স্বাস্থ্য গবেষণার নমুনা ও তথ্যে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করছে বাংলাদেশ
স্বাস্থ্য গবেষণায় ব্যবহৃত জৈবিক নমুনা, গবেষণা থেকে উৎপন্ন তথ্য এবং সেই গবেষণার মাধ্যমে সৃষ্ট মেধাস্বত্বের ওপর বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করতে একটি সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়নের…
ইরান শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি ও পারমাণবিক বিজ্ঞানের অধিকার থেকে সরে যাবে না বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। বুধবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে না। তবে শান্তিপূর্ণ কাজে পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকার তেহরান কোনোভাবেই ত্যাগ করবে না।
পেজেশকিয়ান বলেন, পারমাণবিক জ্ঞান ও প্রযুক্তির ওপর কয়েকটি দেশের একচেটিয়া অধিকার থাকতে পারে না। ইরান মনে করে, শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকার সব দেশেরই থাকা উচিত। তাঁর বক্তব্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত, ইসরায়েলের পারমাণবিক সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার পরিদর্শন ব্যবস্থা নিয়ে তীব্র সমালোচনা উঠে আসে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বেসামরিক ও শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে এবং এ কর্মসূচি থেকে ইরান সরে আসবে না। তাঁর বক্তব্যে মূলত পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইরানের অধিকারের পাশাপাশি পশ্চিমা দেশগুলোর নীতির সমালোচনা প্রাধান্য পায়।
পেজেশকিয়ান প্রশ্ন তোলেন, কেন পারমাণবিক প্রযুক্তি ও জ্ঞানের ওপর কিছু দেশের বিশেষ অধিকার থাকবে। তাঁর ভাষায়, পারমাণবিক জ্ঞানকে কয়েকটি দেশের একচেটিয়া সম্পত্তিতে পরিণত করার ধারণা ইরান মেনে নেয় না।
ইরানের প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার পরিদর্শন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র থাকার অভিযোগ তুলে বলেন, ইসরায়েলের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো একইভাবে আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের আওতায় না থাকলেও ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো নিয়ে নিয়মিত পরিদর্শনের দাবি তোলা হচ্ছে।
পেজেশকিয়ান বলেন, ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে, কিন্তু সেখানে আন্তর্জাতিক পরিদর্শন করা হয় না। অন্যদিকে ইরানকে পরিদর্শনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে এবং নিষেধাজ্ঞারও সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিকে তিনি দ্বৈত মানদণ্ড হিসেবে তুলে ধরেন।
জাতিসংঘে দেওয়া বক্তব্যে পেজেশকিয়ান ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের প্রসঙ্গও তোলেন। তিনি বলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার জন্য লড়াই করেছে এবং সেই আত্মরক্ষার সক্ষমতা অর্জনকে কোনোভাবেই সন্ত্রাসবাদ বা আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়।
তিনি অভিযোগ করেন, ইরান যখন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার কথা বলে, তখন সেটিকে সন্ত্রাসবাদ কিংবা অঞ্চলকে অনিরাপদ করে তোলার কর্মকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল, ইরান নিজেকে সামরিক চাপ ও হামলা থেকে রক্ষার অধিকার রাখে।
ভাষণের শুরুতেই পেজেশকিয়ান ইরানে বিভিন্ন হামলায় নিহতদের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি মিনাবের একটি স্কুলে হামলা, স্টেডিয়ামে বোমা হামলা এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার ঘটনাসহ সংঘাতের বিভিন্ন দিকের কথা উল্লেখ করেন। এসব প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি ইরানের ওপর সামরিক চাপ ও হামলার সমালোচনা করেন।
পেজেশকিয়ানের বক্তব্য আসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ইরানকে নিয়ে কঠোর বক্তব্য দেওয়ার একদিন পর। ২২ সেপ্টেম্বরের ভাষণে ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে নতুন চুক্তি না হলে দেশটিকে ধ্বংস করার হুমকি দেন এবং একই সঙ্গে নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর একটি চুক্তির সম্ভাবনার কথাও বলেন।
ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে আধিপত্যবাদী আচরণ ও দম্ভের প্রকাশ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এ ধরনের হুমকি ইরানি জনগণকে আরও ঐক্যবদ্ধ করে।
ইরানের প্রেসিডেন্টের ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হুমকির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি কূটনৈতিক সমাধানের প্রশ্নও উঠে আসে। চলমান সংঘাতের মধ্যে ইরানের প্রতিনিধিদলকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করার জন্য ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে বলে এর আগে একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন। তবে একই সময়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি প্রেসিডেন্ট পর্যায়ের বৈঠক নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
পেজেশকিয়ান ইরানের সামুদ্রিক অধিকার নিয়েও কঠোর অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ইরান তার নিজস্ব জলসীমায় নৌ চলাচল ও সামুদ্রিক অধিকার অন্য কারও হাতে তুলে দেবে না। এর সঙ্গে হরমুজ প্রণালির বিষয়টিও আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের মধ্যে প্রণালিটি নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এর আগে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ কমালে এবং ইরানের বন্দর ও জাহাজের ওপর অবরোধ তুলে নিলে এক সপ্তাহের মধ্যে বাণিজ্যিক নৌ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে তেহরান প্রস্তুত।
জাতিসংঘের ভাষণে পেজেশকিয়ান মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, এই অঞ্চলের কোনো দেশ একা নিরাপদ থাকতে পারবে না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, হয় সব দেশ একসঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলবে, নয়তো সবাইকে একসঙ্গে নিরাপত্তাহীনতার পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।
পেজেশকিয়ান আরও বলেন, ইরানকে সামরিক চাপ দিয়ে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যাবে না। জাতিসংঘে দেওয়া তাঁর বক্তব্যে তিনি ইরানের সার্বভৌমত্ব, আত্মরক্ষার অধিকার এবং শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকারকে একই সঙ্গে সামনে আনেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে পেজেশকিয়ানের বক্তব্য ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থানের পার্থক্যকে আবারও সামনে এনেছে। ওয়াশিংটন ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা সীমিত করার ওপর জোর দিচ্ছে, অন্যদিকে তেহরান বলছে, শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার থেকে তারা সরে যাবে না।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচিও জাতিসংঘের বর্তমান কাঠামো নিয়ে আস্থার সংকটের কথা বলেছেন। তাঁর অভিযোগ, জাতিসংঘ পশ্চিমা দেশগুলোর প্রভাবাধীন হওয়ায় ইরানের আস্থা কমেছে। তবে একই সময়ে নিউইয়র্কে চলমান কূটনৈতিক তৎপরতা থেকে বোঝা যাচ্ছে, সংঘাতের মধ্যেও আলোচনার সম্ভাবনা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
সব মিলিয়ে জাতিসংঘে পেজেশকিয়ানের বক্তব্যে তিনটি বিষয় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে: ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে না বলে তেহরানের দাবি, শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি ও নিজস্ব ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার ছাড়তে ইরানের অনিচ্ছা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক চাপের বিরুদ্ধে তেহরানের কঠোর অবস্থান।
অন্যদিকে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুমকি, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা এবং নিউইয়র্কে চলমান কূটনৈতিক তৎপরতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের সামরিক ও কূটনৈতিক দুই দিকই একই সঙ্গে সক্রিয় রয়েছে। ফলে পেজেশকিয়ানের জাতিসংঘ ভাষণকে শুধু পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বক্তব্য হিসেবে নয়, বরং চলমান সংঘাতের মধ্যে ইরানের অবস্থান তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au