এশিয়াজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে, চাপে সাধারণ মানুষ
এশিয়ার অধিকাংশ তেল আমদানিনির্ভর দেশ চলতি বছরে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সংকট এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায়…
বিশ্ব অর্থনীতিতে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জ্বালানির উচ্চমূল্য ও বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা থাকলেও ভারতের অর্থনীতি প্রত্যাশার চেয়ে শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে। এর ফলে দেশটির ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়িয়েছে একাধিক আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংস ভারতের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৬ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭ শতাংশ করেছে। ফিচ রেটিংসও তাদের পূর্বাভাস ৬ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬ দশমিক ৯ শতাংশ করেছে। এর আগে মুডিস রেটিংসও ভারতের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭ শতাংশ করে।
প্রবৃদ্ধির এই পূর্বাভাস বাড়ানোর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ভারতের প্রত্যাশার চেয়ে শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে। এপ্রিল থেকে জুন সময়ে দেশটির জিডিপি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে। এই প্রবৃদ্ধি রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার ৭ শতাংশ পূর্বাভাস এবং বাজারের প্রায় ৭ দশমিক ১ শতাংশ পূর্বাভাসকেও ছাড়িয়ে গেছে।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংসের মতে, শক্তিশালী শিল্প উৎপাদন, স্থিতিশীল ভোগব্যয়, পণ্য রপ্তানি এবং সরকারি বিনিয়োগ ভারতের প্রথম প্রান্তিকের প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে একসঙ্গে গতি থাকায় প্রবৃদ্ধির ভিত্তিও আগের তুলনায় বিস্তৃত হয়েছে।
ভারতের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হচ্ছে অভ্যন্তরীণ ভোগ। বৈশ্বিক বাণিজ্য ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়লেও দেশের বড় অভ্যন্তরীণ বাজার অর্থনীতিকে কিছুটা স্থিতিশীলতা দিচ্ছে। মুডিসও ভারতের প্রবৃদ্ধির পেছনে শক্তিশালী বেসরকারি ভোগ, অবকাঠামো খাতে সরকারি ব্যয় এবং পরিষেবা খাতের ধারাবাহিক শক্তিশালী অবস্থানের কথা উল্লেখ করেছে।
অর্থনীতির এই অভ্যন্তরীণ শক্তির সঙ্গে বিনিয়োগও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে ভারতের মোট স্থায়ী মূলধন গঠন বা বিনিয়োগের হার আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে। একই সময়ে সরকারি অবকাঠামো ব্যয়ের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের বিনিয়োগেও গতি বাড়ার লক্ষণ দেখা গেছে। রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ওই প্রান্তিকে বেসরকারি মূলধনী বিনিয়োগও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং বাণিজ্যিক চাপের মতো বৈশ্বিক ঝুঁকির মধ্যেও ভারতের প্রবৃদ্ধি বড় ধরনের ধাক্কা খায়নি। মুডিস বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থেকে তৈরি বৈশ্বিক ধাক্কা সামলেও ভারতের অর্থনীতি যে স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে, সেটিই তাদের পূর্বাভাস বাড়ানোর অন্যতম কারণ।
ভারতের প্রবৃদ্ধিতে রপ্তানির অবদানও রয়েছে। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে পণ্য ও পরিষেবা রপ্তানি অর্থনীতিতে বাড়তি গতি দিয়েছে। ফলে দেশটির অর্থনীতি শুধু অভ্যন্তরীণ ভোগ বা সরকারি ব্যয়ের ওপর নির্ভর করছে না, বিনিয়োগ, উৎপাদন, পরিষেবা ও রপ্তানিও প্রবৃদ্ধির ভিত্তিকে শক্তিশালী করছে।
তবে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়ালেও ভারতের অর্থনীতির সামনে কিছু ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে তা মূল্যস্ফীতি ও আমদানি ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। মুডিস সতর্ক করেছে, উচ্চ জ্বালানি মূল্য এবং এল নিনোর কারণে খাদ্যপণ্যের মূল্য বাড়লে মানুষের ভোগব্যয় ও সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব পড়তে পারে।
এ ছাড়া দুর্বল মুদ্রা, বৈশ্বিক আর্থিক পরিস্থিতি এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাও ভারতের অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি হিসেবে থাকছে। ফলে চলতি অর্থবছরের শুরুটা শক্তিশালী হলেও পুরো বছর একই গতিতে প্রবৃদ্ধি বজায় থাকবে কি না, তা নির্ভর করবে অভ্যন্তরীণ চাহিদা, বিনিয়োগ, মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতির ওপর।
সব মিলিয়ে, ভারতের অর্থনীতির প্রত্যাশার চেয়ে শক্তিশালী শুরুই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস বাড়ানোর প্রধান কারণ। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, উচ্চ প্রবৃদ্ধির এই গতি ধরে রাখতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও বিনিয়োগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au