১৩টি। বিএনপি সরকারের সময়ে তা কমে ৪,৮০৮টিতে এসেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ আমলের নির্বাচিত ছয় মাসে সাধারণ চুরি ছিল ৪,৭১৭টি। অর্থাৎ বর্তমান সংখ্যা এখনো সামান্য বেশি।

সিঁধেল চুরির মামলা অন্তর্বর্তী সরকারের ১,৬৫৯টি থেকে বর্তমান সরকারের সময়ে কমে ১,৫৯১টি হয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ আমলের নির্বাচিত ছয় মাসে এই সংখ্যা ছিল ১,৩৫৫টি। সেই তুলনায় বর্তমান সময়ে সিঁধেল চুরি প্রায় ১৭ শতাংশ বেশি।

অর্থাৎ বর্তমান সরকার অন্তর্বর্তী সময়ের উচ্চ অবস্থান থেকে কয়েকটি অপরাধ কমিয়েছে, কিন্তু আওয়ামী লীগ আমলের স্বাভাবিক পর্যায়ে নামাতে পারেনি।

আগস্টের সর্বশেষ হিসাব

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেহেতু সেপ্টেম্বরে বক্তব্য দিয়েছেন, তাই তাঁর কাছে আগস্টের পূর্ণ হিসাব থাকার কথা। পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আগস্ট ২০২৬ এ সারা দেশে ১৮,৮৯৬টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। জুলাইয়ে মামলা ছিল ১৭,৯১১টি। অর্থাৎ এক মাসে মামলা ৯৮৫টি বা ৫ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, আগস্ট ২০২৫ এ মোট মামলা ছিল ১৫,৬৫৬টি। এক বছর পর আগস্ট ২০২৬ এ তা বেড়ে ১৮,৮৯৬টিতে পৌঁছেছে। বৃদ্ধি ৩,২৪০টি বা ২০ দশমিক ৭ শতাংশ।

আগস্ট ২০২৬ এ হত্যা মামলা হয়েছে ২৮৬টি, অপহরণ ৯২টি, দস্যুতা ১৫৪টি এবং ডাকাতি ৪২টি। এই চার ধরনের জীবন ও ব্যক্তিনিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট মামলা মোট ৫৭৪টি। আগস্ট ২০২৫ এর ৬৪৯টির তুলনায় এটি ১১ দশমিক ৬ শতাংশ কম। সাধারণ চুরিও ১২ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে।

কিন্তু একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা ১,৯০৪টি থেকে বেড়ে ২,১৫৬টি হয়েছে, বৃদ্ধি ১৩ দশমিক ২ শতাংশ। মাদক মামলা ৪,৮৬০টি থেকে বেড়ে ৭,১৬৭টিতে পৌঁছেছে, বৃদ্ধি ৪৭ দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যান্য শ্রেণির মামলা ৬,৪৮৪টি থেকে বেড়ে ৭,২৭৮টি হয়েছে।

অর্থাৎ আগস্টের তথ্যেও কিছু অপরাধ কমেছে, কিন্তু অন্য গুরুতর অপরাধগুলো বেড়েছে। তাই আগস্টের সর্বশেষ হিসাবও সব ব্যারোমিটারে উন্নতির দাবি সমর্থন করে না।

রাজনৈতিক সহিংসতা দলীয় সংঘর্ষ

আইনশৃঙ্খলার সরকারি টেবিলের বাইরে রাজনৈতিক সহিংসতার সামাজিক প্রভাবও বিবেচনা করতে হবে। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির হিসাবে, আগস্টে সারা দেশে ৭০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় সাতজন নিহত এবং ৫৩৬ জন আহত হয়েছেন।

নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে পাঁচজন বিএনপির, একজন আওয়ামী লীগের এবং একজন জামায়াতের নেতা বা কর্মী। বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের ২০টি ঘটনায় পাঁচজন নিহত এবং অন্তত ১৫২ জন আহত হয়েছেন।

জুলাইয়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় ছয়জন নিহত এবং ১৬৪ জন আহত হয়েছিলেন। আগস্টে আহতের সংখ্যা বেড়ে ৫৩৬ জন হয়েছে। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে রাজনৈতিক সহিংসতায় আহত মানুষের সংখ্যা তিন গুণেরও বেশি হয়েছে।

অন্য মানবাধিকার সংস্থা মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন আগস্টে রাজনৈতিক সহিংসতায় পাঁচজন নিহত এবং ২৬৭ জন আহত হওয়ার তথ্য দিয়েছে। সংবাদপত্র ও ঘটনা নির্বাচনের পদ্ধতি আলাদা হওয়ায় সংস্থাগুলোর সংখ্যায় পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু উভয় পর্যবেক্ষণেই আগস্টে রাজনৈতিক সহিংসতা ও আহতের সংখ্যা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে।

সব ঘটনাকে সরকারের সরাসরি বিরোধী দল দমন হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ, আন্তদলীয় বিরোধ এবং স্থানীয় আধিপত্যের লড়াই রয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয় যা হোক, রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবার জীবন ও নিরাপত্তা রক্ষা করা। রাজনৈতিক সহিংসতায় শত শত মানুষ আহত হলে সেটিকে ভালো আইনশৃঙ্খলার লক্ষণ বলা যায় না।

সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা

একটি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের নিরাপত্তা দিয়ে বিচার করা যায় না। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুরা কতটা নিরাপদ, সেটিও রাষ্ট্রের সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, জুলাই ২০২৬ এ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে ঘিরে আটটি সহিংস ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল। আগস্টে তা বেড়ে ২৬টিতে পৌঁছেছে। অর্থাৎ এক মাসে ঘটনা তিন গুণের বেশি হয়েছে।

এসব ঘটনার মধ্যে ধর্মীয় প্রতিমা ভাঙচুর, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের ওপর হামলা, মৃত্যু, হুমকি এবং যৌন সহিংসতার অভিযোগ রয়েছে। কুমিল্লার লালমাইয়ে এক কিশোরীর সংঘবদ্ধ ধর্ষণ এবং খাগড়াছড়িতে এক ত্রিপুরা নারীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাও প্রতিবেদনে এসেছে। ওই নারীর পরিবার ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ করেছে এবং নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে।

প্রতিটি ঘটনাকে তদন্তের আগে সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলা ঠিক নয়। কোনো ঘটনা জমিজমা, ব্যক্তিগত বিরোধ বা সাধারণ অপরাধ থেকেও ঘটতে পারে। কিন্তু প্রতিমা, উপাসনাস্থল বা ধর্মীয় পরিচয়কে লক্ষ্য করে হামলা হলে সেগুলোকে নিছক সাধারণ অপরাধ হিসেবে উড়িয়ে দেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়।

সংখ্যালঘু নাগরিকেরা যদি নিরাপদে ধর্ম পালন করতে না পারেন, তাঁদের সম্পত্তি, জীবন ও মর্যাদা নিয়ে ভয় থাকে, তাহলে আইনশৃঙ্খলার ব্যারোমিটার ভালো আছে বলা যায় না।

সংখ্যা নিয়ে একটি প্রয়োজনীয় সতর্কতা

এগুলো পুলিশের কাছে নথিভুক্ত মামলার সংখ্যা, প্রকৃত সংঘটিত সব অপরাধের পূর্ণ হিসাব নয়। থানায় মামলা গ্রহণ না করা, ভুক্তভোগীর ভয়, রাজনৈতিক চাপ, সামাজিক সম্মানের আশঙ্কা, পুরোনো ঘটনার বিলম্বিত মামলা এবং পুলিশের নথিভুক্তকরণ পদ্ধতি সংখ্যাকে প্রভাবিত করতে পারে।

কিন্তু সরকার যখন নিজের সাফল্য প্রমাণে পুলিশের পরিসংখ্যান ব্যবহার করে, তখন একই পরিসংখ্যানের অস্বস্তিকর অংশও তাকে গ্রহণ করতে হবে। শুধু কমে যাওয়া কয়েকটি অপরাধ তুলে ধরে বেড়ে যাওয়া হত্যা, নারী ও শিশু নির্যাতন, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং সংখ্যালঘু নির্যাতন উপেক্ষা করা পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন নয়।

ব্যারোমিটারের কাঁটা অন্যদিকে

পরিসংখ্যানের নিরপেক্ষ পাঠ খুব পরিষ্কার। অন্তর্বর্তী সরকারের তুলনায় বিএনপি সরকারের সময়ে ডাকাতি, দস্যুতা, অপহরণ এবং চুরির মামলা কিছুটা কমেছে। কিন্তু হত্যা কমেনি, নারী ও শিশু নির্যাতন বেড়েছে, পুলিশের ওপর হামলা বেড়েছে এবং রাজনৈতিক সহিংসতায় শত শত মানুষ আহত হয়েছেন।

আওয়ামী লীগ আমলের একটি স্বাভাবিক ছয় মাসের তুলনায় বর্তমান সময়ে হত্যা প্রায় ১৭ শতাংশ, নারী ও শিশু নির্যাতন ২৪ শতাংশ, ডাকাতি প্রায় ৪০ শতাংশ, দস্যুতা প্রায় ৩১ শতাংশ, অপহরণ প্রায় ৮২ শতাংশ এবং সিঁধেল চুরি প্রায় ১৭ শতাংশ বেশি ছিল। আগস্ট পর্যন্ত হিসাব করলে নারী ও শিশু নির্যাতনের মাসিক গড়ের ব্যবধান আরও বেড়ে প্রায় ২৭ শতাংশ হয়।

আগস্ট ২০২৫ এর তুলনায় আগস্ট ২০২৬ এ মোট নথিভুক্ত মামলা ২০ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন বেড়েছে ১৩ দশমিক ২ শতাংশ। রাজনৈতিক সহিংসতায় সাতজন নিহত এবং ৫৩৬ জন আহত হয়েছেন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে ঘিরে নথিভুক্ত সহিংস ঘটনা আটটি থেকে বেড়ে ২৬টিতে পৌঁছেছে।

এই তথ্যের পরও “সব ব্যারোমিটারে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভালো” বলাটা কীভাবে সম্ভব? বরং সঠিক বক্তব্য হবে, ছোট কিছু অপরাধে অন্তর্বর্তী সরকারের তুলনায় সীমিত উন্নতি হয়েছে, কিন্তু সামগ্রিক পরিস্থিতি মিশ্র এবং কয়েকটি প্রধান সূচকে আগের চেয়ে অধিক উদ্বেগজনক। আর আওয়ামী লীগের তুলিনায় মোটামুটি সব ব্যারোমিটারেই বর্তমান সরকার অনেকটাই পিছিয়ে আছে।

সুতরাং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি শুধু অতিরঞ্জিত নয়, পুলিশের নিজস্ব পরিসংখ্যান এবং মানবাধিকার পর্যবেক্ষণের আলোকে তা তথ্যসমর্থিত নয়। ব্যারোমিটারের কাঁটা ভালো পরিস্থিতির একমুখী সংকেত দিচ্ছে না। বরং হত্যা, নারী ও শিশু নির্যাতন, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং সংখ্যালঘু নিরাপত্তাহীনতার মধ্য দিয়ে একটি গভীর ও বহুমাত্রিক সংকটের দিকেই নির্দেশ করছে।

মতামত: ড. শ্যামল দাস, ভার্জিনিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

এই শাখার আরও খবর

বাংলাদেশে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকার ৩৬ শতাংশ : আইএমএফ

বাংলাদেশে প্রতি ১০০ জন শিক্ষিত তরুণের মধ্যে ৩৬ জন বেকার। শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৩৬ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এক প্রতিবেদনে এই তথ্য…

সুদানে মানবিক যুদ্ধবিরতি বারবার ব্যর্থ হচ্ছে কেন, দায় কার?

সুদানে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। যুদ্ধ বন্ধের বদলে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে লড়াই আরও তীব্র হচ্ছে। এর ফলে ভয়াবহ মানবিক সংকট আরও গভীর…

কেরানীগঞ্জে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে স্বর্ণ ব্যবসায়ী ও ভাইকে গুলি, ২৫ ভরি সোনা লুট

ঢাকার কেরানীগঞ্জে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে এক স্বর্ণ ব্যবসায়ী ও তাঁর ফুফাতো ভাইকে গুলি করে প্রায় ২০ থেকে ২৫ ভরি স্বর্ণালংকার লুট করে নিয়ে গেছে…

জাবি অধ্যাপকের কাছে চাঁদা দাবি, সন্তানকে অপহরণের হুমকি

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) এক অধ্যাপককে মুঠোফোনে কল করে চাঁদা দাবি এবং চাঁদা না দিলে তাঁর সন্তানকে অপহরণের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় নিজের ও…

কাঠগড়ায় মাথা নিচু গাজী নজরুলের, কান্নায় ভেঙে পড়লেন প্রথম স্ত্রী মাকছুদা

ঢাকার আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বারবার মাথা নিচু করে থাকলেন সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম। পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম। মামলার…

দুই ফোন ডিটারজেন্ট পানিতে, আগমী-আয়ুষের ফোন অক্ষত: তদন্তে প্রশ্ন বাড়ছে

রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় পুলিশের প্রাথমিক বয়ান ঘিরে শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন উঠেছে। গ্রেপ্তার দুই তরুণ সিদ্ধার্থ…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au