চোরবাগান পুজোয় বিপর্যয়। ফাইল ছবি
কলকাতার চোরবাগানের দুর্গাপুজোয় বিপুল ভিড়ের মধ্যে ঘটে যাওয়া বিপর্যয়ের পেছনে আয়োজক কমিটি, বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মী ও পুলিশের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণে অভিজ্ঞতার ঘাটতি ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গত কয়েক বছরের তুলনায় এ বছর নিরাপত্তাব্যবস্থা, পুলিশ মোতায়েন এবং মণ্ডপে প্রবেশ ও বের হওয়ার ব্যবস্থায় একাধিক পরিবর্তন এসেছিল বলে দাবি পুরোনো কমিটির সদস্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজার ডট কমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চোরবাগানের পুজোয় ভিড় সামলানোর দায়িত্বে ছিল ব্যারাকপুরের বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থা স্পেশ্যাল সিকিউরিটি সার্ভিসেস। কিন্তু নতুন কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর নিরাপত্তা সংস্থাও বদলে যায়। পুরোনো নিরাপত্তাব্যবস্থা, মণ্ডপের প্রবেশ ও প্রস্থানপথ এবং পুলিশ মোতায়েনের ধরনেও পরিবর্তন আসে। এসব পরিবর্তন ভিড় নিয়ন্ত্রণে কতটা প্রভাব ফেলেছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পুরোনো নিরাপত্তাব্যবস্থায় ছিল একাধিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা
স্পেশ্যাল সিকিউরিটি সার্ভিসেসের কর্মকর্তা শেখ মিরাজুদ্দিন আনন্দবাজার ডট কমকে জানান, তাঁদের সংস্থা ২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চোরবাগানের পুজোয় নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেছে। সন্ধ্যা ও রাতে দুজন অভিজ্ঞ নিরাপত্তা ব্যবস্থাপকের নেতৃত্বে ৭০ জন করে নিরাপত্তাকর্মী দায়িত্ব পালন করতেন।
মিরাজুদ্দিনের ভাষ্য অনুযায়ী, মণ্ডপে একসঙ্গে প্রায় ২০০ দর্শনার্থী প্রবেশ করতে পারলেও নিরাপত্তার স্বার্থে কখনোই ১৫০ জনের বেশি ঢুকতে দেওয়া হতো না। ভিড়ের চাপ নিয়ন্ত্রণে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ থেকে মুক্তারাম বাবু স্ট্রিট হয়ে মণ্ডপে প্রবেশের পথে অন্তত তিনটি জায়গায় ‘ড্রপ গেট’ রাখা হতো। এর মাধ্যমে মণ্ডপের কাছাকাছি পৌঁছানোর আগেই দর্শনার্থীদের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো।
প্রবেশ ও বের হওয়ার পথের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতেন দুই ব্যবস্থাপক। ওয়াকিটকির মাধ্যমে তাঁরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখতেন। মণ্ডপের ভেতরে থাকা প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ দর্শনার্থী বেরিয়ে যাওয়ার আগে নতুন করে কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হতো না।
পুরোনো কমিটির এক সদস্য জানান, ড্রপ গেট ব্যবহার করেও কখনো কখনো মণ্ডপের প্রবেশমুখে ভিড় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেত। এমন পরিস্থিতিতে পার্কের মূল লোহার ফটক বন্ধ করে দেওয়া হতো, যাতে নতুন করে কেউ মণ্ডপে প্রবেশ করতে না পারেন। তাঁর অভিযোগ, এ বছর ওই ফটকটিকেও মণ্ডপের থিমের অংশ করে ফেলা হয়েছিল।
নতুন কমিটিতে নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন
নতুন কমিটির সদস্য উত্তম সিংহের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল আনন্দবাজার ডট কম। তিনি জানান, কমিটিতে তাঁর নাম থাকলেও নতুন কোনো নিরাপত্তা সংস্থা নিয়োগ করা হয়েছিল কি না, কিংবা ভিড় সামলাতে কতজন নিরাপত্তাকর্মী ছিলেন, সে বিষয়ে তিনি অবগত নন।
স্থানীয়দের দাবি, আগের বছরগুলোর তুলনায় এ বছর বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীর সংখ্যা কম ছিল। যদিও এ বিষয়ে নির্দিষ্ট সংখ্যার তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
ঘটনার পর পুলিশ দুজন বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে। তাঁদের একজন গোঘাটের রাজেশ পাল। তাঁর পরিবারের দাবি, তিনি মূলত দিনমজুরের কাজ করেন এবং পুজোর কয়েক দিন বাড়তি আয়ের আশায় নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করতে গিয়েছিলেন।
অন্য গ্রেপ্তার ব্যক্তি সুমন চক্রবর্তীর বাড়ি বসিরহাটের একটি গ্রামে। তাঁর পরিবারের দাবি, ঘটনার সময় তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। ঘটনার পর থানায় গেলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরিবারের আরও দাবি, পুজোর সময় কাজ করার জন্য সুমনকে সরাসরি ক্লাব কর্তৃপক্ষ নিয়োগ করেছিল।
স্পেশ্যাল সিকিউরিটি সার্ভিসেসের কর্মকর্তা মিরাজুদ্দিনের মতে, দীর্ঘদিন একই জায়গায় কাজ করার ফলে তাঁদের কর্মীদের ভিড় সামলানোর অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছিল। নতুন সংস্থা বা ক্লাবের সরাসরি নিয়োগ করা কর্মীদের ক্ষেত্রে সেই অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি ছিল বলে তিনি মনে করেন।
তবে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ ও পেশাগত যোগ্যতা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি।
প্রবেশ ও বের হওয়ার পথেও পরিবর্তন
পুরোনো কমিটির সদস্যদের অভিযোগ, এ বছর মণ্ডপে প্রবেশ ও বের হওয়ার ব্যবস্থাতেও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছিল। তাঁদের দাবি, আগের বছরগুলোতে প্রতিমা এমনভাবে রাখা হতো, যাতে দর্শনার্থীরা প্রতিমার দুই পাশ দিয়ে ভাগ হয়ে বেরিয়ে যেতে পারেন। এতে মণ্ডপ দ্রুত খালি করা সম্ভব হতো।
এবার দর্শনার্থীদের প্রবেশ থেকে বের হওয়া পর্যন্ত বৃত্তাকার গ্রিলঘেরা একটি পথ ব্যবহার করতে হয়েছে। পথটির কিছু অংশ উড়ালপথের ওপর দিয়ে গেছে। কলকাতা পুলিশের প্রাথমিক তদন্তের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পথটির প্রস্থ ছিল মাত্র ৭ ফুট ৭ ইঞ্চি। বিপুল দর্শনার্থীর চাপের মধ্যে এই সংকীর্ণ পথ দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে বের হওয়ার সময় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দাপ্রধান কুণাল আগরওয়াল সোমবার জানান, পুরো মণ্ডপে মোট ৩০টি সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল। এর মধ্যে ১৩টি ক্যামেরায় ঘটনার সময়কার দৃশ্য পাওয়া গেছে। ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বৃষ্টির কারণে বের হওয়ার পথে ভিড় জমে চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় মাইকে ‘মণ্ডপ ভেঙে পড়েছে’ বলে ভুল ঘোষণা কে বা কারা দিয়েছিলেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মণ্ডপ ভেঙে পড়ার কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি বলেও জানান তিনি।
পুলিশ মোতায়েন নিয়েও প্রশ্ন
পুরোনো কমিটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগের বছরগুলোতে বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীদের পাশাপাশি চোরবাগানের পুজোয় কলকাতা পুলিশের প্রায় ১০০ সদস্য দায়িত্ব পালন করতেন। তিনজন সহকারী কমিশনারের নেতৃত্বে এই বাহিনী মোতায়েন করা হতো বলে দাবি করা হয়েছে। পুলিশের গত কয়েক বছরের মোতায়েনসংক্রান্ত নথিও এই দাবিকে সমর্থন করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু এ বছর প্রথমে একজন পরিদর্শক পদমর্যাদার কর্মকর্তার নেতৃত্বে মাত্র ২৫ জন পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল বলে পুলিশ সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে আনন্দবাজার ডট কম।
কলকাতা পুলিশের এক সহকারী কমিশনারের ভাষ্য, প্রথম দফার এই ব্যবস্থা দেখে তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন। পরে দুই দফায় পুলিশ মোতায়েনের সংখ্যা ও ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়। তৃতীয়ার দিন দর্শনার্থীদের ব্যাপক ভিড় শুরু হলে দুজন ডেপুটি কমিশনারের নেতৃত্বে ১০০ সদস্যের বাহিনী মোতায়েন করা হয়। তাঁরা চতুর্থী থেকে দায়িত্ব নেন।
তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই দুই ডেপুটি কমিশনারই কলকাতা পুলিশে প্রথমবার কাজ করছিলেন এবং আগে দুর্গাপুজোর ভিড় সামলানোর দায়িত্ব পালন করেননি। লালবাজার সূত্রের দাবি, ফলে বাহিনীর সংখ্যা বাড়ানোর পরও ভিড়ের সম্ভাব্য চাপ আগাম অনুমান করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এর জেরে সংকীর্ণ প্রবেশপথ দিয়ে বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থী মণ্ডপের দিকে এগিয়ে যান। সেখানে বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীরা জনস্রোত সামলাতে পারেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সমন্বয়ের অভাব কি বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ?
চোরবাগানের পুজোয় ভিড় সামলানোর ক্ষেত্রে আয়োজক কমিটি, পুলিশ ও বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীদের মধ্যে সমন্বয়ের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
স্পেশ্যাল সিকিউরিটি সার্ভিসেসের কর্মকর্তা মিরাজুদ্দিন জানান, ২০২২ সালেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তখন আয়োজকদের সঙ্গে আলোচনা করে মণ্ডপের আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়েছিল। মাইকে বৈদ্যুতিক সমস্যার কারণে সাময়িকভাবে মণ্ডপ বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়। ভিড় কমে গেলে আবার দর্শনার্থীদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু এ বছর এমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কলকাতা পুলিশের এক কর্মকর্তাও আয়োজকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন নিয়ে সমালোচনা করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ক্লাবের সঙ্গে আগে যুক্ত ছিলেন এমন এক স্থানীয় বাসিন্দার মতে, আয়োজক, পুলিশ ও বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীদের মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর দাবি, এবার সেই সমন্বয়ের ঘাটতি স্পষ্ট ছিল।
নিরাপত্তা সংস্থা পরিবর্তন, ভিড় নিয়ন্ত্রণের পুরোনো পদ্ধতিতে বদল, সংকীর্ণ প্রবেশ ও প্রস্থানপথ এবং পুলিশ মোতায়েনের ধরন নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলো চোরবাগানের বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে এসব বিষয়কে চূড়ান্ত কারণ হিসেবে বিবেচনা করার আগে তদন্তের ফলাফল ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য জানা প্রয়োজন।
সূত্র:আনন্দবাজার ডট কম