বাংলাদেশের নারী ও কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন এবং দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে ২৫ কোটি ইউরো বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে বাংলাদেশ সরকার ও ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক (ইআইবি)। প্রস্তাবিত এই উদ্যোগের আওতায় ২০২৭ থেকে ২০৩১ সালের মধ্যে দেশের প্রায় ৪ কোটি ৭০ লাখ নারী ও কিশোরী স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
শনিবার (১০ অক্টোবর) প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। ‘উইমেনস হেলথ ইনিশিয়েটিভ’ বা নারী স্বাস্থ্য উদ্যোগ নামে প্রস্তাবিত এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো নারীদের জন্য মানসম্মত, সহজলভ্য ও কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যতের যেকোনো স্বাস্থ্যগত জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি জোরদার করাও এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, প্রস্তাবিত কর্মসূচির অর্থায়নে ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের ২০২১ সালে অনুমোদিত একটি বিদ্যমান সার্বভৌম ঋণের অর্থ ব্যবহার করা হবে। ওই ঋণ মূলত বাংলাদেশের করোনাভাইরাসের টিকাদান কর্মসূচি, মহামারি মোকাবিলার প্রস্তুতি এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।
নতুন পরিকল্পনায় সেই অর্থ নারীস্বাস্থ্যের উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো শক্তিশালী করার কাজে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত কর্মসূচির আওতায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে মাতৃস্বাস্থ্য ও নবজাতকের চিকিৎসাসেবায়। গর্ভবতী নারীদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যপরীক্ষা, নিরাপদ প্রসব এবং প্রসব-পরবর্তী চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়নে কাজ করা হবে। পাশাপাশি নবজাতকদের জন্য উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে।
এ ছাড়া নারীদের জরায়ুমুখের ক্যানসার ও স্তন ক্যানসারসংক্রান্ত স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব রোগের চিকিৎসাসেবা আরও কার্যকর ও সহজলভ্য করার মাধ্যমে নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
শুধু নারীস্বাস্থ্য নয়, দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো ও সেবার মান উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া হবে এই কর্মসূচিতে। বিশেষ করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র, রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা, জেলা হাসপাতাল এবং সংকটাপন্ন রোগীদের চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
এর ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে জেলা পর্যায় পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে মহামারি বা অন্য কোনো বড় ধরনের স্বাস্থ্যগত জরুরি পরিস্থিতি দেখা দিলে তা মোকাবিলায় দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরও প্রস্তুত থাকবে।
এই উদ্যোগের ঘোষণা দিতে গিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য নারী ও কিশোরীদের স্বাস্থ্য এবং সুস্থতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) সঙ্গে এই অংশীদারত্ব দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী ও সমতাভিত্তিক করে গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।
অন্যদিকে ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট মারেক মোরা বলেন, এই উদ্যোগে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের পাশাপাশি কারিগরি দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো হবে। এর মাধ্যমে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের নির্বাহী পরিচালক দিয়েনে কেইতা বলেন, এই অংশীদারত্বে ইউএনএফপিএ তার অভিজ্ঞতা ও কারিগরি দক্ষতা কাজে লাগাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি জানান, বিনিয়োগের সুফল যাতে দেশের লাখ লাখ নারী ও কিশোরীর স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে বাস্তব, পরিমাপযোগ্য, সমতাভিত্তিক এবং দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে, সে লক্ষ্যেই কাজ করবে সংস্থাটি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রস্তাবিত এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের নারীস্বাস্থ্যসেবায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জনের সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে মাতৃমৃত্যু ও নবজাতকের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো, ক্যানসার চিকিৎসাসেবা উন্নয়ন এবং জেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে ২৫ কোটি ইউরোর এই উদ্যোগ এখনো পরিকল্পনা পর্যায়ে রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে ২০২৭ থেকে ২০৩১ সালের মধ্যে প্রায় ৪ কোটি ৭০ লাখ নারী ও কিশোরী এর আওতায় উপকৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার ।